রবিবার | ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ট্রাম্পের শুল্ক রথে সুপ্রিম ধাক্কানাছোড় ট্রাম্প পাল্টা শুল্কের পথে

 ট্রাম্পের শুল্ক রথে সুপ্রিম ধাক্কানাছোড় ট্রাম্প পাল্টা শুল্কের পথে

দৈনিক সংবাদ অনলাইন ডেস্ক, ২১ ফেব্রুয়ারী : সারা বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন দেশের উপর ট্রাম্পের একতরফা শুল্ক আরোপ নিয়ে শুক্রবার এক ঐতিহাসিক রায় দিল মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট। ট্রাম্পের সুদূরপ্রসারী শুল্ক দৌরাত্ম্য ৬-৩ ভোটের মাধ্যমে নেওয়া সিদ্ধান্তে বেআইনি বলে রায় দেয় মার্কিন সর্বোচ্চ আদালত। মার্কিন রাষ্ট্রপতির শুল্ক কাঠামোর উল্লেখযোগ্য অংশ জরুরি ক্ষমতার অপব্যবহার বলে বাতিল ঘোষণা করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে জানায় কর আরোপের ক্ষমতা একমাত্র কংগ্রেসের হাতে রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের মুখ্য বিচারপতি জন রবার্টস লিখিত আদেশনামায় জানান, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ক্ষমতা বহির্ভূত কাজ করেছেন। বিশ্বজুড়ে দাপিয়ে বেড়ানো ট্রাম্পের শুল্ক রথ সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের কারণে বড় ধাক্কা খেল বলা যায়। কিন্তু নাছোড়বান্দা ট্রাম্প পিছপা হতে রাজি নন। তার অর্থনৈতিক এজেন্ডার ধ্বজা উঁচু করে ধরে রাখতে নতুন পাঁয়তারা কষতে শুরু করেছেন তিনি। নিজের মুখেই জানিয়েছেন, বিকল্প হিসেবে নির্বাহী আদেশ জারি করে বিশ্বজুড়ে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন। দরকার হলে নিজের বাণিজ্য নীতি অন্য পথে কার্যকর করবেন। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ক্ষিপ্ত ট্রাম্প আদালতের সমালোচনা করে বলেন, ওই বিচারকদের কারণে তিনি অত্যন্ত লজ্জিত যারা তার শুল্ক পদক্ষেপকে ভোটাভুটির মাধ্যমে বাতিল করেছেন। ট্রাম্পের ভাষায় এই রায় গভীরভাবে হতাশাজনক। এদিকে সুপ্রিম কোর্টের এই রায় নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যরা কমবেশি খুশি ব্যক্ত করেছেন। এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানদের প্রতিক্রিয়া ছিল পরিমিত। অনেকেই একে সমর্থন জানিয়েছেন, কারণ ট্রাম্পের শুল্ক নীতি তাদের কাছে কখনোই গ্রহণযোগ্য ছিল না। ট্রাম্পের আর্থিক নীতির বরাবরই সমালোচনা

করেছেন তারা। এমনকী বাণিজ্য সহযোগী কানাডার উপর ট্রাম্প কর্তৃক আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহারে বিভিন্ন সময়ে প্রস্তাব পাস করেছে সিনেট এবং হাউস। এই কঠোর আর্থিক নীতির কারণেই রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের। শুধু ডেমোক্রেট নয়, নিজ দল রিপাবলিকানের আইনপ্রণেতারাও বারবার এই বিষয়ে কংগ্রেসের ভেতরে ও বাইরে ট্রাম্পের সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। শুক্রবার আদালতের রায় বেরোনোর পর কংগ্রেস সদস্যরা শুল্ক নিয়ে ভবিষ্যতে ট্রাম্পের সাথে কাজ করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ওইদিন বিকেলের মধ্যেই ট্রাম্প জানিয়েছেন কংগ্রেসের সাথে এই বিষয়ে কাজ করার কোনো অভিপ্রায় তার নেই। তিনি যা করবেন, নিজেই করবেন। মার্কিন আইনসভার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে তিনি রাজি নন। গতকাল মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের এক কারিগর হলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক আইনজীবী। আদালতে ট্রাম্পের শুল্কের বিপক্ষে সওয়াল জবাবে অংশ নেন তিনি। তার নাম নীল কাত্যাল। আদালতে লড়ে তিনি ওই কর আরোপ যে বেআইনি তা যুক্তি সহকারে উপস্থাপন করতে সক্ষম হন। এদিকে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায় সম্পর্কিত প্রভাব নিয়ে ইতিমধ্যেই বিচার বিশ্লেষণ করতে শুরু করেছে ভারত সরকার। কারণ ট্রাম্পের নিশানায় থাকা উচ্চ শুল্কের দেশগুলোর কিংবা ভুক্তভোগী দেশগুলোর মধ্যে ভারতও পড়ে। মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রক।

শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের রায়ে স্পষ্ট হয়েছে যে, বেশিরভাগ বিচারপতি বিশ্বাস করেন যে সংবিধানের অধীনে কেবল কংগ্রেসকেই শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবুও ট্রাম্প দ্রুত ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের উদ্ধৃতি দিয়ে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন, যা ‘যুক্তরাষ্ট্রের অর্থপ্রদানের ভারসাম্য ঘাটতি’ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক অর্থপ্রদানের সমস্যা দেখা দিলে রাষ্ট্রপতিকে অস্থায়ী আমদানি কর আরোপের ক্ষমতা প্রদান করে। কর্তৃত্বটি কখনও ব্যবহার করা হয়নি এবং তাই আদালতে কখনও পরীক্ষা করা হয়নি।

রিপাবলিকানরা মাঝে মাঝে ট্রাম্পকে তার শুল্ক পরিকল্পনার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তবুও গত বছরের এপ্রিলে ট্রাম্পের বিশ্বব্যাপী শুল্কের ‘মুক্তি দিবস’ এর আগে, রিপাবলিকান নেতারা সরাসরি রাষ্ট্রপতিকে অমান্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা নতুন শুল্ক নীতির প্রশংসা করেছেন, যা রিপাবলিকানদের মধ্যে প্রজন্মগত বিভাজন তুলে ধরেছে, যেখানে বেশিরভাগ তরুণ রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের কৌশলকে তীব্রভাবে সমর্থন করেছেন। ঐতিহ্যবাহী মুক্ত বাণিজ্য মতবাদে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে, তারা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ সুরক্ষাবাদের পক্ষে যুক্তি দেন এবং আশা করেন যে এটি মার্কিন উৎপাদনকে পুনরুজ্জীবিত করবে।

ওহাইওর নবীন রিপাবলিকান সিনেটর বার্ণি মোরেনো শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের রায়ের তীব্র নিন্দা জানিয়ে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের ‘আমাদের দেশকে পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণতম দেশে পরিণত করেছে এমন শুল্কগুলিকে সংহিতাবদ্ধ করার’ আহ্বান জানিয়েছেন!

এদিকে, শুল্কের বিরোধী কয়েকজন রিপাবলিকান সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তকে প্রকাশ্যে উল্লাস করেছেন। রিপাবলিকান ডন বেকন, যিনি প্রশাসনের সমালোচক এবং পুনর্নির্বাচন চান না, তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় বলেছেন যে ‘কংগ্রেসকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, কঠোর ভোটগ্রহণ করতে হবে এবং তার কর্তৃপক্ষকে রক্ষা করতে হবে।’ বেকন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে আরও রিপাবলিকানদের প্রতিক্রিয়া আসবে। তিনি এবং আরও কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্য এই মাসের শুরুতে কানাডার উপর ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের উপর হাউস ভোট জোরদার করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

সেই পদক্ষেপটি পাস হওয়ার সাথে সাথে, ট্রাম্প তার শুল্ক পরিকল্পনার বিরোধিতায় ভোট দেওয়া যেকোনো রিপাবলিকানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *