January 11, 2026

ঐতিহাসিক রায়!!

 ঐতিহাসিক রায়!!

নিয়মিত পদে চাকরিতে আর স্থির বেতন নয়। নিয়মিত পদে নিয়োগের প্রথম দিন থেকেই দিতে হবে নিয়মিত বেতনক্রম। চাকরি পাওয়ার পর পাঁচ বছর স্থির বেতন দেওয়ার বৈষ্য মূলক সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিয়েছে উচ্চ আদালত। বৃহস্পতিবার ত্রিপুরা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এএমএস রামচন্দ্র রাও এবং বিচারপতি বিশ্বজিৎ পালিতকে নিয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ, প্রাক্তন একক বিচারপতি অরিন্দম লোধের রায় খারিজ করে এই রায় দিয়েছে।উচ্চ আদালতের এই রায়কে ঐতিহাসিক বলে আখ্যায়িত করেছে রাজ্যের বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠন। এখানেই শেষ নয়, উচ্চ-আদালতের ডিভিশন বেঞ্চে এই রিট মামলা যারা দায়ের করেছিল, সেই আবেদনকারী স্নাতকোত্তর এবং স্নাতক শিক্ষকদের মামলার তিন বছর আগে থেকে নিয়মিত বেতনক্রম দিতে নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। এই বকেয়া অর্থ ৯ শতাংশ সুদ সহ আগামী দুই মাসের মধ্যে রাজ্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে প্রদান করতে হবে। এই রায় ঘোষণা হওয়ার সাথে সাথে স্বাভাবিক ভাবেই নিয়মিত পদে স্থির বেতনে চাকরি প্রাপকদের মধ্যে ব্যাপক খুশী পরিলক্ষিত হয়। কেননা, এই অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্থির বেতনের চাকরি প্রাপকরা দীর্ঘবছর ধরে লড়াই ও আন্দোলন চালিয়ে আসছে। সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছিল, সমকাজে সমবেতন দেওয়ার জন্য। কিন্তু রাজ্য সরকার এতদিন এবিষয়ে কর্ণপাতই করেনি। নিয়মিত পদে চাকরি পাওয়ার পর পাঁচ বছর স্থির বেতনে চাকরি করাটা যেন এ রাজ্যে আইন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অবশেষে সরকারের সেই বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়েছে উচ্চ আদালত।উল্লেখ্য, পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকার ২০০১ এবং ২০০৭ সালে নিয়মিত পদে পাঁচ বছর স্থির বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। সেই থেকে আজও ওই বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়ে চলেছে। ২০১৮ সালে বাম সরকার পতনের পর প্রথমবার ক্ষমতায় আসা বর্তমান বিজেপি সরকারও একই পথে হাঁটে। এখানে আরও উল্লেখ্য যে, টেট উত্তীর্ণ হয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অনুমোদিত শূন্যপদে নিয়মিত বেতনক্রমে চাকরি পেলেও, নিযুক্তির সময় চাকরি প্রাপকদের কাছ থেকে মুচলেকা আদায় করা হয় যে, তারা পাচ বছর স্থির বেতন পাবেন।বলা যায় চাকরি পাপকদের এই মুচলেকা দেওয়ার জন্য এক প্রকার বাধ্য করা হয়। কেননা এছাড়া তাদের কাছে দরকষাকষি বা বিকল্প কোনও রাস্তা থাকে না। পরিস্থিতির চাপে তারা মুচলেকা দিতে বাধ্য হয়। উক্ত রিট মামলায় নিয়মিত পদে নিযুক্ত হয়ে পাঁ বছর নিয়মিত বেতনক্রম থেকে বঞ্চিত রাখাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। কিন্তু পূর্বতন একক বিচারপতি অরিন্দম লোধ দুটি রিট মামলাই খারিজ করে দিয়েছিলেন। এর বিরুদ্ধে ডিভিশন বেঞ্চে রিট আপিল করা হয়েছিল। আবেদনকারীদের পক্ষে আইনজীবী উচ্চ-আদালতে সওয়াল করতে গিয়ে বলেন, নিয়মিত পদে নিযুক্তিদের পাঁচ বছর স্থির বেতনে রাখার সরকারী সিদ্ধান্ত অসাংবিধানিক ও অযৌক্তিক। নিয়োগের শর্তের পরিপন্থী। সরকার পক্ষও নিজেদের মতো করে বক্তব্য উপস্থাপন করেছে। কিন্তু তা ধোপে টিকেনি। উচ্চ আদালত দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে রাজ্য সরকার কর্তৃক ২০০১ সালের ১৫ ডিসেম্বর এবং ২০০৭ সালে ১৬ অক্টোবর প্রদত্ত দুটি বিজ্ঞপ্তিকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে তা খারিজ করে দিয়েছে। ওই দুই বিজ্ঞপ্তিমূলে সরকার বৈষম্যের সূচনা করেছিল। উচ্চ-আদালত এদিন রায়ে স্পষ্টভাবে বলেছে, মুচলেকা আদায় করে সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না। সরকারের সাথে একজন চাকরি প্রাপক দর কষাকষির অবস্থায় থাকে না, চূড়ান্ত অসম অবস্থানের জন্য। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তকে অবশ্যই সাংবিধানিক মূল্যবোধের অনুসারি হতে হবে। উচ্চ আদালতের এই রায়ের ফলে আড়াই দশক ধরে চলতে থাকা এক সীমাহীন বৈষম্যের অবসান হবে বলে মনে করছে অনেকেই। কিন্তু রাজ্য সরকার এই ঐতিহাসিক রায়ের পর কোন পথে হাঁটবে? উচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়ন করে আড়াই দশক ধরে চলতে থাকা বৈষম্যের ইতি টানবে? নাকি বৈষম্যকে আরও দীর্ঘায়িত করতে সুপ্রিমকোর্টের কড়া নাড়বে? সেটাই এখন দেখার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *