শুক্রবার | ৩০ জানুয়ারি ২০২৬

নিষ্ঠুর দর্পণ

 নিষ্ঠুর দর্পণ

কাল বাদে পরশু অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন যখন সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করবেন,তখন দেশবাসীর প্রত্যাশার পারদ ঠিক কতটা চড়বে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। গত বছরের বড় প্রাপ্তির পর এবারের বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন কোনো বাড়তি উৎসাহ চোখে পড়ছে না। মধ্যবিত্তের জল্পনাও এবার বেশ স্তিমিত। মাঝখানে জিএসটি হ্রাসের সুবাদে দুই-একটি পণ্যের দাম কমলেও, বৃহত্তর অর্থনীতির রক্তাল্পতা আজ আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তবতা। রবিবাসরীয় এই আয়োজন কি তবে কেবল একটি প্রথাগত নিয়ম রক্ষা, নাকি জনযাপনের কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর এক সৎ প্রচেষ্টা, আপাতত এটাই চলমান কৌতূহল।প্রথাগতভাবে বাজেটের আগে লগ্নিকারীদের প্রত্যাশা বা প্রবীণ নাগরিকদের ব্যাঙ্কের সুদে করছাড়ের দাবি ওঠে। শেয়ার বাজারে দীর্ঘকালীন মূলধনী লাভ করের সীমা বাড়ানো কিংবা মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি সূচকের সুবিধা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাবগুলি লগ্নিকারীদের মনে কিছুটা আশা জাগাতে পারে। কিন্তু এসবই আদতে ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা মাত্র। অর্থনীতির প্রকৃত অসুখটি লুকিয়ে আছে গভীরে। ভূ-রাজনীতির মেঘ যখন ঘনীভূত হয় এবং প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্কের শৈত্য যখন প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দের দাবিকে অনড় করে তোলে, তখন অর্থমন্ত্রীর পক্ষে জনকল্যাণে অর্থ বরাদ্দ করা এক দুঃসাধ্য কসরত হয়ে দাঁড়ায়। তদুপরি রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া শুল্কনীতির চোখরাঙানি। রপ্তানির বাজার যখন সঙ্কুচিত এবং বিদেশি পুঁজি যখন লাগাতর সরে যাচ্ছে, তখন ডলারের বিপরীতে টাকার মেরুদণ্ড যে নুয়ে পড়বে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। অশোধিত তেল থেকে সোনা- আমদানিকৃত প্রতিটি জিনিসের চড়া দাম আজ সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাসের কারণ। যদিও কার্যত অন্তিম লগ্নে আশা জাগিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণা।এহ বাহ্য। পরিসংখ্যানের আড়ালে থাকা আর্থিক বৈষম্যের কঙ্কালটি আরও ভয়ঙ্কর। যখন দেশের মাত্র এক শতাংশ ধনীর হাতে ৪০ শতাংশ সম্পদ কুক্ষিগত থাকে এবং ৮০ শতাংশ মানুষ দিনে ২০০ টাকার কম আয়ে সংসার চালান, তখন সেই প্রবৃদ্ধিকে 'অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন' বলা কেবল শব্দটির অবমাননা নয়, এক নিষ্ঠুর রসিকতাও বটে। উৎপাদন শিল্পে কর্মীর হার হ্রাস পেয়ে কৃষি ও সংগঠিত 'গিগ' অর্থনীতিতে ভিড় বাড়ছে; একে উন্নয়ন বলা চলে না, বরং এ এক ধরণের বাধ্যতামূলক পিছু হটা। পারিবারিক সঞ্চয় যখন গত পাঁচ দশকে সর্বনিম্ন এবং ঋণের বোঝা আকাশছোঁয়া, তখন রবিবাসরীয় বাজেটে কর্মসংস্থানকে 'পাখির চোখ' করা অর্থমন্ত্রীর কাছে বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথের সতর্কবার্তা মনে করিয়ে দেয় যে, বায়ুদূষণের জন্য ভারতকে যে আর্থিক মূল্য চোকাতে হয়, তা যেকোনো শুল্কের চেয়ে বেশি। দূষণের এই বিষাক্ত ধোঁয়াশা কি বাজেটের পাতায় কোনো আলোকরেখা খুঁজে পাবে, নাকি তা কেবল তথ্যের মেঘেই ঢাকা থাকবে, এখনই বলা মুশকিল।শেয়ার বাজার এখন ট্রাম্পের হুমকির আতঙ্কে সন্ত্রস্ত। রিলায়্যান্স বা টিসিএস-এর মতো বড় সংস্থাগুলির হতাশাজনক ফল প্রমাণ করেছে যে, কেবল খাতায়-কলমে লাভ বাড়িয়ে অর্থনীতির বুনিয়াদ গড়া যায় না। আয়করের সিংহভাগ যেখানে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে আসে, অথচ জাতীয় আয়ের বড় অংশ জমা হয় গুটিকতক ধনীর সিন্দুকে, সেখানে এই করব্যবস্থাকে ন্যায়সঙ্গত বলা কঠিন। টাকার দাম যখন তলানিতে এবং মূল্যবৃদ্ধি যখন রাক্ষুসে আকার নেওয়ার অপেক্ষায়, তখন অর্থমন্ত্রীর সামনে পথটি অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ। প্রশ্নটি কেবল বরাদ্দের নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গির। বাজেট কি কেবল গাণিতিক হিসাব আর অলঙ্কারপূর্ণ বক্তৃতার কোলাজ হয়েই থাকবে? নাকি সম্পদের এই আকাশচুম্বী বৈষম্য ও আমজনতার রিক্ততাকে স্বীকার করার সাহস দেখাবে?রবিবার অর্থমন্ত্রী যখন তার ডিজিটাল ট্যাবটি খুলবেন, তখন সেখানে সাধারণ মানুষের হাহাকার নাকি কর্পোরেটদের জয়গান - কোনটি বেশি প্রতিধ্বনিত হবে? নাকি এক হাতে দান আর অন্য হাতে হরণের সেই চেনা খেলায় আরও একটি বছর বাতাসের উপর দিয়েই চলে যাবে?সর্বশেষ প্রশ্নটি তাই বরাদ্দের গাণিতিক খতিয়ানের নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক অভিমুখেও বটে। বাজেট কি কেবল কিছু সংখ্যাতত্ত্বের চাতুরি আর অলঙ্কারপূর্ণ বক্তৃতার প্রলেপ হয়েই থাকবে, নাকি সম্পদের এই আকাশচুম্বী বৈষম্য আর আমজনতার ক্রমবর্ধমান রিক্ততাকে স্বীকার করার সৎসাহস দেখাবে? এক হাতে যৎসামান্য দান আর অন্য হাতে কৌশলে হরণের সেই চেনা খেলায় আরও একটি বছর কি তবে গতানুগতিকভাবেই অতিবাহিত হবে? এই অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলির উত্তর হয়তো অর্থমন্ত্রীর নথিতে নয়, বরং সময়ের নিষ্ঠুর দর্পণে নিহিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *