নোবেল শান্তি পুরস্কার- যে সম্মান মানবসভ্যতার নৈতিক উচ্চতার প্রতীক বলে বিবেচিত- তা কি আদৌ ব্যক্তিগত কূটনৈতিক দরকষাকষির বস্তু হতে পারে?ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো নিজের প্রাপ্ত নোবেল শান্তি পুরস্কারের মেডেল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে তুলে দিয়ে সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছেন। আর সেই ঘটনার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে নোবেলের কৌলীন্য, আন্তর্জাতিক রাজনীতির নৈতিকতা এবং ক্ষমতার নির্লজ্জ ব্যবহার-সবই আজ কাঠগড়ায়।মাচাদোর দাবি, ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার প্রশ্নে ট্রাম্পের ভূমিকার স্বীকৃতি দিতেই তিনি এই 'সৌজন্য' দেখিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, এটি নিছক সৌজন্য নয়-এ এক রাজনৈতিক বিনিয়োগ। যে ট্রাম্প এক সময় মাচাদোকে সমর্থন করেছিলেন, আবার পরমুহূর্তেই ভেনেজুয়েলার ক্ষমতার সমীকরণ বদলে ডেলসি রডরিগেজকে অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছিলেন, তার কাছ থেকে ভবিষ্যৎ সমর্থন আদায়ের মরিয়া চেষ্টা হিসেবেই এই 'নোবেল হস্তান্তর'- কে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এই ঘটনা ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও নগ্ন করে দিয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনি কারচুপির অভিযোগ, মাদুরোর ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা, মার্কিন হস্তক্ষেপ, অপহরণ রাজনীতি- সব মিলিয়ে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই পরাশক্তির দাবার বোর্ড। আর সেই দাবার ঘুঁটি হিসেবেই নিজেকে প্রমাণ করলেন মাচাদো। ট্রাম্প যে তাকে ভেনেজুয়েলার মসনদে বসাবেন- এই আশা অবাস্তবই নয়, রাজনৈতিক দৃষ্টিতে হাস্যকর। ট্রাম্পের অস্থির, আত্মকেন্দ্রিক চরিত্র ইতিহাসে বারবার প্রমাণ করেছে তিনি কাউকেই দীর্ঘদিন বিশ্বাসযোগ্য সঙ্গী মনে করেন না।নোবেল শান্তি পুরস্কার কি এতটাই মূল্যহীন যে ক্ষমতার দরজায় কড়া নাড়তে তাকে 'উপহার' হিসেবে দেওয়া যায়? নরওয়ের সংসদ সদস্য তাইগেভ স্ল্যাহসভোল্ড ভেদামের মন্তব্য তাই শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং আন্তর্জাতিক বিবেকের প্রতিধ্বনি-ট্রাম্প এই পুরস্কার গ্রহণ করে নীচ মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। একই সঙ্গে মাচাদোও প্রমাণ করেছেন, নৈতিকতার বুলি যত বড়ই হোক, ক্ষমতার লোভতার চেয়েও বড়। যে ট্রাম্প কয়েক মাস ধরে প্রকাশ্যেই অভিমান করে বলে বেড়িয়েছেন, 'এত যুদ্ধ থামালাম, তবু নোবেল পেলাম না'-তার হাতে এই মেডেল তুলে দেওয়া মানে সেই অসুস্থ আত্মপ্রেম আর অহংকারকে আন্তর্জাতিক বৈধতা দেওয়া।ট্রাম্প যে আগ্রহ ভরে মেডেলটি গ্রহণ করেছেন,হোয়াইট হাউসে সাজিয়ে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন-তা তার মানসিকতার পরিচয়। নোবেল তার কাছে শান্তির স্বীকৃতি নয় বরং আত্মমুগ্ধতার অলঙ্কার।এখানেই প্রশ্ন ওঠে-নোবেল শান্তি পুরস্কার কি ব্যক্তিগত সম্পত্তি, যা রাজনৈতিক লাভের আশায় 'উপহার' দেওয়া যায়? নোবেল কমিটি স্পষ্ট করেই জানিয়েছে, পুরস্কারের প্রাপক বদলানো যায় না। অর্থাৎ, আইনত ও নৈতিকভাবে ট্রাম্প নোবেলজয়ী নন। তবু ট্রাম্প যেভাবে সেই মেডেল গ্রহণ করে তাকে হোয়াইট হাউসে রাখার ঘোষণা করেছেন, তা তার দীর্ঘদিনের আত্মপ্রচারমূলক মানসিকতার সঙ্গেই সাযুজ্যপূর্ণ। শান্তির নোবেল যেন তার কাছে যুদ্ধ থামানোর স্বীকৃতির চেয়েও বেশি-ব্যক্তিগত অহং তৃপ্তির একটি ট্রফি।অন্যদিকে, মাচাদোর অবস্থান আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ। যার লড়াই গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও মানবাধিকারের জন্য, তিনিই কি না সেই সংগ্রামের প্রতীকস্বরূপ পাওয়া সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক সম্মানকে ব্যবহার করছেন রাজনৈতিক 'ঘুষ' হিসেবে। নরওয়ের সংসদ সদস্য থেকে শুর করে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ তাই প্রশ্ন তুলছেন- মাচাদো কি আদৌ নোবেল শান্তি পুরস্কারের আদর্শকে সম্মান করেন?সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই ঘটনায় নোবেল পুরস্কার নিজেই যেন এক অস্বস্তিকর বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে। যে পুরস্কার নৈতিক নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের প্রতীক, তা আজ ক্ষমতার রাজনীতিতে দরকষাকষির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে- এই ধারণা যদি প্রতিষ্ঠিত হয়,তবে নোবেলের মর্যাদাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়- ট্রাম্প কি সত্যিই ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্র ফেরাতে উদ্যোগী হবেন, না কি এই 'সান্ত্বনার নোবেল' গ্রহণ করেই আবার নতুন কোনো অস্থির সিদ্ধান্তে হাঁটবেন? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ট্রাম্পের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সম্ভাবনাই বেশি। আর তাতে মাচাদোর এই অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত ইতিহাসে জায়গা করে নেবে এক ব্যর্থ রাজনৈতিক জুয়ার উদাহরণ হিসেবেই- যেখানে নোবেল হারাল তার মর্যাদা, আর রাজনীতি পেলো আরেকটি নগ্ন মুখোশ।