বুধবার | ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মিতব্যয়িতার বিড়ম্বনা!!

 মিতব্যয়িতার বিড়ম্বনা!!

মিতব্যয়িতা সদগুণ হতে পারে, কিন্তু যখন তা একতরফা হয়, মিতব্যয়িতা তখন তা প্রহসনের অধিক কিছু নয়। ২০২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন যখন জিডিপির ১৪ শতাংশের নিচে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়ে রাজকোষ ঘাটতিকে ৪.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার 'সাফল্য উদ্যাপন করছেন, তখন ভারতের অর্থনীতির অলিন্দে এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ছায়া ঘনীভূত হচ্ছে। এই তথাকথিত আর্থিক শৃঙ্খলা কি সত্যিই সাধুবাদযোগ্য, নাকি এক বৃহৎ ছিদ্রযুক্ত নৌকায় বসে জল সেচার পণ্ডশ্রম? কারণ কেন্দ্রের কৃচ্ছসাধন যখন রাজ্যগুলির লাগামহীন ব্যয়ের গ্রাসে পর্যুদস্ত হয়, তখন অর্থনীতির বুনিয়াদটি তাসের ঘরের মতোই ভঙ্গুর থেকে যায়। সম্প্রতি অধ্যাপক প্রসন্ন তান্ত্রীর গাণিতিক বিশ্লেষণ এক ভয়াবহ সত্যকে উন্মোচিত করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার যখন আধ শতাংশ ঘাটতি কমাচ্ছে, রাজ্যগুলি তখন নিঃশব্দে তিন শতাংশ যোগ করছে। দেশের তেরোটি রাজ্যে রাজকোষ ঘাটতি নির্ধারিত ৩ শতাংশের লক্ষ্মণরেখা অতিক্রম করেছে। সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির সম্মিলিত ঋণ আজ জিডিপি-র ৮৫ শতাংশে উপনীত। এই পাহাড় প্রমাণ ঋণের ভার বহন করার মাশুল কতখানি, তা বোঝা যায় যখন দেখা যায় ভারতের সুদের খরচ আমেরিকার তুলনামূলক বেশি ঋণের চেয়েও বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন্দ্রের ৩৩ লক্ষ কোটি টাকা রাজস্বের এক বিশাল অংশ-প্রায় ১৪ লক্ষ কোটি টাকা- চলে যাচ্ছে কেবল পুরানো ঋণের সুদ মেটাতে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূলধনী বিনিয়োগের বদলে আমরা কি তবে কেবল সুদের ঘানি টানার উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছি? এই সংকটের মূলে রয়েছে এক সর্বজনীন ব্যাধি- 'বিনামূল্যে'র রাজনীতি। ২০০৮ সালে ঋণ মকুব থেকে শুরু হওয়া এই প্রবণতা আজ এক সংক্রামক মড়কের আকার নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কিষান যোজনা থেকে শুরু হয়ে কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা, মহারাষ্ট্র হয়ে বাংলা, সর্বত্রই এখন নগদ বিতরণের প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি। বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিও এই 'ফ্রিবি' বা খয়রাতি সংস্কৃতির মোহ ত্যাগ করতে পারেনি। বাজার ব্যবস্থার ত্রুটি সংশোধন না করে কেবল রাজনৈতিক ভোটব্যাঙ্ক তুষ্ট করতে হাজার দুই-তিন টাকার এই যদৃচ্ছ বন্টন অর্থনীতির ভারসাম্যকে তছনছ করে দিচ্ছে। যেখানে বেসরকারী বিনিয়োগের জন্য অর্থের সংস্থান প্রয়োজন, সেখানে রাষ্ট্রের এই লাগামহীন ঋণগ্রহণ বাজারের সমস্ত সঞ্চয়কে শুষে নিচ্ছে। প্রশ্ন জাগে, শিল্পের পুঁজি আসবে কোথা থেকে? আরও আশঙ্কার কথা হলো রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ভূমিকা। বাজারের সুদের হার নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত ছয় মাসে সাড়ে ছয় লক্ষ কোটি টাকার কারেন্সি নোট নতুন করে ছাপা হয়েছে। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতির ৪ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার সামনে দাঁড়িয়ে এই কৃত্রিম উপায়ে বাজারকে সচল রাখার চেষ্টা কি শেষমেষ মুদ্রার অবমূল্যায়ন ডেকে আনবেন না? অধ্যাপক তান্ত্রীর যুক্তিটি তীক্ষ্ণ এবং অপ্রিয়-নীতি নির্ধারকদের ভুলের মাশুল সাধারণ মানুষ কেন দেবে? সুদের হার বাড়াতে দেওয়া হোক, যাতে অপরিণামদর্শী ব্যয়ের জন্য সরকারকে চড়া মূল্য দিতে হয়। কৃত্রিমভাবে পরিস্থিতি শান্ত রাখার এই প্রচেষ্টা আসলে একটি আগ্নেয়গিরির মুখে ঢাকনা দেওয়ার নামান্তর মাত্র।
অগত্যা, অর্থমন্ত্রীর এই বাজেটকে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। কেন্দ্রের ব্যয় সংকোচনের নিরিখে এটি হয়তো 'রূপান্তরমূলক' কিন্তু জাজ্যগুলির বেহিসেবি উল্লাসের প্রেক্ষাপটে তা এক চূড়ান্ত নিষ্ফলতা। নির্মলা সীতারামন হয়তো আড়ম্বরের বদলে নির্যাসকে বেছে নিয়েছেন, কিন্তু সেই নির্যাস কি রাজ্যগুলির রাজনীতির জোয়ারে ভেসে যাবে না? যখন ক্ষমতার অন্দরমহল থেকে প্রান্তিক স্তরে পৌছানোর আগেই ঋণের বোঝা আকাশ ছুঁয়ে যায়, তখন বাজেট বক্তৃতার চমৎকারিত্ব মরীচিকার মতোই ম্লান শোনায়। ভারতের অর্থনীতি আজ সেই উজান স্রোতে সাঁতার কাটছে, যেখানে এক হাতের কৃচ্ছসাধন অন্য হাতের অপচয়কে রুখতে অপারগ। শেষমেষ কি এই আর্থিক বিড়ম্বনাই তবে আমাদের ললাটলিখন হয়ে থাকবে।।
প্রকৃতপক্ষে,এই গাণিতিক কসরত এক গভীরতর নৈতিক শূন্যতাকে প্রকট করে। অর্থমন্ত্রী যখন কেন্দ্রের খরচে লাগাম টেনে একার হাতে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছেন, রাজ্যগুলি তখন রাজনৈতিক রণক্ষেত্রের খয়রাতি দিয়েই সেই স্বপ্নের সলিলসমাধি ঘটাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, যে অর্থনীতিতে সঞ্চয়ের চেয়ে ঋণের বোঝা বেশি ভারী, সেখানে 'উন্নয়ন' কি কেবল এক প্রকাা শব্দচাতুরী নয়? ভোট কেনার জন্য নগদ বিলানোর এই যে দেশজোড়া মহোৎসব, তার অন্তিমে কি কেবল শূন্য কলসিই পড়ে থাকবে? কেন্দ্র আর রাজ্যের এই বিপরীতমুখী টালবাহানা আসলে এক অদ্ভুত ক্ষমতার লড়াই- যেখানে একদিকে মিতব্যয়িতার ভান, অন্যদিকে অপচয়ের অশুভ উল্লাস। শেষমেষ কি এই ঋণের সংস্কৃতিই ভারতের অর্থনীতির ললাটলিখন হয়ে থাকবে?সম্ভবত ক্ষমতা নিজেই এই প্রশ্নের উত্তর জানে না, অথবা জেনেও
চোখ বুজে প্রলয় গুনছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *