জাতীয় অনূর্ধ্ব ১৫ মহিলা ক্রিকেট, সিকিমের কাছে পরাজিত ত্রিপুরা!!
ক্ষমতার দ্বিচারিতা
খাতায় কলমে সংবিধান সংশোধিত হয়ে ভারত এখনও ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ হয়ে যায়নি, এমনকি সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে এখনও ‘সমাজতন্ত্র’ আর ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দ দু’টিও এখনও বিলুপ্ত হয়নি। তবে আজকের ভারতবর্ষ বকলমে হিন্দুরাষ্ট্রই কি না, বড়দিনে মধ্যপ্রদেশ থেকে ছত্তিশগড়, উত্তরপ্রদেশ থেকে আসাম হয়ে কেরালা, স্বঘোষিত কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের কার্যত তাণ্ডবলীলা সেই প্রশ্নটাই উস্কে দিয়েছে। ভালোবাসা, করুণা ও সৌহার্দ্যের উৎসব বড়দিনের ঠিক আগের রাতে কোথাও গির্জার সামনে হনুমান চালিসা পাঠ, কোথাও শপিং মলে সান্তা ক্লজের মূর্তি ভাঙচুর, কোথাও আবার স্কুলের বড়দিনের অনুষ্ঠানে ঢুকে আগুন আর তছনছ। ক্রিসমাস ঘিরে এই ভাবে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের তাণ্ডবের সাক্ষী থাকলো গোটা দেশ।

ঠিক এই সময়েই প্রধানমন্ত্রী দিল্লির গির্জায় বড়দিনের সকালের প্রার্থনায় যোগ দিলেন। শান্তি, ভালোবাসা ও সহমর্মিতার বার্তা দিলেন। বড়দিন সমাজে সম্প্রীতির অনুপ্রেরণা দিক- এই কামনা করলেন। কিন্তু দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বড়দিনকে কেন্দ্র করে যে ভয়, ভাঙচুর আর বিদ্বেষ ছড়াল, সে বিষয়ে প্রধামন্ত্রীর মুখে একটি শব্দও শোনা গেল না। এই মৌনতা আদপে সম্মতির লক্ষন কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক উঠেই। বিরোধী রাজনৈতিক শিবির সুযোগ বুঝে প্রশ্ন তুলেছে, এ কেমন দ্বিচারিতা? একদিকে ক্যামেরার সামনে সম্প্রীতির ছবি, অন্যদিকে সংগঠিত ঘৃণার রাজনীতি নিয়ে নিশ্চুপ থাকা। ঘটনাগুলি বিছিন্ন নয়, বরং ছড়িয়ে থাকা একই রাজনীতির প্রকাশ।ঘটনার তালিকা দীর্ঘ। মধ্যপ্রদেশের জবুলপুরে একাধিক গির্জায় হামলার অভিযোগ উঠেছে। শাসকদলের জেলা সভানেত্রী অঞ্জু ভার্গব এক দৃষ্টিহীন মহিলাকে বড়দিনের অনুষ্ঠানে হেনস্থা করছেন, এমন ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী অসমের নলবাড়িতে সেন্ট মেরিজ শিক্ষায়তনে ঢুকে স্বঘোষিত কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা ভাঙচুর চালিয়েছে, ‘জয় হিন্দু রাষ্ট্র’ স্লোগান দিয়েছে। উত্তরপ্রদেশের বরেলি-সহ বিভিন্ন জায়গায় গির্জার প্রার্থনার সময় ঠিক সামনে গিয়ে সমস্বরে হনুমান চালিসা পাঠ করা হয়েছে। লখনৌয়ের হজরতগঞ্জে বড়দিনের উৎসবের মাঝেই ‘হরি বোল’ ধ্বনিতে হট্টগোল সৃষ্টি করা হয়েছে। বলা বাহুল্য যে এই হিন্দুত্বের সঙ্গে বেদ-বেদান্ত-গীতা- তন্ত্র ইত্যাদির কোনও সংশ্রব নেই। অতএব ক্ষমতার বাস্তুতন্ত্র থেকেই হাঙ্গামাকারীরা এমন বেপরোয়া সাহস পায় কি না, সে প্রশ্নও অস্বাভাবিক নয়। এ প্রশ্নটিও প্রায় অনিবার্য যে, বড়দিনের মতো সৌভ্রাতৃত্বের উৎসবকে যারা কলঙ্কিত করতে রাস্তায় নামে, তারা কারা?
এই সব ঘটনার একটি মিল স্পষ্ট, প্রায় সবক্ষেত্রেই বিজেপি-শাসিত রাজ্য, প্রায় সব ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত সংগঠনগুলির রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ, এবং প্রায় সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রযন্ত্রের নরম প্রতিক্রিয়া। ইতিহাসবিদ অধ্যাপক এস ইরফান হাবিবের মন্তব্য এই প্রেক্ষিতে তাৎপর্যপূর্ণ। তার কথায়, ‘এই গুণ্ডারা হিন্দু নয়। কোনও ধর্মেই বিদ্বেষের শিক্ষা নেই। এরা নিজেদের ধর্মেরও শত্রু। ভারতের বৈশিষ্ট্য হল সব ধর্মের উৎসব একসঙ্গে উদ্যাপন। প্রশ্নটা তাই ধর্মের নয়, প্রশ্নটা ক্ষমতার ব্যবহারের। কারণ শাসকের স্তর থেকে কোনও দৃঢ় বার্তা আসেনি। ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তর সত্যিই এমন কুৎসিত দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে চাইলে কোনও সংগঠনের পিতৃদেবেরও ক্ষমতা নেই অন্য ধর্মের ধর্মাচরণের স্বাধীন অধিকারের উপর এমন আক্রমণের। যারা রামনবমী বা হনুমান জয়ন্তীতে মসজিদের বাইরে জমায়েত করে ডিজে বাজায়, ক্রিসমাসে গির্জার বাইরে উচ্চঃস্বরে হনুমান চালিসা পড়ে, ‘ওঁ নমঃ শিবায়ঃ জপ করে, প্রভু যিশুর মূর্তিকে নিশানা করে; তাদের সঙ্গে কার কী সম্পর্ক সেটি তদন্ত সাপেক্ষ, কিন্তু হিন্দু ধর্ম বা ভারতীয় সভ্যতার কোনও সম্পর্ক নেই।
এই ঘটনাগুলো মিলিয়ে যে ছবি স্পষ্ট হয়, তা উদ্বেগজনক। রাষ্ট্র যদি সত্যিই নিরপেক্ষ হয়, তবে এই তাণ্ডব থামাতে তার কণ্ঠ এত দুর্বল কেন? নীরবতা কি কেবল উদাসীনতা, নাকি রাজনৈতিক হিসাব? বড়দিনের সকালে গির্জায় প্রার্থনা আর রাতে রাস্তায় রাস্তায় ভয় -এই দ্বিচারিতাই আজকের ভারতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকেত। এ দেশে খ্রিষ্টান জনসংখ্যা মাত্রা আড়াই শতাংশ। অথচ এই দেশ হিন্দু-মুসলিম- শিখ-খ্রিস্টান- সবার। সংবিধান সবার জন্য সমান অধিকার দিয়েছে। প্রতিটি ধর্ম, প্রতিটি মতের মানুষকে সমান অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে আমাদের পবিত্র সংবিধান। এই ধরনের ঘটনাসমূহ সংবিধান প্রদত্ত ধর্মাচরণের মৌলিক অধিকার-বিরুদ্ধ। এ দেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা যতটা রামের আছে, ততটাই রহিমের আছে এবং ততটাই মাইকেলের। ক্ষমতার কাছে এই সত্য বিস্মৃত হলে, তাতেই দেশেরই দুর্দিন ডেকে আনে।