সোমবার | ০২ মার্চ ২০২৬

ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ভারত, দোলের আগেই হোলিতে মাতলো ইডেনের দর্শকরা

 ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ভারত, দোলের আগেই হোলিতে মাতলো ইডেনের দর্শকরা

দৈনিক সংবাদ অনলাইন ডেস্ক, ১ মার্চঃ শুরু থেকেই বিতর্ক। প্রথমে বাংলাদেশের নাম প্রত্যাহার, ভাইজানকে সমর্থন করে পাকিস্তানের সরে যাওয়ার হুমকি। সব কিছু বিতর্ককে পিছনে ঠেলে ভারত আবার বিশ্ব খেতাব জয়ের লক্ষ্যের কাছাকাছি। হয় জেতো, নাহলে বাড়ি ফেরো। আর সমালোচনায় বিদ্ধ হও। প্রবল চাপে থাকা গম্ভীরের ছেলেরা শেষ পর্যন্ত নন্দনকাননে ক্যারিবিয়ানদের হারিয়ে সেমিফাইনালে পা রাখলো। দু’দিন বাকি বসন্ত উৎসবের। তার আগেই রবিবাসরীয় রাতে ইডেনের দর্শকরা রঙিন রঙে নিজেদের রাঙিয়ে উল্লাসে মেতে উঠলেন। সারা গ্যালারির দর্শক তখন সমবেতভাবে গাইছেন বন্দে মাতরম। এত ইডেনের দৃশ্য। সূর্যকুমারদের সেমিফাইনালে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতায় পাড়ায় পাড়ায় শুরু হয়ে গেল রং খেলা। সঙ্গে দেদার শব্দবাজির আওয়াজ। আসলে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন, সূর্যকুমারের হাতে শোভা পাচ্ছে বিশ্বকাপ ট্রফি। সেমিফাইনালে দেশ ওঠায় সেই স্বপ্ন যেন ভোরের গান গাইছে। ৪ বল বাকি থাকতে ৫ উইকেটে ক্যারিবিয়ানদের হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ চারে পা রাখলো টিম ইন্ডিয়া। অপর দিকে, শনিবার বিকেলে স্যামি এসে জানিয়েছিলেন, তাঁর ছেলেরা গান বাঁধছে। ভারতকে হারিয়ে নন্দনকাননের সবুজ গালিচায় ক্যারিবিয়ান নৃত্য ফুটিয়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশ্বকাপ খেলতে এসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক জানিয়েছিলেন, ট্রফি জয়ের লক্ষ্যেই ভারতে এসেছেন। কিন্তু এই ট্রফি জিততে হলে ভারতকে হারাতেই হবে। সেই ভারতই যে তাদের দেশে ফেরার বিমানের টিকিট হাতে ধরিয়ে দেবে, তা মানতে পারছিলেন না তিনি। ড্রেসিংরুমের বারান্দায় তাঁর হতাশ করুণ মুখ দেখে যে কোনও কঠিন মানুষেরও হৃদয়ে আঘাত দেবে। সদা হাস্যময়, চঞ্চল স্যামিকে এইভাবে কলকাতার মানুষ কোনও দিন দেখেননি। আসলে টুর্নামেন্টে বেশ ভালোই ছন্দে ছিলেন ক্যারিবিয়ানরা।

২০১৬-য় ক্রিকেটারের পর এবার কোচ হিসাবেও তিনি চেয়েছিলেন, বিশ্বকাপ ট্রফি। কিন্তু তা আপাতত অধরাই থেকে গেল। ইডেনের দর্শক নিয়ে একটা আভাস পাওয়া গিয়েছিল শনিবারই। রবিবারও দেদার কালোবাজারি। ৯০০ টাকার টিকিট বিকোচ্ছে চার হাজার টাকায়। তবুও হাতছাড়া করতে নারাজ সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীরা। অভিষেক, ঈশান, সূর্যকুমারদের জার্সি গায়ে গগনভেদী চিৎকারে প্রিয় দলকে সমর্থন করার সুযোগ আর কে-ই বা হাতছাড়া করতে চায়! তারই মধ্যে অবশ্য বিরাট-রোহিতের জার্সিও ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে যাই হোক, ইডেন এদিন হাউসফুল। গ্যালারিতে তাকালে মনে হবে যেন নীল তরঙ্গ। প্রায় যাট হাজার দর্শকের এই ম্যাচ পাশাপাশি বসে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করলেন জয় শাহ, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়রা। এদিন টস ভাগ্য ছিল সূর্যকুমারের সঙ্গেই। জিতে প্রথমে বোলিং করার সিদ্ধান্ত নেন ভারত অধিনায়ক। ভারত দল পরিবর্তন না করলেও, ওয়েস্ট ইন্ডিজের টিম লিস্ট দেখে অবাক হতেই হবে! ব্র্যান্ডন কিংয়ের পরিবর্তে তারা দলে নিয়েছে আকাইল হোসেনকে। একজন ওপেনারের পরিবর্তে স্পিনিং অলরাউন্ডার। আর ওপেনের জায়গায় সাই হোপের সঙ্গে নাম লেখা রস্টন চেজের! যা দেখে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদেরও চক্ষু চড়ক গাছে।

ভারতের সামনে প্রথম সুযোগ আসে তৃতীয় ওভারের দ্বিতীয় বলে। আর্শদীপ সিংয়ের বলটি চেজ ঠেলে দিয়ে রান নিতে যান। কিন্তু হোপ রাজি ছিলেন না। বল যায় বরুণ চক্রবর্তীর হাতে। কিন্তু সঞ্জু স্যামসনের দিকে না ছুড়ে বরুণ বলটি দেয় নন-স্ট্রাইক এন্ডে। পঞ্চম ওভারে বল করতে আসেন জসপ্রীত বুমরা। শেষ বলে চেজের একেবারে সহজ ক্যাচ ফসকান অভিষেক শর্মা। শুধু একবারই নন, ম্যাচের শেষ দিকে আরও একটি ক্যাচ মিস করেন তিনি। পাওয়ার প্লেতে কোনও উইকেট না হারিয়ে ৪৫ রান তোলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এবারের বিশ্বকাপে প্রথম কোনও দল ভারতের বিরুদ্ধে ওপেনিং জুটিতে ৫০-এর বেশি রান করল। অবশেষে ৬৮ রানে ভাঙল জুটি। সৌজন্যে বরুণ। নবম ওভারের পঞ্চম বলে বোল্ড হয়ে ফেরেন হোপ। ৩২ রান করলেও, তার জন্য ক্যারিবিয়ান অধিনায়ক নিয়েছেন ৩৩ বল। ফলে হোপের এই ইনিংসকে মন্থর বলা যেতেই পারে। তবে বিশ্বকাপে প্রথমবার ওপেন করতে নেমে নজর কাড়লেন চেজ। তাকে সঙ্গ দিতে মারকাটারি ইনিংস শুরু করেন শিমরন হেটমেয়ার। কিন্তু বেশিক্ষণ টেকেননি তিনি। মাত্র ১২ বলে ২৭ করে বুমরার বলে ফেরেন হেটমেয়ার। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি তিনি। চেজেরইনিংস শেষহয় সূর্যকুমারের একটাদুর্দান্তক্যাচে। ২৫ বলে ৪০ রান করে আউট হন একই ওভারের পঞ্চম বলে। তবে এক্ষেত্রে বুমরার থেকে সুর্যর কৃতিত্ব অনেক বেশি। ১২তম ওভারে মাত্র চার রান দিয়ে দুই মারকুটে ব্যাটারকে ফেরান বুমরা। শেরফানে রাদারফোর্ড ৯ বলে ১৪ রান করেন। ১৬তম ওভারে আর্শদীপ আবার ২৪ রান দিয়ে বসেন। হাত খোলেন রভম্যান পাওয়েল। ১৯ বলে ৩৪ রান করে অপরাজিত থাকেন তিনি। সঙ্গে জেসন হোল্ডার অপরাজিত থাকেন ২২ বলে ৩৭রান করে। নির্ধারিত ২০ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ১৯৫ রান তোলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। অভিষেক শর্মাকে সামনে পেয়ে ক্যারিবিয়ানরা শুরুটাও করেন হোসেনকে দিয়ে।

স্পিনের সামনে অভিষেকের দুর্বলতা প্রকট হয়ে উঠেছে এবারের বিশ্বকাপে। প্রথম ওভার কোনও মতে সামলে দিলেও, তৃতীয় ওভারে উইকেট দিয়ে এলেন তিনি। হোসেনকে ছক্কা মারতে গিয়ে ক্যাচ হয়ে ফেরেন অভিষেক (১১ বলে ১০)। ঈশান কিসানও মাত্র ৬ বল টিকেছিলেন ক্রিজে। ১০ রান করে বাউন্ডারি লাইনে ক্যাচ আউট হন তিনি। এরপর ম্যাচের হাল ধরেন সঞ্জু ও সূর্য। ২৬ বলে নিজের অর্ধশতরান পূরণ করেন স্যামসন।

চলতি বিশ্বকাপে এটাই প্রথম হাফসেঞ্চুরি তার। স্কাই ১৬ বলে ১৮ রান করে আউট হওয়ার পর শুরু করেন তিলক বর্মা। ১৫ বলে ২৭ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলে যান তিনি। হার্দিক করেন ১৪ বলে ২৭। বাকি কাজটা করেন শিবম দুবে ও সঞ্জু। তবে দর্শকরা মুখিয়ে বসেছিলেন সঞ্জুর শতরানের অপেক্ষায়। সেটা না হওয়ায় একটা আক্ষেপ থেকেই গেল। কিন্তু সঞ্জুর একটা দিক ধরে রেখে পরিণত ব্যাটিং দলকে জয় এনে দিল। ৫০ বলে ৯৭ রান করে অপরাজিত থাকলেন ম্যাচের নায়ক। ইডেনে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে কখনও হারেনি ভারত। এবারও সেই ধারা বজায় রাখল টিম ইন্ডিয়া। ২০১১ সালের পর এখনও পর্যন্ত ইডেনে হারের মুখ দেখতে হল না মেন ইন ব্লুকে। এবার সামনে ইংল্যান্ড। আবার সেই ওয়াংখেড়ে। ২০১১ সালে এই স্টেডিয়ামে বিশ্বসেরা হয়েছিল ভারত। এবার ফাইনালে ওঠার লড়াই। অপেক্ষা আর মাত্র কয়েকটা দিনের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *