শনিবার | ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ভেঙে পড়েছে এডিসির শিক্ষা ব্যবস্থা,কাঞ্চনপুরে ১৪৯টি স্কুলে কার্যত পঠনপাঠন বন্ধ!!

 ভেঙে পড়েছে এডিসির শিক্ষা ব্যবস্থা,কাঞ্চনপুরে ১৪৯টি স্কুলে কার্যত পঠনপাঠন বন্ধ!!

অনলাইন প্রতিনিধি :-২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষে কাঞ্চনপুর মহকুমায় এডিসির শিক্ষা ব্যবস্থার এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। চলতি বছরে এডিসির শিক্ষা দপ্তর থেকে মোট চব্বিশজন শিক্ষক অবসর গ্রহণ করেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নতুন শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের স্থানে অন্য স্কুল থেকে শিক্ষক সাময়িকভাবে সমন্বয় করে তবেই তাদের অব্যাহতি দিতে হয়েছে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার নাজুক অবস্থা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।অভিযোগ উঠেছে, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শনেও উদ্যোগী হতে পারেনি এডিসির শিক্ষা বিভাগ। একদিকে শিক্ষক সংকট অন্যদিকে প্রশাসনিক উদাসীনতা - দুইয়ের চাপে শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। শুক্রবার কাঞ্চনপুর স্কুল পরিদর্শক জীবন কিশোর ঘোষ দাবি করেন, মহকুমার এডিসি অধীন অধিকাংশ স্কুল কাগজে কলমে খোলা থাকলেও বাস্তবে পঠনপাঠন প্রায় বন্ধ। তার কথায় একজন শিক্ষক দিয়ে কীভাবে একটি সম্পূর্ণ স্কুল পরিচালিত হবে? সিঙ্গল টিচার স্কুলের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে, অথচ নিয়োগের কোনো উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরে দেখা যাচ্ছে না। তথ্য অনুযায়ী কাঞ্চনপুর মহকুমায় এডিসির শিক্ষা বিভাগ দুটি ভাগে বিভক্ত। দশদা-আনন্দবাজার অঞ্চলে রয়েছে ৭৭টি স্কুল এবং লালজুরি-জম্পুই অঞ্চলে ৭২টি স্কুল।সর্বমোট ১৪৯টি স্কুলের দায়িত্ব দুইজন স্কুল পরিদর্শকের উপর ন্যস্ত। এত বিপুল সংখ্যক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।বিশেষত দুর্গম পূর্ব ভাণ্ডারিমা অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও শোচনীয়। সেখানে এডিসির অন্তত পাঁচটি স্কুল কার্যত বন্ধ অবস্থায় রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ। যদিও সরকারী নথিতে সেগুলি সচল দেখানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বছরের অধিকাংশ সময় স্কুলে ক্লাস হয় না। ছাত্রছাত্রীরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে থাকে। অন্যান্য প্রত্যন্ত এলাকাতেও একই চিত্র। অধিকাংশ সিঙ্গেল টিচার স্কুলে নিয়মিত পাঠদান সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ক্লাস টু বা থ্রির বহু ছাত্রছাত্রী নিজেদের নাম পর্যন্ত সঠিকভাবে লিখতে পারে না। এমন অভিযোগ স্থানীয় মহল থেকে উঠেছে। প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তিই যেখানে দুর্বল সেখানে উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে। পরিকাঠামোগত সমস্যাও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল, স্কুল ভবনের অবস্থা অনেক ক্ষেত্রে জরাজীর্ণ। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই বহু ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। অর্থনৈতিক অনটন, পারিবারিক দায়িত্ব এবং প্রশাসনিক নজরদারির অভাব সব মিলিয়ে ড্রপ আউটের সংখ্যা প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। গত দুই থেকে তিনদশকে এডিসি এলাকার শিক্ষার উন্নয়নে যে দূরদর্শী পরিকল্পনা প্রয়োজন ছিল তা বাস্তবায়িত হয়নি। শিক্ষক নিয়োগে দীর্ঘসূত্রিতা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু স্কুল এখন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। পূর্ব ভাণ্ডারিমা এলাকার একাধিক অভিভাবক জানান, তাদের সন্তানরা ঠিক কবে শেষবার নিয়মিত ক্লাস করেছে তা তারাও নিশ্চিত নন। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার মান ক্রমাগত নিম্নমুখী হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সচেতন মহল।এডিসি এলাকার জনজাতি সম্প্রদায়ের অধিকাংশ পরিবার আর্থিকভাবে অনগ্রসর। জঙ্গলের বাঁশ, ছন বা জ্বালানি কাঠ বিক্রি করে কোনোরকম সংসার চালাতে হয়। পেটের দায়ে শিশুদেরও অল্প বয়সেই পারিবারিক কাজে যুক্ত হতে হয়। ফলে পড়াশোনা নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। ফোর বা ফাইভ পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করেও অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী উচ্চশিক্ষায় এগোতে পারে না। সরকারী চাকরি বা অন্য পেশায় প্রবেশের সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে এক প্রজন্মের পর আরেক প্রজন্ম একই দারিদ্র্য চক্রে আবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। শিক্ষাবিদদের মতে অবিলম্বে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। সিঙ্গেল টিচার স্কুলের সংখ্যা কমিয়ে প্রত্যেক বিদ্যালয়ে ন্যূনতম শিক্ষক নিশ্চিত করা জরুরি। কাঞ্চনপুর মহকুমার এডিসি শিক্ষা ব্যবস্থার এই চিত্র এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কাগজে-কলমে বিদ্যালয় সচল থাকলেও বাস্তবে শিক্ষার আলো বহু দূরেই রয়ে গেছে। প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি তুলেছে স্থানীয় বাসিন্দারা। শিক্ষাই একটি সমাজের উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার। অথচ সেই শিক্ষাই যদি অবহেলার শিকার হয় তবে গোটা অঞ্চল অগ্রগতির মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে -এমন আশঙ্কাই এখন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে এডিসি এলাকায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *