রবিবার | ০১ মার্চ ২০২৬

কেজরিওয়ালের পুনর্জন্ম!

 কেজরিওয়ালের পুনর্জন্ম!

সম্পাদকীয়, ২৮ ফেব্রুয়ারী: দিল্লি বিধানসভা ভোটে বড় পরাজয়ের ঠিক এক বছর পর, ফের সংবাদ শিরোনামে বলা যায় ব্রেকিং নিউজে ফিরলেন আম আদমি পার্টির দি সুপ্রিমো অরবিন্দ কেজরিওয়াল। দিল্লির বহু আলোচিত আবগারি নীতি মামলায় জড়িয়ে তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে জেলে পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। টানা বারো বছর দিল্লির মসনদে রাজত্ব করার পর, ২০২৫ সালে নির্বাচনেও যখন ক্ষমতায় আসার ব্যাপারে চরম আশাবাদী ছিলেন, তখন এই বহুচর্চিত আবগারি নীতি রূপায়নে দুর্নীতি মামলায় জড়িয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে পরাজয়ের মুখ দেখতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, তার হাতে গড়া দল “আম আদমি পার্টিরও” ভরাডুবি হয়েছিল। দিল্লির ক্ষমতা হারিয়ে অরবিন্দ কেজরিওয়াল নিজেও যেন কোথাও হারিয়ে গিয়েছিলেন। গত প্রায় এক বছর ধরে তাকে নিয়ে তেমন কোনও সংবাদ সেভাবে লক্ষ্য করা যায়নি। কিন্তু গতকাল অর্থাৎ শুক্রবার দুপুরের পর থেকে আচমকাই দেশের তামাম সংবাদমাধ্যমে একেবারে ব্রেকিং নিউজে ফিরে এলেন দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং কারাবাসের টানাপোড়েন শেষে বড়সড় জয় পেলেন আপ সুপ্রিমো। বহুলচর্চিত দিল্লি আবগারি নীতি মামলায় শুক্রবার দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউ আদালত কেজরিওয়াল, মণীশ সিসৌদিয়া এবং বিআরএস নেত্রী কে কবিতা সহ মোট ২৫ জন অভিযুক্তকে অব্যাহতি দিয়েছে। আদালতের নির্দোষ সার্টিফিকেট পেয়ে আবেগে ভেঙে পড়েছিলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। সংবাদমাধ্যমের দৌলতে সেই ছবিও দেখেছে গোটা দেশবাসী। সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আদালতের এই “ক্লিনচিট” পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপিকে কার্যত তুলোধোনা করলেন কেজরিওয়াল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আপ সুপ্রিমো বলেন, “ক্ষমতা থাকলে দিল্লিতে ফের নির্বাচন করিয়ে দেখুক। যদি বিজেপি ১০টির বেশি আসন পায়, তাহলে আমি রাজনীতিই ছেড়ে দেব।” এমনই হুঙ্কার দিয়েছেন আপ সুপ্রিমো। যদিও বিজেপির পক্ষ থেকে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের এই হুঙ্কারকে তেমন একটা আমল বা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটা নিম্ন আদালতের রায়। ফলে এ নিয়ে উৎসাহিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। বিজেপির এই বক্তব্য থেকে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, নিম্ন আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে সরকার উচ্চ আদালতে যাবে।

এদিন আদালতের রায় শোনার পর, কিছুটা সামলে নিয়ে চশমা খুলে চোখের জল মুছতে মুছতে দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বললেন, “আমি অসৎ নই। এটা আমি বারবার বলেছি। আদালত আজ বলল কেজরিওয়াল এবং মণীশ সিশোদিয়া সৎ ব্যক্তি।” উল্লেখ্য, এই আবগারি মামলায় কেজরিওয়াল প্রায় মাস পাঁচেক জেলে ছিলেন। ২০২৪ লোকসভা ভোটের সময়ও আপ প্রধান জেলের অন্ধ কুঠরিতে বন্দি ছিলেন। দিল্লিতে আবগারি নীতি প্রণয়ন ও লাইসেন্স বণ্টনে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে কেজরিওয়াল ও তার সরকারের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে ইডি।

প্রসঙ্গত, গত বছর ডিসেম্বরে হওয়া দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবি হয় আপের। নিজের কেন্দ্রেও হেরে যান কেজরিওয়াল। মণীশ সিশোদিয়া সহ বেশিরভাগ আপ নেতা-মন্ত্রীরা ভোটে পরাস্ত হন। দিল্লিতে ২৭ বছর পর ক্ষমতায় আসে বিজেপি। দিল্লিতে হারের পর কেজরিওয়ালের রাজনৈতিক কেরিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠে যায়। পাঞ্জাবে আপ সরকারের অবস্থাও ভালো নয়। সেখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ার ছবি গোটা দেশের সামনে বারবার উঠে আসছে। আগামী বছর পাঞ্জাবে ভোট হবে। সেখানে আপের পুনরায় ক্ষমতায় ফেরা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে রাজনৈতিক মহলের অভিমত। দিল্লি, পাঞ্জাবের বাইরে আপের হাল বেশ খারাপ। এ নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। এমন অবস্থায় কেজরিওয়ালকে ফের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হতে হলে তার স্বচ্ছ ভাবমূর্তিতে ফিরতেই হবে। রাজনৈতিক মহলের মতে, সে কারণেই আদালত থেকে রেহাই পাওয়ার পর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে হুঙ্কার ছেড়েছেন আপ সুপ্রিমো। দিল্লি হারের জ্বালা এবং দুর্নীতির কলঙ্ক ঝেড়ে ফেলে কেজরিওয়াল এখন আত্মবিশ্বাসী যে দিল্লির মানুষ ফের তার পাশেই দাঁড়াবেন। এদিন প্রায় ৬০০ পাতার এক দীর্ঘ রায়ে আদালত কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই-এর পেশ করা তথ্যের তীব্র সমালোচনা করেছে। বিচারক স্পষ্ট জানিয়েছেন, বৃহত্তর ষড়যন্ত্র বা অপরাধমূলক অভিসন্ধির যে অভিযোগ সিবিআই এনেছিল, তার সপক্ষে কোনও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য বা প্রমাণ দাখিল করতে পারেনি সিবিআই। আদালতের এই রায়কে ‘সত্যের জয়’ হিসেবে বর্ণনা করে কেজরিওয়াল বলেন, “আদালত আজ প্রমাণ করে দিল যে এটি একটি অন্তঃসারশূন্য এবং সাজানো মামলা ছিল। আম আদমি পার্টিকে ধ্বংস করতে এবং তাকে গদিচ্যুত করতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এক গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ফেঁপেছিলেন।” তার দাবি, “স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এটিই ছিল বৃহত্তম রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। গত এক বছরে দিল্লির ৩ কোটি মানুষের জীবন ছারখার করে দেওয়া হয়েছে শুধু ক্ষমতার লালসায়।” গত ফেব্রুয়ারী মাসে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দিল্লির পরিস্থিতি শোচনীয় হয়ে পড়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০২১-২২ সালের আবগারি নীতিতে বিশেষ কিছু গোষ্ঠীকে সুবিধা পাইয়ে দিতে ১০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে-এই অভিযোগেই ২০২৩ সালে মণীশ সিশোদিয়া এবং ২০২৪ সালে কেজরিওয়ালকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। দীর্ঘ কারাবাস ও জামিনের টানাপোড়েন শেষে আদালতের এই পর্যবেক্ষণ আপ শিবিরে নতুন করে অক্সিজেনের জোগান দিয়েছে। এতে কোনও সন্দেহ নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেজরিওয়ালের এই আইনি জয় এবং পাল্টা আক্রমণ দিল্লির রাজনীতিতে ফের এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অনেকেই বলছেন, জাতীয় রাজনীতিতে “কেজরিওয়ালের পুনর্জন্ম” হলো। শুধু তাই নয়, আগামীদিনে দেশে মোদি এবং বিজেপি বিরোধী আন্দোলন আরও জোরদার হবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক সচেতন মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *