জটিল সময়ে তাৎপর্যপূর্ণ যাত্রাআজ শুরু মোদির ইজরায়েল সফর
জটিল সময়ে তাৎপর্যপূর্ণ যাত্রা
আজ শুরু মোদির ইজরায়েল সফর
দৈনিক সংবাদ অনলাইন ডেস্ক, ২৪ ফেব্রুয়ারী: ফের আমেরিকা অক্ষে নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতি প্রকট হচ্ছে। বুধবার থেকে ইজরায়েল সফর সেই আভাস দিচ্ছে। একদিকে প্যালেস্টাইনের গাজা পুনর্বাসন যে কমিটি আমেরিকা তৈরি করেছে সেখানে ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আবার অন্যদিকে ইজরায়েলের সঙ্গেও ভারতের দীর্ঘকালের যে সুসম্পর্ক সেই মৈত্রীকে আরও গভীর করতে নরেন্দ্র মোদি বদ্ধপরিকর। বস্তুত ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে ব্যক্তিগত সখ্যের নিরীখে একমাত্র ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মোদির সম্পর্ক সবথেকে স্থিতিশীল এবং বস্তুত ক্রমবর্ধমান। ভারতের ইজরায়েল নীতির সারকথা হলো, ভারত প্যালেস্টাইনকে শত্রুরাষ্ট্র হিসাবে অভিহিত করবে না, আবার ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বিনষ্ট হয়, এরকম কোনও অবস্থানও ভারত নেবে না। একইভাবে ইউক্রেন ও রাশিয়ার ক্ষেত্রে এই নীতিই প্রযোজ্য হয়েছে মোদি জমানায়। অর্থাৎ সরাসরি যেমন জওহরলাল সেই নীতিরই একটি নিজের মতো করে মডেল নির্মাণ করেছেন। যদিও নেহরু ছিলেন নেহরু কোনও শিবিরেই থাকেননি নেহরুর তীব্রতম সমালোচক হওয়া সত্ত্বেও মোদি যেন তুলনামূলকভাবে আরও ভিন্নধর্মী। তিনি সোভিয়েত ও আমেরিকা কোনও শিবিরেই না থেকে নির্জেটি তথা জোট নিরপেক্ষ একটি নীতি গ্রহণ করেছিলেন। এমনকী নির্জোট একটি মঞ্চও গড়ে তোলেন। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধীরা রাশিয়া শিবিরেই নিজেদের নিয়ে গিয়েছেন অত্যন্ত সচেতনভাবে। বিশেষভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে ১৯৭১ সালে ভারতের যুদ্ধের সময় অর্থাৎ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি এক মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মোদি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর অনেকটাই ঝুঁকেছিলেন আমেরিকার দিকে। আর সেটি প্রকট হওয়ায় রাশিয়ার পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া ছিল বিরূপ। কারণ রাশিয়া পাকিস্তান ও চিনের সঙ্গে একটি বন্ধুত্ব সম্পর্ক গড়ে তোলে। অবশেষে মোদি সেই ভ্রান্তি থেকে সরে এসে পুনরায় রাশিয়ার বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। ইজরায়েল নিয়ে সেই দ্বিধা বিগত বারো বছরে ছিল না। আমেরিকার অন্যতম সামরিক বন্ধু ইজরায়েল ভারতের সঙ্গেও লাগাতার মৈত্রীর সম্পর্ক ও সামরিক সহায়তার একটি জোট নির্মাণ করেছে। বুধবার থেকে শুরু হওয়া সফরের প্রধান গুরুত্ব হলো মোদি ভাষণ দেবেন ইজরায়েলের সংসদে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কাছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই সফর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, লাগাতার গাজায় বোমাবর্ষণ এবং প্যালেস্টাইন, লেবানন, ইরান সকলকে শত্রু পর্যবসিত করা ইজরায়েল আন্তর্জাতিক পরিসরে ক্রমেই নি:সঙ্গ হয়েছে। আমেরিকা পাশে থাকলেও পশ্চিমী বহু দেশ ইজরায়েলের উপর ক্ষুব্ধ এবং রাষ্ট্রসংঘের বৈঠকে নিন্দা প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক মহলের বড়সড় অংশ সমর্থন দিয়েছে। ভারত কিন্তু সমর্থনপত্রে স্বাক্ষর করেনি। তাই মোদির আগমনের প্রাক্কালে নেতানিয়াহু উচ্ছ্বসিত ভাষায় ভারত ও মোদির প্রশংসা করেছেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ৪ জুলাই তেল আবিব বিমানবন্দরে লাল গালিচায় দাঁড়িয়ে দুজন নেতা একজন ভারতের, অন্যজন ইজরায়েলের। কিছুক্ষণ পর উষ্ণ আলিঙ্গন। সেই ছবি আজও ভারত-ইজরায়েল সম্পর্কের এক মোড় বদলের প্রতীক। সেদিন প্রথমবার কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ইজরায়েল সফরে গিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
নয় বছর পর, ২৫ ফেব্রুয়ারী ফের ইজরায়েল সফরে যাচ্ছেন মোদি। কূটনৈতিক মহলের মতে, ২০১৭-র প্রাচীর ভাঙার অঙ্গীকার এখন অনেকটাই বাস্তব। যে সম্পর্ক এক সময় পর্দার আড়ালে সীমাবদ্ধ ছিল, তা আজ প্রকাশ্য কৌশলগত অংশীদারিত্বে পরিণত হয়েছে।
দশকের পর দশক ভারত-ইজরায়েল সম্পর্ক ছিল সতর্ক ও নীরব। কিন্তু মোদির আমলে তা প্রকাশ্য ও দ্রুতগামী হয়েছে। প্রতিরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা, কৃষি প্রযুক্তি থেকে শুরু করে গোয়েন্দা সহযোগিতা বহু ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। মোদি একাধিকবার নেতানিয়াহুকে ‘প্রিয় বন্ধু’ বলে উল্লেখ করেছেন।
ভারত বর্তমানে ইজরায়েলের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র ক্রেতা। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন, রাডার প্রযুক্তি বহু উচ্চ প্রযুক্তি সামরিক সরঞ্জামে দুই দেশের যৌথ প্রকল্প রয়েছে। সফরের আগে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করতে নতুন সমঝোতা স্মারকেও সই হয়েছে বলে সূত্রের খবর। যৌথভাবে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে এবারের সফর এক জটিল আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে। ২০২৪ সালের শেষদিকে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। গাজা সংঘাত ঘিরে বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও মানবাধিকার প্রশ্নের মধ্যেই মোদির সফর অনুষ্ঠিত হতে চলেছে।
দিল্লীর এক নীতি বিশ্লেষকের মতে, ভারতের ঐতিহ্যগতভাবে গ্লোবাল সাউথে যে নৈতিক অবস্থান ছিল, বাস্তববাদী কৌশলগত মোড় নেওয়ার ফলে তা কিছুটা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। গাজা যুদ্ধ চলাকালীন ভারতীয় সংস্থার ইজরায়েলে রকেট ও বিস্ফোরক বিক্রির অভিযোগ নিয়েও সমালোচনা উঠেছে। ফলে এই সফরকে অনেকেই ইজরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন হিসাবেই দেখছেন।
এই সফর ইজরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও তাৎপর্যপূর্ণ। সামনে জাতীয় নির্বাচন। গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও গাজা যুদ্ধ নিয়ে প্রবল চাপে নেতানিয়াহু। এমন সময়ে বিশ্বের বৃহৎ গণতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রীর সফর তার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী করতে সাহায্য করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজা যুদ্ধের পর পশ্চিমী কয়েকজন নেতা ইজরায়েল সফর করলেও গ্লোবাল সাউথের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি তেমন দেখা যায়নি। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতের এই কূটনৈতিক পদক্ষেপ তাৎপর্যপূর্ণ। এক বিশ্লেষকের ভাষায়, ‘এই মুহূর্তে ইজরায়েলের খুব বেশি বন্ধু নেই। সেখানে ভারত একটি বড় কৌশলগত ভরসা হয়ে উঠেছে।
-প্রশ্ন উঠছে এটি কী কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্বাভাবিক অগ্রগতি, নাকি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বার্তা? একদিকে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা, অন্যদিকে, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের বিতর্ক দুয়ের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা এখন ভারতের কূটনীতির বড় চ্যালেঞ্জ।
২৫ ফেব্রুয়ারীর সফর তাই শুধু প্রোটোকল নয়, এটি ভারত-ইজরায়েল সম্পর্কে পরবর্তী অধ্যায়ের দিকনির্দেশ। বিশ্ব রাজনীতির উত্তপ্ত আবহে মোদির এই সফর কী বার্তা দেয় সেটাই এখন কূটনৈতিক মহলের প্রধান আলোচ্য বিষয়।