January 7, 2026

ওপারে ঝুলন্ত সংসদ!

 ওপারে ঝুলন্ত সংসদ!

বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দাখিল পর্ব শেষ হল।তিনশো আসনেরর জন্য মনোনয়ন পড়েছে ২,৫৮২টি। অর্থাৎ প্রতি আসনে গড়ে আটজন প্রার্থী রয়েছেন। বাংলাদেশের এই নির্বাচনে সবচেয়ে বড়দল আওয়ামী লীগ নেই। দেশের ভেতরের এবং বাইরে থেকেও ইউনুস সরকারের কাছে আর্জি জানানো হয়েছিল যাতে সব কয়টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারে সেই ব্যবস্থা করার। কিন্তু আদৌ তা হয়নি। ইউনুসের নেতৃত্বাধীন তত্বাবধায়ক সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ না করলেও দলের রাজনৈতিক যে কোনো কর্মসূচি নিষিদ্ধ করায় দল নির্বাচনে যেতে পারেনি। দেশে ভোটের অনুকূল পরিস্থিতি নেই জানিয়ে ভোট থেকে বিরত থাকছে আরও দুইটি দল।
এই ঘটনার চেয়েও বড় হলো বাংলাদেশের ভোটারদের মতিগতি। ভোটার ভজনা এখনো সেইভাবে শুরু হয়নি বটে তবে কোনদিক থেকে কিভাবে শুরু করা এই নিয়ে ভাবনায় রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলিও। ভোেট পূর্ব জনমত সমীক্ষা চলছে দেশে। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সমীক্ষক সংস্থা ভোটারদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বুঝতে চাইছেন। এক একটি সমীক্ষক গোষ্ঠী আলাদা আলাদা রাজনৈতিক মহলের পক্ষে হাওয়া অনুকূল বলতে চাইলেও ঝেড়েকেশে কেউই বলতে পারছে না। সমীক্ষাগুলির ফলাফলে নানা ভিন্নতা থাকলেও একটি বিষয়ে সবারই স্পষ্টভাবে এক রকম সুর। সে হলো সিংহভাগ ভোটারের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতা। দেখা গেছে দেশে প্রায় ৪৭ শতাংশ ভোটার ভোট নিয়ে সিদ্ধান্তহীন।
তারা জানাচ্ছেন, ভোট নিয়ে তারা এখনো কিছুই ভাবছেন না, ভাবেন নি। কেউ বলেছেন, ভাবনা একটা আছে বটে তবে ভোট কেন্দ্রে যাবার শেষ মুহূর্তে ভাবনা বদলেও যেতে পারে। ৪৭ শতাংশ ভোটার যদি কোনও নির্বাচনে ভাসমান চিহ্নিত হয় তাহলে ওই নির্বাচনের ফলাফল কোনও নির্দিষ্ট পক্ষের অনুকূলে যাবে- এমন কথা ভাবা কষ্টকর। পৃথিবীর কোথাও কোনও নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট গরিষ্ঠতায় পৌঁছায়নি। ঝুলন্ত সংসদ, জোড়াতালি সরকার জন্ম দিয়েছে।এতে সরকারগুলির আয়ু কোথাও দীর্ঘ হতে পারেনি। ভোটাররা এতো বৃহৎ সংখ্যায় কখন ভাসমান হয়! গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন নিয়ে যারা গবেষণা করেন তাদের মতে, ভোটার যদি আর্থিক দূরবস্থায় থাকেন তখন শাসকের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিশোধে 'শাস্তিমূলক ভোট' দিয়ে থাকেন। সেক্ষেত্রে শাসকপক্ষ পরাজিত হয়ে থাকে। রাজনৈতিক দূরবস্থার ক্ষেত্রেও ভোটার নীরব ভূমিকা নিয়ে 'শান্তিমূলক ভোট' প্রয়োগ করে থকেন।
সে দেশের একাংশের মতে, নির্লিপ্ত, ভাসমান ভোটাররা আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটার। দেশে আওয়ামী লীগ 'পতিত' রাজনৈতিক শক্তি বলে চিহ্নিত হলেও তার সমর্থকরা রয়ে গেছে। দল ভোটে দাঁড়াচ্ছে না বলেই তারা সিদ্ধান্তহীন। কেউ আরও একটু এগিয়ে বলছে, আওয়ামী লীগের গোপন কৌশল হলো, ভাসমান ভোট বাড়ানো। কারণ এক্ষেত্রে ঝুলন্ত সংসদ এবং কম আয়ুর সরকার হবে। অস্থিরতা এবং সংকট চলতে থাকলে তবেই মাথা তুলতে পারবে আওয়ামী লীগ। ওয়াকিবহাল অন্য একটি মহলের মতে, শেখ হাসিনার শাসনকালে একটি প্রজন্ম তো ভোেট কাকে বলে তা জানতেই পারেনি। হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনে মানুষ ধরেই নিয়েছেন তারা ভোট দিতে পারবেন না।
আরও একটি মত শোনা যায় ভাসমান ভোটারের সংখ্যা নিয়ে। তাদের বক্তব্য ভোট ও গণভোেট মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করে রেখেছে। ভোট নিয়ে মানুষ ভাবতে চাইছেন না কারণ ভোট বানচালের ষড়যন্ত্রও আছে। হিংসা ও অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা রয়েছে। সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এসবে গা ভাসাতে রাজি নয়। মুখ ফিরিয়ে রেখেছেন। এই মতাবলম্বীরা আশাবাদী রাজনৈতিক দলগুলি ভোট প্রচার শুরু করলে সাধারণ মানুষ ভোটমুখী হবেন। ভাসমান ভোটারের সংখ্যা কমে যাবে।
এই কথা ঠিক যে, বাংলাদেশে বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে থাকায় বড় অংশের ভোটার বিভ্রান্তি এবং সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছে। রাজনৈতিক কোন দলের নেতাদের বক্তব্য তারা শুনবেন? সেই সিদ্ধান্ত যতদিন পর্যন্ত আওয়ামীর সমর্থকেরা নিতে না পারছেন- ততদিন ভাসমান ভোটারের সংখ্যায় খুব বেশি হেরফের হবার নয়। বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে ঝুলন্ত সংসদ আর জোড়াতালির সরকারই ভবিতব্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *