মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের তাপ, রাতেই দিল্লীতে জরুরি বৈঠক মোদির
দৈনিক সংবাদ অনলাইন ডেস্ক, ১ মার্চঃ ইজরায়েল-আমেরিকার হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই নিহত হওয়ার ঘটনার পর পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তেহরানের তরফে পাল্টা হামলা শুরু হওয়ার খবর পরিস্থিতিকে দ্রুত যুদ্ধাবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আঞ্চলিক সংঘাতের এই বিস্তার শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না-তার কূটনৈতিক, জ্বালানি ও নিরাপত্তাগত অভিঘাত সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে ভারতসহ বহু দেশের উপর।
এই প্রেক্ষাপটে রবিবার রাতেই মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটি (ক্যাবিনেট কমিটি অফ সিকিউরিটি)-র জরুরি বৈঠক ডাকেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দু’দিনের রাজস্থান, পদুচেরী, তামিলনাডু রাজ্য সফর শেষে দিল্লী ফিরেই বৈঠকে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যাচ্ছে, নয়াদিল্লী পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছে। সরকারী সূত্রের ইঙ্গিত, মূল আলোচ্য বিষয় হতে পারে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ভারতীয়দের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন, জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক কূটনৈতিক অবস্থান।
মোদির সাম্প্রতিক ইজরায়েল সফরের পর ইরানে হামলা চালান ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নেতৃত্বাধীন সরকার। পরে তেহরানকে নিশানা করে আমেরিকার সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে বহুমাত্রিক রূপ দেয়। এই ঘটনাক্রমকে কেন্দ্র করে দেশের বিরোধী দলগুলি রাজনৈতিক কটাক্ষ শুরু করলেও, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে ভারতের ভূমিকা এখন অনেক বেশি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের দাবি রাখছে।
ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত নীতি- ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’- এই সংকটে কঠিন পরীক্ষার মুখে। একদিকে ইজরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে জ্বালানি ও আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প- দুই ক্ষেত্রেই ভারতের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ জড়িত। ফলে প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়ার আগে নয়াদিল্লী অত্যন্ত হিসাবি পদক্ষেপ নিতে চাইছে বলেই ইঙ্গিত মিলছে।
এবং আশপাশের উপসাগরীয় দেশগুলিতে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় কর্মরত। সংঘাতের জেরে একাধিক দেশ আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। মাঝেমধ্যেই মিসাইল হামলার সতর্কতা জারি হওয়ায় বিমানপথে সরাসরি উদ্ধার অভিযান এখন ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে স্থল ও সমুদ্রপথ মিলিয়ে বিকল্প রুট খোঁজার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অতীতে ইয়েমেন, ইউক্রেন বা সুদানের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে ভারত সফল উদ্ধার অভিযান চালালেও বর্তমানে পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। কারণ একাধিক শক্তিধর দেশের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং সংঘাতের পরিসর দ্রুত বদলাচ্ছে। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডর। এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। ইতিমধ্যেই ইরান এই প্রণালী বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। তাছাড়া একটি তেলবাহী জাহাজে ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে। সংঘাত তীব্র হলে এই জলপথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভারতের জ্বালানি আমদানির বড় অংশই পশ্চিম এশিয়া নির্ভর। ফলে সরবরাহ ব্যাহত হলে তার প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে দেশের অর্থনীতিতে।
নয়াদিল্লী তাই কেবল মানবিক উদ্ধার নয়, জ্বালানি কৌশল নিয়েও সমান্তরাল প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেই কূটনৈতিক মহলের অনুমান। বিকল্প সরবরাহ উৎস, কৌশলগত মজুত এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের প্রশ্নও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত করা। ইজরায়েল ও আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনই ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। সরাসরি পক্ষ নেওয়ার বদলে শান্তি ও সংযমের আহ্বানই সম্ভবত ভারতের কূটনৈতিক ভাষ্য হবে।
রবিবার রাতের নিরাপত্তা বৈঠক তাই কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নির্ধারণের জন্য নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অবস্থান তৈরির ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা কোন দিকে গড়ায়, তা সময়ই বলবে। তবে স্পষ্ট- এই সংকট শুধু আঞ্চলিক নয়, এর অভিঘাত বৈশ্বিক এবং ভারতের জন্যও তা অত্যন্ত সংবেদনশীল।