বুধবার | ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ধোঁয়াশা ও কিছু প্রশ্নচিহ্ন!!

 ধোঁয়াশা ও কিছু প্রশ্নচিহ্ন!!

ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সমাজ মাধ্যম পোস্ট- আর তাতেই আলোড়ন। ভারতীয় পণ্যের উপর মার্কিন শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হচ্ছে, সঙ্গে দাবি- ভারত ও আমেরিকার মধ্যে একটি ‘বাণিজ্যচুক্তি’ হয়ে গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু এই ঘোষণার আড়ালে যতটা না স্পষ্টতা, এর চেয়ে অনেক বেশি প্রশ্ন। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন-একটি ‘বাণিজ্যচুক্তি’ হয়ে গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন- ধৈর্যের ফল মিলেছে। কিন্তু এই দুই বক্তব্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভারতীয় জনগণ, কৃষক, শিল্পপতি এবং সংসদ- কেউই জানে না, এই চুক্তি আসলে কী। এফটিএ না শুল্ক সমঝোতা, নাকি কেবল রাজনৈতিক সৌজন্যের মোড়কে মোড়া একটি তাৎক্ষণিক বন্দোবস্ত?প্রথম এবং প্রধান ধোঁয়াশা- এই ‘বাণিজ্যচুক্তি’ আসলে কী? এক বছর ধরে যে বৃহত্তর ভারত-আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (FTA) নিয়ে আলোচনা চলছে, সেটাই কি আচমকা চূড়ান্ত হয়ে গেল? নাকি এটি শুধু শুল্ক কমানো সংক্রান্ত একটি সীমিত সমঝোতা। ট্রাম্পের পোস্টে কোনো ব্যাখ্যা নেই। মোদির ধন্যবাদবার্তাতেও নেই। ফলে ‘চুক্তি’ শব্দটি রাজনৈতিকভাবে যতটা জোরালো, নীতিগতভাবে ততটাই অস্পষ্ট। বিশেষ করে এই কারণে প্রশ্ন আরও গভীর হচ্ছে যে, গত সপ্তাহেই ভারত-ইউরোপ মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির একটি বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু ভারত- আমেরিকার ক্ষেত্রে তেমন কোনও নথি, খসড়া বা সরকারী বিবৃতি সামনে আসেনি। তা হলে এত বড় চুক্তি হলে এর কাঠামো কোথায়? ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, শুল্ক কমানোর বিনিময়ে ভারত আরও বেশি করে মার্কিন পণ্য কিনবে এবং বহুক্ষেত্রে শুল্ক ও অশুল্ক বাণিজ্যিক বাধা ‘শূন্যে’ নামিয়ে আনবে। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে? দুগ্ধ এবং কৃষিপণ্যের মতো সংবেদনশীলখাতে আমেরিকার দাবির বিরোধিতা এত দিন করে এসেছে ভারত। হঠাৎ করে সেই অবস্থানে কি বদল এলো? কৃষকদের স্বার্থ, খাদ্য নিরাপত্তা- এই প্রশ্নগুলির কোনো উত্তর এখনও মেলেনি।আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল- ১৮ শতাংশ শুল্ক আদৌ ভারতের জন্য সুবিধাজনক কি না।ভারতের প্রতিবেশী এবং এশিয়ার একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ এখনও মার্কিন বাজারে জেনারালাইজড সিস্টেম অফ প্রেফারেন্স (GSP) এর আওতায় অতিরিক্ত ছাড় পায়। ভারত সেই সুবিধা হারিয়েছে ২০১৯ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই। ফলে তুলনামূলকভাবে ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা সীমিতই থেকে যাচ্ছে। সবচেয়ে বিতর্কিত দাবি-রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে রাজি হয়েছেন মোদি। ট্রাম্প এমনটাই বলেছেন।কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বা বিদেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে এর কোনো নিশ্চিতকরণ নেই। অতীতে ভারত স্পষ্ট জানিয়েছিল, যেখানে লাভজনক, নিষেধাজ্ঞা না থাকলে সেখান থেকেই তেল কেনা হবে। তা হলে কি ভূরাজনৈতিক চাপের কাছে সেই নীতিতে পরিবর্তন আসছে? এই নীরবতাই সন্দেহ বাড়াচ্ছে।রাজনৈতিক স্তরে কংগ্রেসের প্রশ্নও তাই সহজে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সংঘর্ষবিরতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আগে ট্রাম্প করেছিলেন-এ বার বাণিজ্যচুক্তি। ভারতের সার্বভৌম নীতিনির্ধারণ কি ক্রমশ ঘোষণার স্তরে ওয়াশিংটনের হাতে চলে যাচ্ছে? এই প্রশ্ন তুলছে বিরোধী শিবির।অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী মোদির বক্তব্যে আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট। তার দাবি, ধৈর্যের ফল মিলেছে, বিশ্ববাণিজ্যের গতিপথ ভারতের দিকে ঝুঁকছে, এবং এই চুক্তি শিল্প ও উৎপাদনে নতুন সুযোগ তৈরি করবে। কিন্তু অর্থনীতিতে আত্মবিশ্বাস যতটা জরুরি, স্বচ্ছতা ততটাই অপরিহার্য।
শেষপর্যন্ত প্রশ্ন একটাই- এটি কি সত্যিই একটি ‘ঐতিহাসিক’ বাণিজ্য চুক্তি, না কি রাজনৈতিক বার্তায় মোড়া একটি সীমিত শুল্ক সমঝোতা? চুক্তির শর্ত, খাতভিত্তিক প্রভাব, কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা-এই বিষয়গুলি স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত ট্রাম্পের ঘোষণায় উচ্ছ্বাসের চেয়ে ধোঁয়াশাই বেশি চোখে পড়ছে।স্বচ্ছতা না এলে এই ‘চুক্তি’ লাভের চেয়ে বিতর্কই বেশি জন্ম দেবে- সেটাই এখন বাস্তবতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *