ভোরেটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে যে বিতর্ক ক্রমেই গভীর হচ্ছে,তা শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি কার্যত গণতন্ত্রের ভিত্তি - ভোটাধিকার সংরক্ষণ বনাম প্রশাসনিক তৎপরতার সীমা ও সংবেদনশীলতা নিয়ে এক গুরুতর সাংবিধানিক আলোচনার রূপ নিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বয়ং সুপ্রিম কোর্টে উপস্থিত হয়ে সওয়াল করা এবং শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ নিঃসন্দেহে বিষয়টির গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যা গণতন্ত্রের এক নজির। দেশের ইতিহাসে এই প্রথমবার, যেখানে শাসনব্যবস্থার এক প্রধান, সরাসরি বিচার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ দরজায় শুধু কড়াই নাড়লেন না, বরং জনমনের গণতান্ত্রিক অধিকার লড়াইয়ের দাবিতে নিজেই আর্তি জানালেন।
এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে গত ২৬ নভেম্বর থেকে। পশ্চিমবঙ্গে শুনানির শেষদিন ৭ ফেব্রুয়ারী এবং ১৪ ফেব্রুয়ারী চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের কথা। অর্থাৎ সময়সীমা প্রায় শেষ। অথচ এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই লক্ষ লক্ষ ভোটারকে শুনানির আওতায় আনার চেষ্টা বাস্তবিক অর্থেই প্রশ্নবিদ্ধ। মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী যে পরিসংখ্যান আদালতে তুলে ধরেছেন, তা উদ্বেগজনক- এখনও প্রায় ৬৩ লক্ষ ভোটারের শুনানি বাকি, অথচ হাতে সময় মাত্র চার দিন। প্রতিদিন ১৫ লক্ষেরও বেশি মানুষের শুনানি শেষ করা যে কার্যত অসম্ভব, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠে আসে- এসআইআর আদৌ ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য, না কি ভোটার তালিকা ছাঁটাইয়ের একটি অতি তাড়াহুড়ো প্রক্রিয়ায় পরিণত হচ্ছে? নামের বানানের সামান্য ভুল, ইংরেজি অনুবাদে পদবির রকমফের কিংবা ভাষাগত অসঙ্গতির কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষকে শুনানিতে তলব করা হলে, সেটি আর নিছক 'প্রযুক্তিগত সংশোধন' থাকে না। বরং তা সাধারণ নাগরিকের মনে ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কা তৈরি করে।সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ এই জায়গাতেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে- নামের বানানের ছোটখাটো ভুলে কাউকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের আরও সংবেদনশীল হতে বলা হয়েছে। প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, "আপনাদের অফিসারদের একটু সংবেদনশীল হতে বলুন”- শুধু একটি উপদেশ নয়, বরং প্রশাসনিক মনোভাবের উপর সরাসরি প্রশ্ন। বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ভাষার প্রশ্নটি।বাংলা ভাষা না-বোঝা আধিকারিকদের দ্বারা বাংলার ভোটারদের নাম যাচাই করানোর ফলে যে জটিলতা তৈরি হচ্ছে তা আদালতও স্বীকার করেছে। ২০০২ সালের ভোটার তালিকা ছিল বাংলায় তালিকা অনুবাদের সময় বানানগত বিভ্রান্তি হওয়াই স্বাভাবিক। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে যদি কেবল 'ডেটা অসঙ্গতি'র যুক্তিতে প্রকৃত ভোটারদের সন্দেহের চোখে দেখা হয়, তবে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংঘর্ষের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আরও বিতর্ক তৈরি করেছে মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগের বিষয়টি।সেই রাজ্যের অভিযোগ-বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলি থেকে ৮৩০০ মাইক্রো অবজার্ভার এনে তাঁদের হাতে কার্যত ভোটার বাদ দেওয়ার ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছে। পাল্টা কমিশনের দাবি, রাজ্য সরকার পর্যাপ্ত গ্রুপ-বি অফিসার দেয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হল, প্রশাসনিক ঘাটতির দায় কি শেষপর্যন্ত ভোটারের উপর চাপানো হবে? আদালত এই জায়গাতেই ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছে- রাজ্যকে বলা হয়েছে, কতজন বাংলা ভাষায় সাবলীল গ্রুপ-বি অফিসার দেওয়া সম্ভব, তা দ্রুত জানাতে। স্পষ্ট ইঙ্গিত ভাষাগত বোঝাপড়া ছাড়া এই সংবেদনশীল কাজ চলতে পারে না। বুথ স্তরের আধিকারিকদের (বিএলও) স্বাক্ষর ছাড়া কোনো নথি বৈধ হবে না- এই নির্দেশও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিএলও-রাই স্থানীয় বাস্তবতা ও ভোটারের পরিচয় সবচেয়ে ভালো বোঝেন। তাঁদের বাদ দিয়ে যদি কেবল বাইরের নজরদারির উপর নির্ভর করা হয়, তবে তা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার বদলে রাজনৈতিক সন্দেহই বাড়াবে।মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল আবেদন- ২০২৫ সালের ভোটার তালিকা অনুযায়ীই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন হোক- এই বিতর্কের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু। এটি নিছক রাজনৈতিক দাবি নয়, বরং একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলে: ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যদি ব্যাপক বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক তৈরি হয়, তবে সেই তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা কতটা থাকে?সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ আপাতত একটি রক্ষাকবচ তৈরি করেছে। আদালত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে প্রকৃত ভোটারকে কোনোভাবেই বাদ দেওয়া যাবে না। তবে চূড়ান্ত সমাধান এখনও দূরে। সোমবারের শুনানি এই মামলার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ ঠিক করবে। একটি কথা পরিষ্কার- ভোটার তালিকা সংশোধন গণতন্ত্রের স্বার্থেই প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যদি অসংবেদনশীল, ভাষাগতভাবে বিচ্ছিন্ন ও সময়ের চাপে জর্জরিত হয়, তবে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে দুর্বল করে। পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর বিতর্ক তাই কেবল একটি রাজ্যের সমস্যা নয় - এটি গোটা দেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। ভোটাধিকার রক্ষা করতে হলে প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক বোধ ও সাংবিধানিক সংযম এই তিনের সমন্বয়ই শেষ কথা।