January 17, 2026

দাক্ষিণাত্যে নয়া সমীকরণ!!

 দাক্ষিণাত্যে নয়া সমীকরণ!!

তামিলনাডুর রাজনীতি আবার একবার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।বহুকাল ধরে স্থিতিশীল বলে মনে হওয়া ডিএমকে কংগ্রেস জোটের ভিতরে টানাপোড়েন স্পষ্ট হচ্ছে, আর সেই ফাঁকেই মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে এক নতুন সম্ভাবনা-সিনেমা থেকে রাজনীতিতে আসা বিজয় এবং তার দল তামিলাগা ভেটরি কাজাগম (টিভিকে)।
এই সম্ভাবনাকে আরও বাস্তব রূপ দিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী নিজেই, 'জন নায়গণ' ছবির মুক্তি আটকানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ শানিয়ে। রাহুল গান্ধীর বক্তব্য নিছক একটি সিনেমার পক্ষে দাঁড়ানো নয়। এটি তামিল সংস্কৃতি, আঞ্চলিক আত্মসম্মান এবং কেন্দ্রের 'দমনমূলক' নীতির বিরুদ্ধে এক রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র। 'আপনি কখনও তামিল জনগণের কন্ঠরোধে সফল হবেন না' এই বাক্যটি আসলে বিজেপির বিরুদ্ধে নয়, বরং তামিল রাজনীতি মাটিতে কংগ্রেসের নিজস্ব পরিচয় ফেরানোর এক প্রচেষ্টা। উত্তর ভারতে বারবার ব্যর্থতার পরে কংগ্রেস এখন আঞ্চলিক আবেগকে সামনে এনে নিজের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে চাইছে, আর তামিলনাড়ু সেই পরীক্ষাগার।
কিন্তু প্রশ্ন হল,এই কৌশল কতটা আন্তরিক এবং কতটা রাজনৈতিক দরকষাকষির অংশ? কারণ বাস্তবতা হল, তামিলনাডুতে কংগ্রেস বহু বছর ধরেই ডিএমকের জুনিয়র শরিকে পরিণত হয়েছে। ২০২১ সালে ক্ষমতায় ফিরেও ডিএমকে কংগ্রেসকে সরকারে নেয়নি। আসন সমঝোতায়ও কংগ্রেস দাবি বারবার খর্ব হয়েছে। এ বার ২৩৪ টি আসনের মধ্যে মাত্র ৩২ টি আসন ছাড়তে রাজি ডিএমকে, অথচ কংগ্রেস চাইছে ৩৮-৪১ টি আসন ও মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব। এই দ্বন্দ্ব শুধু আসনের নয়, মর্যাদারও। এই ক্ষোভই কংগ্রেসের নিচুতলার কর্মীদের একাংশকে টিভিকে-র দিকে তাকাতে বাধ্য করেছে। তাদের চোখে বিজয় শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি এক 'মাস লিডার' যার জনপ্রিয়তা বিজেপি-বিরোধী ভোটকে একত্রিত করতে পারে। তামিল রাজনীতিতে সিনেমার প্রভাব নতুন নয়। এমজি রামচন্দ্রন থেকে জয়ললিতা-ইতিহাস সাক্ষী, রুপোলি পর্দার তারকারা এখানে ক্ষমতায় শীর্ষে পৌঁছেছেন। সেই স্মৃতি বিজয়কে রাজনৈতিকভাবে সম্ভবনমায় করে তুলছে।তবে এই সম্ভাবনর ভিতরেই রয়েছে বড় ঝুঁকি। টিভিকে এখনও সংগঠিত দল নয়, নির্বাচনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অভিজ্ঞতাও নেই।পি চিদম্বরমের মতো প্রবীণ নেতারা সেই বাস্তবতাই তুলে ধরছেন। তাদের মতে, ডিএমকে কংগ্রেসের পুরনো ও পরীক্ষিত শরিক, তাকে ছেড়ে অনিশ্চিত শক্তির সঙ্গে যাওয়া আত্মঘাতী হতে পারে। এই অবস্থান কংগ্রেসে ভেতরের বিভাজনকে সামনে আনছে- একদিকে বাস্তববাদী পুরনো নেতৃত্ব, অন্যদিকে মরিয়া নতুন কৌশলের সমর্থকরা। রাহুল গান্ধীর ভূমিকা এখানেই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি প্রকাশ্যে টিভিকে নাম না নিলেও বিজয়ের পাশে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন- কংগ্রেসের কাছে বিকল্প খোলা আছে। প্রবীণ চক্রবর্তীর সাক্ষাৎ, রাজ্য নেতাদের টিভিকে মঞ্চে উপস্থিত- এসব কাকতালীয় নয়। এগুলি ডিএমকে-র উপর চার তৈরির কৌশলও হতে পারে, আবার ভবিষ্যতের জন্য দরজা খোলা রাখার প্রস্তুতিও হতে পারে।অন্যদিকে বিজেপি ও কেন্দ্রের ভূমিকাও এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ। সেন্সর বোর্ড, সিবিআই, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের ভূমিকা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা বিজেপিকে তামিল আবেগেরে বিরুদ্ধে দাঁড় করাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিজেপি-বিরোধী শক্তিগুলির ঐক্য গড়ে উঠলে তার রাজনৈতিক মূল্য চুকাতে হতে পারে কেন্দ্রীয় শাসক দলকেই। সব মিলিয়ে, 'জন নায়গন' শুধুমাত্র একটি সিনেমা নয়, এটি এখন তামিল রাজনীতির প্রতীক। এই প্রতীকের চারপাশেই ঘুরছে ক্ষমতার নতুন অঙ্ক। কংগ্রেস যদি ডিএমকে সঙ্গে সমঝোতায় সম্মান না পায়, তবে তারা নতুন পথ খুঁজবে- এমন ইঙ্গিত রাহুল গান্ধী দিয়ে রেখেছেন। তবে সেই পথ কতটা বাস্তবসম্মত, আর কতটা আবেগনির্ভর, সেটাই বড় প্রশ্ন।তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এখন নিশ্চিত একটাই- পুরনো সমীকরণ আর আগের মতো নিশ্চিত নয়। সংস্কৃতি, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের লড়াই একসঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এই লড়াইয়ের ফল নির্ধারন করবে কেবল জোট নয়, কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ দিশাও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *