তুলা চাষির বিপন্নতা!!

৭৯তম স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লার প্রাকার থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উচ্চস্বরে বলেছিলেন, দেশের কৃষকের স্বার্থে তিনি প্রাচীরের মতো অটল থাকবেন। সেই বক্তব্য শোনার পর স্বাভাবিক ভাবেই গ্রামীণ ভারতের অনেকেই ভেবেছিলেন, অন্তত কৃষক-স্বার্থবিরোধী নীতি আর আসবে না। কিন্তু কথার সঙ্গে কাজের ফারাক এত দ্রুত ধরা দেবে, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেননি। কেন্দ্রীয় সরকার সম্প্রতি তুলোর উপর থেকে ১১ শতাংশ আমদানি শুল্ক তুলে নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটাই এখন দেশের তুলা চাষিদের জন্য ভয়াবহ বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের কৃষক সংগঠনগুলি ইতিমধ্যেই সরব হয়েছে। দিল্লীর যন্তরমন্তরে সংযুক্ত কিষান মোর্চার ডাকা মহাপঞ্চায়েতে হান্নান মোল্লা, রাকেশ টিকায়েতরা স্পষ্ট বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত তুলা চাষিদের আত্মহননের পথ প্রশস্ত করবে।কৃষক নেতাদের দাবি, অবিলম্বে শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নিতে হবে এবং তুলার খরচের দেড়গুণ সহায়ক মূল্য ঘোষণা করতে হবে।
সরকারী যুক্তি অবশ্য সরল; শুল্ক তুলে নিলে টেক্সটাইল শিল্পে সস্তায় কাঁচামাল মিলবে, রপ্তানি বাড়বে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তবের রেখাটি এত সরল নয়। সবাই জানে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ওয়াশিংটনের চাপ উপেক্ষা করার ক্ষমতা নেই নয়াদিল্লীর। মার্কিন তুলা রপ্তানির স্বার্থে ভারতকে হাঁটু গেড়ে বসতে হয়েছে। স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব পালনের আবহেই দেখা গেল, কৃষিনীতি গড়ে উঠছে কৃষকের ঘামে নয়, বরং বিদেশি নির্দেশে। অর্থাৎ কৃষককে সামনে রেখে যতই বড় বড় বুলি আওড়ানো হোক না কেন, প্রকৃত চিত্র বলছে, ভারতের নীতি আসলে শিল্প ও কূটনৈতিক লবির কাছে আত্মসমর্পিত।
তুলা ভারতের কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এগ্রিফার্মিং নামের একটি কৃষি বিশ্লেষণ ও তথ্যশিল্প সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে তুলা চাষের উপর প্রায় পঁয়তাল্লিশ লক্ষ কৃষক পরিবার নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা তথা আইএলও-র মতে এই সংখ্যাটা আরও বেশি; ৫৮ লক্ষ। তুলা চাষের সঙ্গে আনুষঙ্গিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত মানুষের সংখ্যাটা জুড়লে তা প্রায় সাড়ে চার কোটি। মহারাষ্ট্র, গুজরাট, পাঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ লাখো কৃষক তুলা চাষের উপর নির্ভরশীল। বর্ষার শুরুতেই তারা বীজ বপন করেছেন, তিন মাস পরে ফসল কাটার আশা করছেন।কিন্তু সেই সময়েই যদি শুল্কমুক্ত মার্কিন তুলা বাজারে ঢুকে পড়ে, দেশীয় তুলার দাম-সহ জোগান-শৃঙ্খল ভেঙে পড়া অনিবার্য। খরচ তুলতে পারবে না কৃষক।ন্যায্যমূল্য না পেয়ে আবারও ঋণের জালে জড়িয়ে
পড়বেন, আত্মহত্যার পথ বেছে নেবেন অনেকে।ইতিমধ্যেই গ্রামীণ মহারাষ্ট্র বা তেলেঙ্গানায় তুলা চাষিদের আত্মহত্যার ইতিহাস ভয়ঙ্কর।নতুন নীতি সেটিকে আরও তীব্র করবে।
বিপদটা অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিকও। গান্ধীর সেই উক্তি আজও প্রাতঃস্মরণীয়ঃ ‘ইন্ডিয়া লিভস ইন ইটস ভিলেজেস’। কৃষি, বন ও মৎস্য খাত মিলিয়ে এখনও দেশের জিডিপিতে অবদান ১৬-১৮ শতাংশ। জনসংখ্যার এক বিরাট অংশও কৃষিনির্ভর। গ্রামীণ ভারতের ৮৫ শতাংশ ক্ষুদ্র চাষি। যে দেশে আজও জনসংখ্যার অর্ধেক কৃষিনির্ভর, সেখানে সরকার কাদের জন্য নীতি প্রণয়ন করছে? শিল্পপতি ও রপ্তানিকারকদের জন্য, নাকি চাষিদের জন্য? টেক্সটাইল শিল্প যদি সস্তা তুলা পায়, তার লাভবান হবে মধ্যস্বত্বভোগী ও কর্পোরেট মালিকেরা। কৃষক পাবে কেবল ক্ষতি। রাষ্ট্র যদি সোজাসুজি কৃষকের বিপক্ষে দাঁড়ায়, তবে গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত ভেঙে পড়তে বাধ্য। আর সেই ভাঙনের অভিঘাত সমাজের উপর পড়বে বহুগুণে-ঋণগ্রস্ত কৃষক, কর্মহীন শ্রমিক, হতাশ যুবক এবং শেষে দুঃসহ সামাজিক সংকট।
এই সিদ্ধান্ত কেবল অর্থনৈতিক ভুল নয়, এটি রাজনৈতিক দেউলিয়াপনারও পরিচয়। স্বাধীনতার এত বছর পরও ভারত নিজের কৃষিনীতি নির্ধারণে স্বাধীন নয়। বিদেশি শক্তির চাপে যখন-তখন নীতি স বদলাতে হয়। কৃষক তাই বারবার বুঝে যাচ্ছেন, স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি তাঁকে ছুঁয়ে যায়নি। লালকেল্লা থেকে যতই প্রতীকী আশ্বাস শোনা যাক, বাস্তবে তার কোনও প্রতিফলন নেই।
আজ ভারতের কৃষকদের সামনে দুটি দাবি সবচেয়ে জরুরি। এক, তুলার উপর থেকে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। দুই, খরচের দেড়গুণ ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঘোষণা করতে হবে। নচেৎ তুলা চাষিদের দুর্দশা আরও গভীর হবে এবং দেশের কৃষিনির্ভর সমাজে এক ভয়ঙ্কর অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়বে। সরকার যদি সত্যিই কৃষকের পাশে দাঁড়াতে চায়, তবে তাকে দেখাতে হবে নীতি দিয়ে, মুখের বুলি দিয়ে নয়। না হলে ইতিহাস লিখবে -স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসবে ভারত স্বাধীন হলেও তার কৃষক আজও পরাধীন।