রবিবার | ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশ বাংলাদেশেই!!

 বাংলাদেশ বাংলাদেশেই!!

বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই টাকার খেলা। এর অর্থ কেবল পয়সাওয়ালাই ভোটে লড়ছে এমন নয়। অনেক পয়সাওয়ালা ফতুর হবেন জেনেও টাকা খরচ করছেন। আবার অনেক বড়লোক যারা আগেই ফতুর হয়ে বসে আছেন তারাও নানান পথে টাকা জোগাড় করে ভোটে লড়ছেন এই ভরসায়, জিতে এলে পয়সা আসবে। বাংলাদেশে নাকি একটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করলেও প্রার্থীকে কোটি টাকা খরচ করতে হয়। জাতীয় সংসদের নির্বাচনে তো কথাই নেই। আগে হাসিনার আমলে যখন একতরফা নির্বাচন হতো তখনও সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা কোটি কোটি টাকা খরচ করতেন। এখন নাকি তা বেড়ে গেছে অনেকগুণ। অনেক প্রার্থীকে নির্বাচনের জন্য দলীয় তহবিলে মোটা অঙ্কের টাকা জমা দিতে হয়। যাঁরা এই টাকার জোগান দিতে পারেন না, তিনি দলের জন্য যতই আত্মনিবেদিত হোন না কেন মনোনয়ন পান না। আর যারা টাকা দিতে পারেন তারা দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থেকেও মনোনয়ন পান। এই ক্ষেত্রে ভারতীয় দলগুলির সঙ্গে তাদের তেমন কোনো ফারাক নেই। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বড় কয়েকটি দলে নাকি মনোনয়ন বেচায় এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে প্রার্থীদের হলফনামার ভিত্তিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নামক একটি সংস্থা প্রার্থীদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্যের ভিত্তিতে রিপোর্ট বের করছে। তাদের হিসাবে, আসন্ন সংসদ নির্বাচনে কোটিপতি প্রার্থী রয়েছেন ৮৯১ জন। শতকোটির মালিক ২৭ প্রার্থী। ১০টি রাজনৈতিক দলের তথ্য তুলে ধরে সংস্থাটি জানিয়েছে, বিএনপির ৫৯ দশমিক ৪১ শতাংশ প্রার্থী ঋণগ্রস্ত দ্বিতীয় অবস্থানে নির্দল প্রার্থীরা। তাদের ক্ষেত্রে এই হার ৩২ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং তৃতীয় স্থানে জাতীয় পার্টি, তাদের ২৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ প্রার্থী রয়েছে ঋণগ্রস্ত। সংসদ নির্বাচনে মোট প্রার্থীর সাড়ে ২৫ শতাংশেরই কোনো না কোনো ঋণ বা দায় আছে। প্রার্থীদের সর্বমোট ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাঙ্ক ঋণ ১৭ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। নির্বাচনের আগে এই ঋণ শোধ হলে ব্যাঙ্কগুলো বেঁচে যেত। কিন্তু ঋণের বোঝা এড়াতেই এরা ভোটে দাঁড়ায়। এই তথ্যগুলি নির্বাচনি হলফনামায় প্রার্থীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। প্রকৃত হিসাবে কোটিপতি ও ঋণ খেলাপির সংখ্যা আরও অনেক বেশি। তাদের অনুসন্ধানে অবাক করা যে তথ্যটি পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো বিদেশি নাগরিকত্ব রয়েছে এমন তথ্য ও বিদেশে তাদের সম্পদের তথ্য গোপন করে প্রার্থী হয়েছেন ছয় জন। বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম জানাচ্ছে, এসব তথ্যের বিপরীতে অন্য রকম প্রার্থীও রয়েছে। ক্রাউড ফান্ডিং করে ভোটের খরচ মেটাচ্ছেন কেউ কেউ। তাও শ্রমজীবী মানুষের অনুদানের টাকায়। নবাগত এনসিপির মতো লোকদেখানো ক্রাউন্ড ফান্ডিং নয়। শ্রমজীবী মানুষের কাছ থেকে মাটির ব্যাঙ্কের মাধ্যমে যিনি টাকা সংগ্রহ করছেন, তিনি বরিশাল-৫ (সদর) আসনের প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ও গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন হাসিনার পতনের পর অবস্থার সংস্কারে নানান কমিশন গড়ার পরও সেই দেশের রাজনৈতিক দলের সংস্কৃতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি, তা প্রার্থীদের হলফনামা থেকেই স্পষ্ট। যাঁরা হলফনামায় অসত্য তথ্য দিয়েছেন, তারা নির্বাচিত হলে জনগণের চেয়ে নিজের সেবায়ই যে অধিক ব্যস্ত থাকবেন, সেকথা হলফ করে বলা যায়। প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বাসদের প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন মনীষা। ওই নির্বাচনে মাটির ব্যাঙ্কের টাকায় নির্বাচনি ব্যয় নির্বাহের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে তিনি আলোচনায় এসেছিলেন। তার নির্বাচনি তহবিল সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি মানুষের নজর কেড়েছিল। প্রচার শুরুর আগেই কয়েকশ ছোট মাটির ব্যাঙ্ক তুলে দিয়েছেন দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মাঝে। অর্থদাতাদের বেশিরভাগই ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইক চালক ও বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক।অনেক শ্রমিক খুশিমনে টাকা দিয়ে মনীষা চক্রবর্তীকে সহযোগিতা করছেন। কারণ শ্রমিক, ভ্যানচালক,রিকশাচালকেরা যখন পীড়ন বা হয়রানি শিকার হয়েছেন, মনীষা তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের জন্য আন্দোলন করে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন তিনি। আরও একজন গরিব প্রার্থীর সন্ধান পাওয়া গেছে, তিনি হলেন ঢাকা-১২ আসনে আমজনতার দলের প্রার্থী তারেক রহমান। তাকে আম তারেক বলেই সবাই চেনন। কমিশনের হলফনামায় সবচেয়ে গরিব প্রার্থী। তার নামে গাড়ি, বাড়ি, জমি, ফ্ল্যাট কিছুই নেই। পেশা হিসেবে ব্যবসা উল্লেখ করে তারেক ১০ লাখ ৫৯ হাজার ১৪৩ টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন। আর বার্ষিক আয় সাড়ে ৪ লাখ টাকা। ঢাকায় নাগরিক অধিকারের পক্ষে সবসময় সোচ্চার হিসাবে পরিচিত মিজানুর রহমান। তিনি ঢাকা-৪ আসনে নির্দল প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। একবার পাইপের নোংরা জল তুলে নিয়ে জল দপ্তরের এমডিকে খাওয়াতে গিয়েছিলেন। সেই ঘটনা থেকে তিনি আলোচনায় এসেছিলেন।
মিজানুর রহমানও ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে নির্বাচনি খরচ সংগ্রহ করছেন। অনেকেইে এগিয়ে এসেছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ টাকা সংগ্রহ হয়েছে তারা জানাচ্ছে সংবাদ মাধ্যম। এরকম ছোট ছোট দলের বা নির্দল প্রার্থীরা জনসাধারণের কাছে তহবিল সংগ্রহ করে নির্বাচনি ব্যয় মেটাচ্ছেন অনুসন্ধানকারী সংস্থা টিআইবির তথ্যানুযায়ী, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের ২৭ জন শত কোটিপতি। তাদের মধ্যে ১৬ জন বিএনপির। ৯ জন স্বতন্ত্র। যাদের সবাই বিএনপির নেতা। প্রার্থীদের ব্যাঙ্ক এবং অন্যান্য ঋণ রয়েছে ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকার। বিএনপির ২৮৮ প্রার্থীর মধ্যে ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ ঋণগ্রস্ত। জামায়াতের ২২৪ প্রাথীর ২২ শতাংশ ঋণগ্রস্ত।শীর্ষ ঋণগ্রস্ত ১০ প্রার্থীর আটজন বিএনপির। শত বিঘার চেয়ে বেশি জমির মালিক ১০ প্রার্থী। প্রার্থীদের সম্পদের পরিমাণ ৬ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। তবে তাদের করযোগ্য আয় ৬৯৩ কোটি টাকা। তারা ৫৪ কোটি ৬৮ লাখ টাক কর দিয়েছেন। ২৫৯ প্রার্থীর তুলনায় তাদের নির্ভরশীল এবং ২৮২ প্রার্থীর তুলনায় তাদের স্বামী বা স্ত্রী স্থাবর অস্থাবর সম্পদ বেশি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *