নীরব মহামারি
এ দেশের ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে নারীদের উপর যে সহিংসতা ঘটে, তাকে আজও আমরা পারিবারিক সমস্যা, নৈতিক বিচ্যুতি বা আইনি মামলার বিষয় বলেই পাশ কাটাই। অথচ পরিসংখ্যান বলছে, এই নীরব হিংসাই লক্ষ লক্ষ নারীর শরীর ও মনকে তিলে তিলে ভেঙে দিচ্ছে, যেন এক অঘোষিত জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়।
ভারতে ‘ইন্টিমেট পার্টনার ভায়েলেন্স’ বা আইপিভি, বাংলায় বললে ‘অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতা’ সাধারণত নৈতিকতা, আইন বা সংস্কৃতির গণ্ডিতেই আটকে থাকে। কিন্তু বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে দেখিয়েছে, আইপিভি আসলে একটি গভীর ও বিস্তৃত জনস্বাস্থ্য সংকট, যা এক নীরব মহামারির অন্য নাম। ‘গ্লোবাল বার্ডন অফ ডিজিস স্টাডি – ২০২৩’-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে ওই গবেষণা স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে, আইপিভি-র শিকার নারীদের মধ্যে ডিপ্রেশন অর্থাৎ অবসাদ, উদ্বেগজনিত রোগ, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার অর্থাৎ আঘাত-পরবর্তী মানসিক চাপজনিত ব্যাধি, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, হৃদরোগ ও পরিপাকতন্ত্রের অসুখ হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি। সবচেয়ে গুরুত্বপর্ণ বিষয় হল, এই স্বাস্থ্যসমস্যাগুলি আগের কোনও রোগ থাকুক বা না থাকুক, তার ঊর্ধ্বে গিয়ে তৈরি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে শরীর ও মনে বাসা বেঁধে থাকে। অর্থাৎ আইপিভি শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষত-ই সৃষ্টি করে না, এটি নারীদের স্বাস্থ্যগত ভবিষ্যৎকে আরও খারাপ করে দেয়, বাড়িয়ে তোলে অসুস্থতা ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নির্ভরতা।
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রজনন বয়সি নারীদের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ল্যানসেট পত্রিকার গবেষণাটি দেখিয়েছে, এই অঞ্চলে নারীদের দুর্বল স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে স্থূলতা, ধূমপান বা মদ্যপানের থেকেও বড় ঝুঁকির কারণ আইপিভি। তবু ভারতে আইপিভি ও স্বাস্থ্যের অন্তর্বর্তী যোগসূত্র আজও খুব কম বোঝা হয়। তার একটি বড় কারণ-গবেষণার জগতে নারীদের স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে উপেক্ষিত। যে কতক স্বাস্থ্যসমীক্ষা হয়, সেগুলিতেও নজর থাকে মূলত প্রসব, গর্ভনিরোধ বা রক্তাল্পতার মতো শারীরিক বিষয়ে। মানসিক স্বাস্থ্য এবং তার মূল চালিকাশক্তি, যার মধ্যে আইপিভি অন্যতম- প্রায় সম্পূর্ণ ভাবে উপেক্ষিত থাকে। এর ফল হিসেবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা আইপিভি-র মুখোমুখি হয় কেবল তার চূড়ান্ত পরিণতিতে, যেমন হাড়ভাঙা, আত্মহত্যার চেষ্টা, বা জটিল প্রসূতি সমস্যার সময়। সহিংসতাকে কখনোই ‘উৎসগত ঝুঁকি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় না। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো না গেলে, আইপিভি ভারতের জনস্বাস্থ্যের এক বিধ্বংসী, নীরব মহামারি হিসেবেই থেকে যাবে, যার খেসারত নারীদের শরীর ও মনে আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে।জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্যসমীক্ষা-৫’এর তথ্য এক নির্মম বাস্তবতা সামনে আনে, তা হলো ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সি বিবাহিত ভারতীয় নারীদের প্রায় ৩০ শতাংশ স্বামী বা সঙ্গীর হাতে শারীরিক কিংবা যৌন নির্যাতনের শিকার। এই সংখ্যাটি নিছক পরিসংখ্যান নয়, এর সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত অভিঘাত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। সমস্যা আরও জটিল হয় এই কারণে যে, ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসকদের খুব কমই সহিংসতা শনাক্ত করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ফলে বহু শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার মূল কারণ অচিহ্নিতই থেকে যায়। এর পরিণতি-ভুল রোগনির্ণয়, খণ্ডিত চিকিৎসা এবং ক্রমবর্ধমান চিকিৎসা ব্যয়। তবু আশ্চর্যজনক ভাবে, জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনায় আইপিভি আজও প্রান্তিক
বিষয় হিসেবেই রয়ে গেছে।
সংসদে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ চালু হওয়াকে রাষ্ট্র যখন ক্ষমতায়নের মাইলফলক বলে উদ্যাপন করে, তখন ঘরের ভিতরে নারীর শরীর ও মনে চলা সহিংসতা নিয়ে তার নির্লিপ্ততা আরও নগ্ন হয়ে উঠে। প্রতিনিধিত্ব বাড়ে, কিন্তু সুরক্ষা নয়, আসন বাড়ে, কিন্তু স্বাস্থ্য ও মর্যাদার নিশ্চয়তা আসে না। আইপিভি-কে জনস্বাস্থ্যের সংকট হিসেবে মানতে অস্বীকার করা মানে, ক্ষমতা নারীদের কেবল সংখ্যায় স্বীকার করছে, মানুষ হিসেবে নয়। এই বৈপরীত্যই বলে দেয়, নারীর ক্ষমতায়ন এখনও রাষ্ট্রের কাছে নীতিগত দায় নয়, রাজনৈতিক প্রদর্শন মাত্র। প্রতিনিধিত্বের রাজনীতি যতই জোরালো হোক, আইপিভি যদি জনস্বাস্থ্যের সংকট হিসেবে স্বীকৃতি না পায়, তবে এই সংরক্ষণ নীতিও কাগজে-কলমের ক্ষমতায়নেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তাই সরল প্রশ্ন-রাষ্ট্র কি নারীকে কেবল ভোটব্যাঙ্ক ও সাংবিধানিক সংখ্যায় দেখতে চায়, নাকি তার নিরাপত্তা, মানসিক সাস্থ্য ও বেঁচে থাকার অধিকারকে বাস্তব নীতির কেন্দ্রে আনতে প্রস্তুত? যতদিন সেই উত্তর না আসে, ততদিন সংসদে নারীর উপস্থিতি বাড়লেও, গৃহকোণের সহিংসতায় রাষ্ট্রের নীরবতা রাজনৈতিক ভণ্ডামি হিসাবে থেকে যাবে।