যন্ত্রের যুগে লোকজ ছন্দ,গ্রামীণ সংস্কৃতির শেষ প্রহরী গাইল-সেকাইট!!
অনলাইন প্রতিনিধি :-যৌথ পরিবারের সেই কহাসিমুখ কবেই হারিয়ে গেছেই এখন বেশিরভাগই একাকী জীবন। দিন দিন প্রযুক্তি তার নতুন নতুন চমক দেখাচ্ছে। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ পথের ইতিহাস। হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ সংস্কৃতি, গ্রামীণ ঐতিহ্য, গ্রামীণ ব্যবসা। উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতি এবং বেসরকারীকরণ ও এই সমস্ত গ্রামীণ ব্যবসাকে উবিয়ে দেবার অন্যতম একটি কারণ। এখন বাঙালির পৌষ মাস চলছে। শীতের এই মাস পিঠেপুলির মাস। নিকট অতীতেও এই পিঠেপুলি তৈরি করতে একটা জিনিস অপরিহার্য ছিল সেটা হলো “গাইল”। এই গাইলেই চাল গুঁড়ো করে গুঁড়ি তৈরি করে পিঠে বানানো হয়। চালের গুঁড়োর পিঠে সবচেয়ে সুস্বাদু। কিন্তু গাইল নিজেই আজ অস্তিত্ব সংকটে।চাল কল সহ বেশিরভাগ মেশিনে এখন চাল কুটা যায়। গুঁড়ি তৈরি করা যায়।আর বাড়িতে তো মিক্সচার গ্রাইন্ডার আছেই।এরপরও পৌষ পার্বণ এলে কল্যাণপুরের সামান্য কিছু অংশে গাইলের শব্দ শোনা যায়। গাইল মূলত একটি বড় কাঠের পাত্র। যাতে চাল অথবা অন্যান্য মশলা এবং জিনিস ফেলে সেকাইট নামক একটি মোটা লাঠি দিয়ে চাপ দিয়ে চাল ইত্যাদি গুঁড়ো করা হয়।
এই কাজের অভিনব এক গ্রামীণ ছন্দ আছে। কারণ একাধিক মহিলা এই কাজ একসাথে করেন। মিক্সচার গ্রাইন্ডার সেই ছন্দ চেনে না। ঘুরতে ঘুরতে কল্যাণপুরের এডিসি ভিলেজ রজনী সর্দার পাড়ার গোয়াং ফাং এলাকার বীরেশ্বর দেববর্মার সাথে দেখা। ছেড়া গামছা পরে তিনি যেন সংস্কৃতিকে ধরে রাখতে এক অদম্য চেষ্টা এবং ইতিহাসের প্রতিভু হয়ে রয়েছেন। হ্যাঁ। তিনি এখনও অনেক আশা নিয়ে গাইল তৈরি করেন। সেগুন, আম, জাম কাঠের গুঁড়িকে ধীরে ধীরে খোদাই করে গাইলের নির্দিষ্ট রূপ দেওয়া হয়। অনেক আশা নিয়ে গাইল তৈরি করে বিশাল ভারী এই পাত্রগুলো নিয়ে ওই বৃদ্ধ বাজারে হাটে যান। জানান একটি গাইল মরশুমে ১৫০০/১৬০০ টাকাতেও বিক্রি হয়। একটি গাইল বানাতে লেগে যায় অনেকদিন। ওই কাঠশিল্পী অকপটে জানালেন পেট বড় দায়। পেটের তাগিদেই এই কাজ তিনি কয়েক যুগ ধরে করে আসছেন। অন্যদিকে এই কাজ ছাড়া অন্য কোন কাজ তিনি জানেনও না। আগে বিয়ে বাড়িতেও গীত গাইতে গাইতে মহিলারা এই গাইল ব্যবহার করতেন। আজকের ডিজিটাল বিয়েতে এসব প্রাচীন গীত যেমন অপ্রাসঙ্গিক তেমনি একই সারিতে গাইলও।তবুও আজও কল্যাণপুরের গ্রামীণ জনপদে কান রাখলে অল্প হলেও শোনা যায় গাইলের শব্দ। পৌষ পার্বণ এলে কিছু কিছু মা দিদিরা ব্যবহার করেন গাইল। গাইলে যে মোটা কাঠের দণ্ডটি দিয়ে আঘাত করে চাল ইত্যাদির গুঁড়ো তৈরি করা হয় ত্রিপুরার ভাষায় তাকে সেকাইট বললেও অনেক অঞ্চলে এটাকে ছিয়া বা সিয়া বলে। আসলে এখন এমন একটা অবস্থা যেখানে প্রত্যন্ত কোন গ্রামে বিশুদ্ধ পানীয় জল না পৌঁছলেও একটা প্রজন্মের হাত ধরে মোবাইল পৌঁছে গেছে। ফলে তৈরি হচ্ছে প্রজন্ম সংঘাত এবং প্রজন্ম ব্যবধান। আর এর ফলেই সংকটে আজ গাইলের মতো গ্রামীণ সংস্কৃতি। বেঁচে থাকুক গাইল। বেঁচে থাকুক তার অমোঘ গ্রামীণ ছন্দ। বেঁচে থাকুক গাইলের গুঁড়ির পিঠের মিথ্যে স্বাদ।