ভেনেজুয়েলার মাটিতে ঢুকে সে দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করা কোনও বিছিন্ন ঘটনা নয়, কোনোও 'আইনপ্রয়োগকারী অভিযানও' নয়।এটি সরাসরি এক সার্বভৌম রাষ্ট্রের উপর আগ্রাসন।এটি আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘন। এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কথা- এটি গোটা বিশ্বের সামনে একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করল, যেখানে শক্তিধর রাষ্ট্র চাইলে অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ করতেও দ্বিধা করবে না।
রাষ্ট্রসংঘের সনদ স্পষ্ট।১৯৪৫ সালের সনদের অনুচ্ছেদ ২ (৪) অনুযায়ী, কোনও দেশেই তথ্য অন্যদেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না। এই নিয়ম আমেরিকার জন্যও প্রযোজ্য। অথচ ভেনেজুয়েলায় ঢুকে রাষ্ট্রপ্রধানকে বন্দি করে আমেরিকা কার্যত রাষ্ট্রসংঘের সনদকে পদদলিত করেছে।প্রশ্ন উঠছে- তাহলে রাষ্ট্রসংঘের প্রয়োজনটাই বা কী? আন্তর্জাতিক আইন কি শুধুই দুর্বল দেশগুলির জন্য?
আমেরিকার এই আচরণ নতুন নয়। ইতিহাস সাক্ষী-ইরাকের সাদ্দাম হোসেন হোন কিংবা পানামার ম্যানুয়েল নেরিয়েগা, নিজেদের দেশেই মার্কিন বাহিনীর হাতে বন্দি হয়েছিলেন তারা। আজ সেই তালিকায় যুক্ত হল নিকোলাস মাদুরো। কিন্তু সময় বদলেছে, বিশ্বরাজনীতি বদলেছে। তাই মাদুরোকে অপহরণকে অনেকেই 'বেনজির' বলছেন। কারণ, এই মুহূর্তে এমন দুঃসাহস গোটা বিশ্বের স্থিতাবস্থাকে নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রসংঘের যুদ্ধাপরাধ আদালতের প্রাক্তন সদস্য জিওফ্রে রবার্টসন স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন-আমেরিকা আগ্রাসনের অপরাধে অপরাধী। নুরেমবার্গ ট্রায়ালে এই ধরনের আগ্রাসনকে 'সর্বোচ্চ অপরাধ' বলা হয়েছিল। সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ জেরেমি পলও পরিষ্কার করে দিয়েছেন, এটি কোনও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অভিযান নয়। আন্তর্জাতিক আইনে অন্য কোনও দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করার কোনও ক্ষমতা আমেরিকার নেই। তবুও আমেরিকা যুক্তি খুঁজছে। কখনও বলা হচ্ছে নির্বাচনের কারচুপি, কখনও মাদক পাচার, কখনও সন্ত্রাসবাদের মদত। বলা হচ্ছে, বিচার বিভাগের অনুরোধেই এই পদক্ষেপ। কিন্তু এই সব যুক্তি কি কোনও দেশের মাটিতে ঢুকে রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ করার বৈধতা দেয়? যদি দেয়, তবে আগামী দিনে যে কোনও শক্তিধর দেশ নিজের সুবিধামতো অভিযোগ তুলে অন্য দেশের সরকার উৎখাত করতে পারে। সেটাই কি বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ? সবচেয়ে উদ্বেগজনক ট্রাম্পের বক্তব্য। মাদুরোকে বন্দি করার পর তিনি গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করেছেন- ভেনেজুয়েলার সামরিক শক্তি অল্প সময়ের মধ্যেই নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছে।শুধু তাই নয়, ভেনেজুয়ালর তেলের ভাণ্ডার দখলের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। মার্কিন তেল সংস্থাগুলিকে সেখানে ঢোকার অনুমতিও দিতে চান তিনি। এতে আর কোনও সন্দেহ থাকে না- এই অভিযানের প্রকৃত লক্ষ্য গণতন্ত্র বা আইন নয়, লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার তেল। এই ঘটনাকে হাল্কা করে দেখার সুযোগ নেই। আজ ভেনেজুয়েলা, কাল কে? এই নির্লজ্জ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কি আগামী দিনে চিনকে উসকে দেবে তাইওয়ানের দিকে হাত বাড়াতে? যদি শক্তিই শেষ কথা হয়, তবে আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রসংঘের- সবই অর্থহীন হয়ে পড়ে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এই ঘটনার নিন্দা করেছে। রাষ্ট্রসংঘ একে 'বিপজ্জনক নজির' বলে স্বীকার করেছে। রাষ্ট্রসংঘ যখন বারবার উদ্বেগ প্রকাশ, নিন্দা ও সতর্কবার্তার ভাষায় কথা বলছে, তখন বাস্তবে তার কোনও প্রভাব পড়ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিধর দেশ একের পর এক আন্তর্জাতিক আইনভেঙে সামরিক অভিযান চালিয়েও কার্যত কোনও জবাবদিহির মুখে পড়ছে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে- রাষ্ট্রসংঘের কি আজ কেবল বিবৃতি নির্ভর একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছে? বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশের মতে, ভেনেজুয়েলা ইস্যু আবারও প্রমাণ করল যে আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রসংঘের সনদ মূলত দুর্বল ও উন্নয়নশীল দেশগুলির ক্ষেত্রেই কার্যকর। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির সামনে সেই আইন কার্যত নিষ্প্রভ। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযান এবং তার পর রাষ্ট্রসংঘের সীমাবদ্ধ প্রতিক্রিয়া গোটা বিশ্বব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে। আজ ভেনেজুয়েলা, আগামী দিনে অন্য কোনও দেশ- এই আশঙ্কাই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা হয়ে উঠছে। রাষ্ট্রসংঘ যদি এই ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়, তবে বিশ্ব মঞ্চে তার প্রাসঙ্গিকতা আদৌ কতটা থাকবে, তা নিয়েই নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। মাদুরোকে অপহরণ শুধু ভেনেজুয়েলার উপর আঘাত নয়। এটি গোটা বিশ্বের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত। আজ যদি এই আগ্রাসনের জবাব না আসে, তবে আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতি আরও নিষ্ঠুর, আরও অস্থির এবং আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে- সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।