January 8, 2026

পূর্বপরিকল্পিত ট্রিগার

 পূর্বপরিকল্পিত ট্রিগার

Anti-government protestors celebrate in Dhaka on August 5, 2024. Protests in Bangladesh that began as student-led demonstrations against government hiring rules in July culminated on August 5, in the prime minister fleeing and the military announcing it would form an interim government. (Photo by Abu Sufian Jewel / Middle East Images / Middle East Images via AFP)

বাংলাদেশ আজ আর শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অস্থিরতার একজ্বলন্ত উপাখ্যান। ওসমান হাদির মৃত্যুর পর যে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে, তা কোনও স্বতঃস্ফূত গণআন্দোলনের চেহারা নেয়নি-বরং পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞের রূপ নিয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যে থেকে ঢাকাসহ গোটা বাংলাদেশে যে বিক্ষোভের নামে লুট, অগ্নিসংযোগ ও হামলা চলছে, তা গণতন্ত্রের নয়, বরং নৈরাজ্যের নগ্ন প্রদর্শনী।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, এই সহিংসতার নিশানায় পড়েছে প্রগতিশীল সংবাদমাধ্যম, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং কূটনৈতিক স্থাপনা। সাংবাদিকদের উপর হামলা মানেই সত্যের কণ্ঠ রোধ করার চেষ্টা। ছায়ানটের মতো ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগানো মানে সরাসরি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই আক্রমণ করা। আর ভারতীয় দূতাবাস ও আওয়ামী লিগের দপ্তরে হামলা-এ কেবল ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা। প্রশ্ন উঠছে- এই ক্ষোভের অভিমুখ কেন একমুখী? কেন ‘প্রতিবাদী কণ্ঠ’-এর নামে ভারত-বিরোধিতাই হয়ে উঠছে মূল স্লোগান? কেন মুক্তচিন্তার প্রতীক, ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান এবং এবং প্রতিবেশী প্রতিবেশী রাষ্ট্রহ রাষ্ট্রই বারবার আক্রমণের লক্ষ্য? প্রশ্ন উঠছেই-ওসমান হাদির মৃত্যু কি কেবল একটি উপলক্ষ্য? নাকি বহুদিন ধরেই জমে থাকা ভারতবিদ্বেষকে রাস্তায় নামানোর জন্য এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত ট্রিগার? কারণ বিক্ষোভের ধরন, টার্গেট নির্বাচন এবং সংগঠিত হামলার কৌশল স্পষ্টতই ইঙ্গিত দেয়, এর পেছনে সক্রিয় রয়েছে সংগঠিত শক্তি এই জায়গাতেই আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া যায় না। দক্ষিণ এশিয়ায় অস্থিরতা তৈরি করা পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের পুরনো কৌশল নতুন কিছু নয়। আবার সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পরিকাঠামোয় চিনের বাড়তে থাকা প্রভাবও প্রশ্নের বাইরে নয়। ভারত-বাংলাদেশ ঘনিষ্ঠতা যাদের চোখে কাটা, তাদের স্বার্থেই কি এই অস্থিরতা? সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, এই হিংসার নামে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে স্তব্দ করার চেষ্টা। সাংবাদিকদের উপর হামলা এবং প্রগতিশীল কন্ঠ রুদ্ধ করার এই প্রবণতা কার্যত বাংলাদেশকে এক বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিচ্ছে। যে বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতা ও মুক্তচিন্তার ভিত্তিতে, আজ সেই রাষ্ট্রের আত্মাই যেন আক্রান্ত। দিল্লীর জন্যও এই পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের। সীমান্তের ওপারে অরাজকতা মানেই কেবল কূটনৈতিক সমস্যা নয়-এর সরাসরি প্রভাব পড়ে জাতীয় নিরাপত্তা, শরণার্থী পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার উপর। এখানেই সন্দেহ ঘনীভূত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস সাক্ষী- যেখানে নৈরাজ্য, সেখানে অদৃশ্য পরিচালকের হাত থাকে। পাকিস্তানের আইএসআই দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশকে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার স্বপ্ন দেখে এসেছে। অন্যদিকে চিন কৌশলগত প্রভাব বাড়াতে দক্ষিণ এশিয়ায় অস্থিরতা চায়-এটাও নতুন নয়। তাহলে কি এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির নেপথ্যে আবার সেই ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্ত? দিল্লী যে আগাম নিরাপত্তা-শঙ্কা প্রকাশ করেছিল, ভিসা কেন্দ্র বন্ধ করেছিল- আজ তার যৌক্তিকতা আর প্রশ্নাতীত। ভারত শুধু নিজের নাগরিক নয়, গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নিয়েই উদ্বিগ্ন ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ প্রশাসন কি সেই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দিয়েছিল? নাকি রাজনৈতিক হিসাব নিকাশে চোখ বন্ধ রেখেছিল? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-বাংলাদেশ কোন্ পথে হাঁটছে? মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও প্রতিবেশী সহাবস্থানের পথে, নাকি অন্ধ উগ্রতা ও বহিঃশক্তির ইশারায় পরিচালিত অস্থিরতার পথে?
প্রতিবাদ গণতন্ত্রের অধিকার। কিন্তু প্রতিবাদের নামে যদি রাষ্ট্র ভাঙার আগুন জ্বলে, যদি সত্য বলার কণ্ঠ রক্তাক্ত হয়, যদি সংস্কৃতি ও কূটনীতিকে নিশানা করা হয়- তাহলে তা আর আন্দোলন থাকে না, তা হয়ে ওঠে গভীর ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার। বাংলাদেশের জন্য এ এক নির্ণায়ক মুহূর্ত। এখনই স্পষ্ট করতে হবে-কারা এই আগুনে ঘি ঢালছে এবং কেন? নইলে এই আগুন শুধু ঢাকায় নয়, গোটা উপমহাদেশেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইতিহাস ক্ষমা করে না-বিশেষত তাদের, যারা ষড়যন্ত্র চিনতে পেরেও নীরব থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *