January 8, 2026

বিচারের বাণী

 বিচারের বাণী

আজীবন কারাবাসের সাজাপ্রাপ্ত ধর্ষক যদি পাঁচ বছরের মাথায় উচ্চ আদালতে জামিনে মুক্ত হয়, তবে অপরাধীর অপরাধ মাফ হয়ে যায় কিনা এবং এহেন অবস্থানকে ভারতীয় সংবিধান স্বীকার করে কিনা, সেই প্রশ্নটি বিশেষজ্ঞদের বিবেচনার জন্য তোলা থাক। বিচারের এহেন বাণী পুরুষতন্ত্রের নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার জয়, সে বিতর্কও আপাতত তোলা থাক। কিন্তু সত্য এই যে, সাড়ে আট বছর পর উন্নাওয়ের সেই ভয়ানক স্মৃতি আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে।নতুন করে উদ্বিগ্ন, আতঙ্কিত নির্যাতিতা ও তার পরিবার।
উত্তরপ্রদেশের উন্নাওয়ে নাবালিকার গণধর্ষণে দোষী সাব্যস্ত হয়ে যাবজ্জীবন সাজা পাওয়ার পরেও, সম্প্রতি দিল্লী হাইকোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চ প্রাক্তন আসামির সাজা স্থগিত রেখে তাকে জামিনে মুক্তির যে রায় দিয়েছে, তা আদতে নতুন ভারতের বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেই প্রকট করেছে। নির্দিষ্ট করে বললে, নাবালিকা গণধর্ষণে দোষী সাব্যস্ত প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক কুলদীপ সেঙ্গারের সাজা স্থগিত ও জামিন শর্তসাপেক্ষ হলেও- সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ঘটনার অভিঘাত রাজনৈতিক ও সামাজিক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। রাহুল গান্ধী টুইট করেছেন, ‘আমরা একটি মৃত অর্থনীতি-ই শুধু নই, একটি মৃত সমাজও গড়ে তুলছি’
২০১৭সালের জুনে উন্নাওয়ে ঘটে যায় একটি নৃশংস গণধর্ষণের ঘটনা। ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত কুলদীপ সেঙ্গার তখন উন্নাওয়ের বিজেপির বিধায়ক ছিলেন। জনদাবি ও বিক্ষোভের পর মামলা সিবিআইয়ের কাছে যায়। ২০১৮ সালে সেঙ্গার গ্রেপ্তার হন। ২০১৯ সালে দিল্লী আদালত তাকে ধর্ষণসহ সংশ্লিষ্ট অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা দেয়। দলীয় নেতৃত্বের নির্দেশে বিধায়ক পদে ইস্তফা দেন সেঙ্গার। কিন্তু সাজা পাওয়া সত্ত্বেও তার প্রভাব, এমনকী জেলের ভিতরেও, নির্যাতিতার পরিবারের উপর ভয়াচ্ছন্নতার ছায়া ফেলে। নির্যাতিতার বাবার পুলিশি হেফাজতে মুত্যু হয়, প্রধান সাক্ষীকেও সরিয়ে দেওয়া হয় দুনিয়া থেকে, যা দিনের শেষে ক্ষমতার প্রতাপ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতাকেই স্পষ্ট করে। উন্নাওয়ের এই ঘটনা এবং সিবিআইয়ের পদক্ষেপই দেখাচ্ছে, দেশের সংবেদনশীল বিচার ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক স্বার্থের মধ্যে যে ফাঁক, তা কতটা গভীর। নির্যাতিতার নিরাপত্তা ও ন্যায় নিশ্চিত করতে কঠোর, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপই এখন সবচেয়ে জরুরি।দিল্লী হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ একাধিক শর্ত আরোপ করে সেঙ্গারকে জামিন দিয়েছে বটে, কিন্তু সেই শর্তগুলি কোনওভাবেই ন্যায় নিশ্চিত করতে পারে না। এহ বাহ্য, এই রায় সমাজের ন্যায়বোধকেই চ্যালেঞ্জ করেছে। এমন বর্বরতার পর যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীকে জামিন দেওয়া মানে সমাজে ভয়ের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া। বিলকিস বানোর ঘটনায় সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদের মুক্তি, মহিলা কুস্তিগিরদের অভিযোগ সত্ত্বেও ব্যবস্থা না-নেওয়া এবং কুলদীপ সেঙ্গারের জামিন- সব ক্ষেত্রেই একটি অভিন্ন বিষয় লক্ষণীয়, শাসকের সম্পূর্ণ নীরবতা। এটাই সর্বাপেক্ষা আতঙ্কের।নির্যাতিতা প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা চেয়েছিলেন। তারা কেউ সাড়া দেননি। নির্যাতিতার পাশে দাঁড়ানোর যে কর্তব্যটি পালনের কথা ছিল শাসকের, তার পরিবর্তে রাহুল গান্ধী এগিয়ে আসায় অতি সংবেদনশীল মানবিক একটি ঘটনার সঙ্গে রাজনীতিও জড়িয়ে গেল। রাহুলও এমন কথা বলার সুযোগ পেয়ে গেলেন যে, ‘একজন গণধর্ষণের নির্যাতিতার সঙ্গে এমন ব্যবহার কি ন্যায্য? তার অপরাধ কী, ন্যায় চাইতে সাহস করা? উন্নাও-কাণ্ডে শাসকের দীর্ঘ নীরবতা এবং কুলদীপ সেঙ্গারের জামিন- সবই দেখায়, ন্যয় প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব কী। রাজনৈতিক স্বার্থকে বিচার ব্যবস্থার উপর চাপিয়ে দিলে শুধু নির্যাতিতার ক্ষতি হয় না, পুরো সমাজই ভেঙে পড়ে।নির্যাতিতার নিরাপত্তা, সম্মান এবং ন্যায় নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অপ্রতিহত দায়িত্ব। উন্নাও কেবল একটি মামলা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও সামাজিক ন্যায়ের প্রতিফলন। প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সংবাদমাধ্যমের দায় এবং তাদের নীরবতা- সবই আমাদের বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে। যদি ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হয়, সমাজে ভয়ের স্থান তৈরি হয়, আর নির্যাতিতারা বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হয় তার চেয়ে আতঙ্কের আর কিছু নেই।রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ন্যায় বিচারের প্রত্যাশা ভারতবাসী বহু যন্ত্রণায় ত্যাগ করেছে। যে প্রতিষ্ঠানটির উপর মানুষের শেষ ভরসা, তা বিচারবিভাগ। কিন্তু, দেশের উচ্চ আদালতেও যদি বিচারের বাণীর এমন হাহারব হয়, সেটি অতি দুশ্চিতার বিষয়। আদালতের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা বজায় রেখেও সব নিয়ে প্রশ্ন করতে হয়, এই কি ন্যায্য বিচার?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *