January 7, 2026

শিকার মুস্তাফিজুর

 শিকার মুস্তাফিজুর

কথায় বলে স্পোর্টসম্যান স্পিরিট। অর্থাৎ খেলাধুলোর বিষয়ে সবকিছু ঊর্ধ্বে।মানে খেলাধুলা কিছুই মানে না কোন বাধা কোন জাতি,গণ্ডি, ধর্ম, বর্ণ, এমনকি সংরক্ষণ।সুতরাং খেলাধুলোর সম্মানও অনস্বীকার্য। সেই খেলাধুলোতে এবার নিয়ে আসা হয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী চিন্তাধারা এবং এর দৌলতে বাংলাদেশের এক ক্রিকেটারকে আইপিএল থেকে সরিয়ে দেওয়া হল জোরপূর্বক। অথচ নিলামে তাকে কিনে নিয়েছিলো নয় কোটিরও বেশি টাকা দিয়ে কলকাতার টিম কেকেআর। কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্প্রতি কুটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের এক ক্রিকেটারের উপর। গত ১৬ ডিসেম্বর আইপিএলের মিনি নিলামের সময় বাংলাদেশের কোন ক্রিকেটারকে ভারতের আইপিএলে কোন টিমে না নেবার কোন নির্দেশ ছিল না। এই সময়ে এমনকি হল যে, বাংলাদেশের এক ক্রিকেটারকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হল। ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমান বাদ পড়ার পর তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন যে, বাদ দিলে কি আর করতে পারি। এই সিদ্ধান্তে চারিদিকে একেবারে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। প্রশ্ন তাহলে নেপথ্যে কি রাজনৈতিক চাপ?
শুধু তাই নয়, কেকেআরের মালিক শাহরুখ খানকে গালি শুনতে হয়েছে দেশদ্রোহী হিসাবে, গদ্দার হিসাবে। ২৬/১১ এর পর থেকে ভারত পাকিস্তানের মধ্যে ক্রিকেটে এক সত্যের ভাব এসেছে। ২০০৯ সাল থেকে পাকিস্তানের কোন ক্রিকেটার আইপিএলে নেই। কিন্তু বাংলাদেশের কোন ক্রিকেটারদের নিয়ে এরকম কোন সিদ্ধান্ত বা নির্দেশ ছিল না। আরও প্রশ্ন- নিলাম হয়ে যাবার পর কোন ক্রিকেটারকে সরিয়ে দেওয়া নিয়ে। আইপিএল অর্থাৎ ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগ'র নিয়ামক সংস্থা হচ্ছে বিসিসিআই। সেই বিসিসিআই'র শীর্ষে রয়েছেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুত্র জয় শাহ।
বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে ছেঁটে ফেলাতে সরকারকে প্রবলভাবে চেপে ধরেছে বিরোধীরা। কংগ্রেসের শশী থারুর বলেছেন, মুস্তাফিজুরকে কেন বাদ দেওয়া হয়? তার কি ধর্ম দেখে? না জাতি দেখে? নাকি কোন ব্যক্তিকে? কোন দেশের নাগরিককে? তার অপরাধ কী?খেলায় এই ধরনের রাজনীতিকরণ আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা সম্প্রতি এ মর্মে হুমকি দিয়েছিল যে আইপিএলে কেন বাংলাদেশের ক্রিকেটার থাকবে? এর ঠিক পরপরই বিসিসিআই কেকেআরকে নির্দেশ পাঠায় মুস্তাফিজুরকে ছেঁটে ফেলতে। আঙুল উঠেছে বিসিসিআই সভাপতি জয় শাহের দিকে। উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের চাপেই কি জয় শাহ এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন। শুধু তাই নয়, যে কে কে আর টিমের সদস্য ছিলেন মুস্তাফিজুর, সেই টিমের মালিক শাহরুখ খানকেও গালি শুনতে হল দেশদ্রোহী হিসাবে, গদ্দার হিসাবে। বিসিসিআই এক স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা। এই সংস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করার কথা। তারা কেন কারো কথায় চলবে। কিন্তু বিজেপি রাজত্বে আজ স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার চোহারা কি? হস্তক্ষেপ এখন জাকিয়ে বসেছে পুরোদমে। তা সিবিআই, ইডি হোক কিংবা নির্বাচন কমিশন কিংবা বিসিসিআই হোক। শাসকের আঙ্গুলি হেলন ছাড়া কিছুই নড়ে না।খেলাধুলোর জগত আগের পরিস্থিতি ছিল চেনা রাজনৈতিক জগতের বাইরে। কিন্তু বর্তমানে খেলাধুলোর জগতে রাজনীতি এমনভাবে ঢুকে গেছে যে, রাজনীতি ছাড়া খেলাধুলোকেও ভাবা যায় না। ক্রিকেট জগতের অনেকেই বিসিসিআই'র এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। ক্রিকেটারদের অনেকের মত হল, বোর্ড এই সিদ্ধান্তটা নিয়েছে কেননা বোর্ডকে প্রশ্ন করার কেউ নেই। কে কে আর মালিক শাহরুখ খানও প্রশ্ন করতে পারবেন না। তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, মুস্তাফিজুর একটা উদাহরণ হয়ে গেল আগামীর জন্য।উল্টো দিকে বাংলাদেশেও এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ বলছে যে, ভবিষ্যতে তাদের ফুটবল টিম বা ক্রিকেট টিম কতটা নিরাপদ তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, এক্ষেত্রে জয় হল হিন্দুত্ববাদীদের। হার দল মানবতার। মুস্তাফিজুরকে একজন ক্রিকেটার হিসেবে ট্রিট করা হয়নি। মুস্তাফিজুর হয়ে গেলেন এক দেশের নাগরিক যে দেশের তার ধর্মীয় পরিচয় প্রাধান্য পেয়েছে। একসময় প্রবল দোর্দন্তপ্রতাপ শিবসেনার দাপট দেখেছে মুম্বাই ও দেশ। এবার ফের উগ্র হিন্দুত্ববাদের শিকার এক পড়শি দেশের ক্রিকেটার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *