খেজুর গাছের নিচে,হারিয়ে যাওয়া শীত!!
অনলাইন প্রতিনিধি :-শীতের সকাল যেন মায়ের কোলের মতো নীরব, উষ্ণ আর
আশ্রয়ময়। রাতের শেষ প্রহরে হাল্কা শীতের ছোঁয়া আর ভোরের কুয়াশা গ্রামীণ আকাশে বেঁধে দেয় এক অদৃশ্য সুর। সেই সুরে জেগে ওঠে অতীত – ধুলো-মাখা স্মৃতির অ্যালবামে বন্দি গ্রামবাংলার কত না ছবি।এক সময় খেজুর গাছ কাটার গাছালিদের হৃদয়ের তানপুরায় সেই সুর বাজত। আজ আর তেমন করে বাজে না। মনের সেতারে তার আছে বটে, কিন্তু”খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন-“এই গান আর দোলা দেয় না মনকে।

নস্টালজিয়ার সেই ঘুমন্ত সুরকে জাগাতে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে বামুটিয়ার দক্ষিণ রাঙ্গুটিয়ায়, চারপাশে কৃষিজ ফসলের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা টিনের ছাউনি দেওয়া এক বেড়ার ঘরের বারান্দায় বসে হারিয়ে যেতে বসা খেজুর গাছের গল্প শোনালেন কৃষ্ণ বিশ্বাস।বললেন, “আমার খেজুর গাছকে নিয়েও গল্প হতে পারে”।এই কথার মধ্যেই যেন শৈশব থেকে বর্তমান অগণিত স্বপ্ন ঝুলে আছে খেজুর পাতার ফাঁকে ফাঁকে।
বারান্দায় বসে স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে কৃষ্ণ বিশ্বাস ফিরে যান তাঁর শৈশবে। উদয়পুর মহারাণীতে মামার বাড়ি, বড় মামা-ছোট মামার খেজুর গাছ কাটা আর গ্লাসে গ্লাসে রসভর্তি ‘হাঁড়ি’। শীতের চাদরে মুখ ঢেকে সেই রস খেলে যেন মুহূর্তেই শরীর জুড়ে আগুন লেগে যেত।“সন্ধ্যাবেলায় এই রসের যে স্বাদ, পৃথিবীর কোনো স্বাদ তার ধারে-কাছেও নেই,” বলেন তিনি।সকালবেলা রোদে বসে বাটিতে মুড়ি, তার সঙ্গে খেজুর রস থেকে তৈরি লালি – আজও নাকে লেগে আছে সেই গন্ধ।একদম খাঁটি রস জ্বাল দিলে যে লালি হতো, কাচের বোতলে রাখলে তার তলায় চিনির গুঁড়োর মতো জমে থাকত।”আহা! না খেলে বোঝানো যাবে না,” – একটা দীর্ঘশ্বাসে মিশে যায় আপশোস।পৌষ মাস মানেই রসের মিষ্টান্ন। লালি, পিঠে, পাটালি গুড় – গ্রামবাংলার আত্মা যেন লেগে থাকত এসবের গায়ে। চারকোণা টিনের তাকালে রস জ্বাল দিয়ে, শাড়ির কাপড়ে ছেঁকে গর্তে ঢেলে তৈরি হতো ‘বাটালি গুড়। শীতে আত্মীয় এলে সকালে মুড়ি বা চিঁড়ার সঙ্গে এই গুড় – এটাই ছিল আপ্যায়নের নিয়ম।আজ সেই খেজুর গাছ আধুনিকতার অট্টালিকা আর ফাস্টফুডের দাবানলে ধ্বংসের মুখে। খেজুর গাছের দিকে তাকিয়ে কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, “সূর্য অস্ত যায় নতুন ভোরের স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু এই খেজুর গাছ শুধু দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের দাদা-কাকাদের স্মৃতি বয়ে নিয়ে।নতুন প্রজন্ম তাকে নিয়ে আর স্বপ্ন দেখে না”। তবু হতাশার মধ্যেও স্বপ্ন ছাড়েননি তিনি।খেজুর গাছকে ঘিরেই দেখছেন ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। তার স্ত্রী জানালেন, একটি গাছ থেকেই তিন-চার লিটার রস পাওয়া যায়, যার লিটার প্রতি দাম প্রায় ১০০ টাকা। বেকারত্বের সময়েও এই গাছ আয়ের রাস্তা দেখাতে পারে।কৃষ্ণ বিশ্বাসের হিসেব স্পষ্ট – এক বিঘা জমিতে ১২০-১২৫টি খেজুর গাছ লাগানো সম্ভব। শীতকালীন ফসলের পাশাপাশি রস, লালি ও গুড় থেকেও আয় হতে পারে। বাজারে লালির দাম কেজি প্রতি ৪০০ টাকা, বাটালি গুড় ৫০০ টাকা।যুবসমাজের উদ্দেশে তার বার্তা স্পষ্ট – “নেশার সাগরে না ডুবে যদি প্রত্যেকে পাঁচটা করে খেজুর গাছ লাগায়, তাহলে শুধু অতীত নয়, ভবিষ্যৎও রক্ষা পাবে”।
তিনি জানান, এখন ভারতে হাইব্রিড ‘আজুবা’ খেজুর চারা আসছে -যা শীতে রস দেবে, আবার পরে ফলও দেবে। চারা জোগাড়ের পথও তিনি দেখাতে প্রস্তুত।সব মিলিয়ে,প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যেতে বসা খেজুর গাছ আজও কিছু মানুষের হাতে স্বপ্নের ভেলা হয়ে ভাসে।
অতীতকে আঁকড়ে ধরে, ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকা সেই খেজুর গাছের প্রেমিকদের হাত ধরেই হয়তো আবার ফিরবে গ্রামবাংলার শীতের সেই মিষ্টি সকাল।