বুধবার | ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

কূটনীতি ও সৌজন্য

 কূটনীতি ও সৌজন্য

সম্পাদকীয়, ২৪ ফেব্রুয়ারীঃ যখন একটি বাঘ কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তখনই সে সবচেয়ে যত ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে- ত্রিশ বছর আগে মেলবোর্নের ড্রেসিংরুমে বসে সতীর্থদের উদ্দীপ্ত করতে ইমরান খানের সেই অমোঘ সংলাপ আজ কেবল ক্রিকেটীয় উপকথা নয়, বরং তাঁর ব্যক্তিজীবনের এক করুণ পরিহাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতির দাবার চালে আজ সেই ‘কাপ্তান’ মর্মান্তিক কোণঠাসা, তদুপরি মরণোম্মুখ! তাঁর সেই চিরপরিচিত বিক্রমে নয়, বরং শাসকের সুপরিকল্পিত অবহেলায় ও শারীরিক অসুস্থতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ‘কাপ্তান’। আদতে পাকিস্তানের রাজনীতি ও ক্রিকেট- এই দুই মেরুর সমান্তরাল চলনই সেই দেশের দস্তুর। অথচ আজ যখন সেই ক্রিকেটের রাজপুত্র জেলকুঠুরির অন্ধকারে তাঁর একটি চোখের ৮৫ শতাংশ দৃষ্টি হারাতে বসেছেন, তখন শাহবাজ শরিফ সরকার কিংবা সেনাপ্রধান আসীম মুনিরের নীরবতা কেবল অমানবিক নয়, বরং এক প্রকার রাষ্ট্রীয় অপরাধের নামান্তর।

রাজনীতির ময়দান যে মাঠের মতো নিয়মশৃঙ্খলায় চলে না, তা ইমরান হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের পৃষ্ঠাগুলি এমনিতেই রক্তে ও প্রতিহিংসার কালিতে লেপা। সেখানে ভুট্টোর ফাঁসি কিংবা শরিফদের নির্বাসন কোনোটিই নব্য ইতিহাস নয়। কিন্তু ইমরানের ক্ষেত্রে যে সীমাহীন প্রতিহিংসার নগ্ন রূপ প্রকট হয়েছে, তা আধুনিক বিশ্বের দরবারে পাকিস্তানকে পুনরায় এক বর্বর ও অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের তকমা পরিয়ে দিয়েছে।

বিস্ময়ের বিষয় এই যে, ইমরানের মুক্তির লড়াইয়ে আজ শামিল হয়েছেন সীমান্তের ঊর্ধ্বে থাকা বিশ্ব ক্রিকেটের চতুর্দশ পাল সুনীল গাভাসকার, কপিল দেব থেকে অ্যালান বর্ডার কিংবা ক্লাইভ লয়েড – ক্রিকেটের এই যুগন্ধর সেনানীরা যখন রাজনীতির কাদা বাঁচিয়ে কেবল মানবিক খাতিরে জেলবন্দি ইমরানের চিকিৎসার জন্য পাক প্রধানমন্ত্রীর কাছে দরবার করেন, তখন বুঝতে হবে মানবিকতার পাল্লাটি কোন দিকে ঝুঁকে আছে। মাঠের লড়াইশেষে স্টাম্প তুলে নেওয়ার পর যে সৌহার্দ্য ও শ্রদ্ধার বাতাবরণ তৈরি হয়, তাকেই ‘ক্রিকেটীয় সৌজন্য’ বলা হয়। রাজনীতির বুলডোজার দিয়ে সেই সৌহার্দ্যের সেতুটি ভেঙে ফেলার যে মত্ত খেলায় ইসলামাবাদ মেতেছে, এই ১৪ জন প্রাক্তন অধিনায়কের খোলা চিঠি যেন তার বিরুদ্ধে এক নৈতিক জেহাদ।

তবে এই পরম প্রাপ্তির বিপরীতে এক কদর্য শূন্যতাও আমাদের বিঁধতে থাকে। গাভাসকার-কপিলরা যখন প্রবীণ বয়সেও সত্য উচ্চারণের স্পর্ধা দেখান, তখন বর্তমানের মহাতারকাদের মৌনব্রত কিন্তু অলক্ষ্যে লজ্জাজনক ইতিহাসও লিখে রাখছে। গাভাসকার-কপিলদের কলম আজ যে ধ্রুবতারাটি দেখিয়ে দিল, বর্তমানের তারকাদের সেই আলো চেনার চোখ আছে কি? ইমরানের শারীরিক স্থিতি সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে চৌদ্দজন যুগন্ধর অধিনায়কের খোলা চিঠিটি আদপে অন্ধকারের মধ্যে এক চিলতে আলোর রেখা। এমন এক সময়ে, যখন ভারতের নবীন প্রজন্মের ক্রিকেটাররা রাজনীতির সুতোর টানে পুতুলের মতো নাচতে দ্বিধা করেন না, তখন গাভাসকার-কপিলদের এই নির্ভীক অবস্থান প্রমাণ করে যে, সব আলো এখনও নির্বাপিত হয়নি। ইমরান খানের প্রতি এই রাষ্ট্রীয় উৎপীড়ন বন্ধ না হলে, ইতিহাসের আদালত কোনোদিনও ইসলামাবাদকে মার্জনা করবে না। ক্রিকেটের ২২ গজের সেই মহানায়কের চোখের আলো নিভে যাওয়া মানে আধুনিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধেরই নির্বাসন। স্টাম্প উপড়ে ফেলার পর যুদ্ধের অবসান হওয়াই বিধেয়, রেষারেষি যেন অন্ধ আক্রোশে পর্যবসিত না হয় পাকিস্তানের শাসকরা কি এই সরল পাঠটুকু গ্রহণ করবেন? –

পরিশেষে, পাক প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে লেখা গাভাসকার-কপিলদের খোলা চিঠিটি কেবল একজন প্রাক্তন সতীর্থের প্রাণরক্ষার আর্তি নয়, বরং সমকালীন অবক্ষয়ের দর্পণে এক সজোরে চপেটাঘাত। বর্তমান ভারতের ক্রিকেট-মানচিত্রের দিকে তাকালে এক নিদারুণ শূন্যতা হাহাকার করে ওঠে, যেখানে নবীন প্রজন্মের উজ্জ্বল নক্ষত্রেরা ক্ষমতার অলিন্দে ঘুরে বেড়ান, রাজনীতির অদৃশ্য সুতোর টানে যাদের মুক্তকচ্ছ নাচানাচি আজ জনসমক্ষে দৃশ্যমান।

বিগত কয়েক মাস ধরে ভারত-পাক ক্রিকেটীয় সম্পর্কের যে রশি টানাটানি চলছে, তাতে চটকদার রাজনীতির বুলডোজার দিয়ে সেই আবহমান মৈত্রীর সেতুটিকে ধূলিসাৎ করার চেষ্টায় কোনও খামতি দেখি না। জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণ চশমায় যখন মাঠের লড়াইকে যুদ্ধের ময়দান বলে ভ্রম হয়, তখন রাজনীতিকদের আস্ফালনই দস্তুর। কিন্তু রাজনীতির এই কদর্য আবর্তের মধ্যেও গাভাসকার-কপিলরা প্রমাণ করলেন, সত্তরোর্ধ্ব শরীরেও মেরুদণ্ডটি টানটান রাখা সম্ভব। যখন উত্তরসূরিরা ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট কুড়াতে ব্যস্ত, তখন প্রাতঃস্মরণীয় এই প্রাক্তনীরা স্টাম্প তুলে নেওয়ার পরবর্তী সেই শাশ্বত সৌজন্যবোধকেই পুনরুজ্জীবিত করলেন। তাঁদের স্বাক্ষরিত ওই কাগজের টুকরাটি আদতে রাজনীতির অন্ধকার গহ্বরে এক প্রজ্বলিত ধ্রুবতারা। পাক শাসকেরা কি এই সরল পাঠটুকু গ্রহণ করবেন? আর আমাদের ঘরের উত্তরসূরিরা কবে সেই মেরুদণ্ডটি খুঁজে পাবেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *