এক জোড়া যুদ্ধ!
সম্পাদকীয়, ৪ মার্চঃ উপসাগরীয় যুদ্ধের আস্ফালনে অনালোকিত হয়েছে আফগান ৩ তালিবানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ‘সরাসরি যুদ্ধের’ ঘোষণা। মানচিত্রে খুব কাছাকাছি অঞ্চলে এই দুই যুদ্ধের নাটকীয় ও বিপজ্জনক ঘটনা ঘটে চলেছে। তিন দেশের অবস্থান খুবই কাছাকাছি। ইরান, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের পারস্পরিক আন্তর্জাতিক সীমানা রয়েছে। আর ভারতের সঙ্গে রয়েছে পাকিস্তানের সীমানা। ফলে বিষয়গুলি আমাদের গা ছোঁওয়া। দুটি যুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই ‘রেটরিক’ (বক্তব্য) সামরিক বাস্তবতাকে অনেকটাই ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই দুই যুদ্ধে কোনো পক্ষেরই জয়ের সক্ষমতা নেই।

২০২৫ সালে ইরান-আফগানিস্তানের যুদ্ধ থেকে একটা ঝাপসা অভিজ্ঞতা পাওয়া যায় বটে, কিন্তু এই বারের যুদ্ধ অনেক ভয়াবহ ও অভূতপূর্ব। ইরানের বর্তমান শাসক আত্মসমর্পণ বা আলোচনার চাইতে পতন অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করছে। রাশিয়া এবং চিন প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য ইরানের প্রতি যে দুর্বলতা দেখাচ্ছে, তাতে আমেরিকার শেষ পর্যন্ত পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেওয়াও অস্বাভাবিক হবে না। সেই ক্ষেত্রে আমেরিকা অবশ্য একে পরাজয় বলে স্বীকার করবে না, কারণ ইতিহাস তাই বলে। ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের যুদ্ধে আমেরিকা পরাজয় স্বীকার করেনি। অন্যদিকে পতন তো পতন, পরাজয় নয়। প্রসঙ্গ পাকিস্তানের যুদ্ধ ঘোষণা। শনিবার ইরানে যৌথ হামলার একদিন আগে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা এম. আসিফ গত শুক্রবার আফগানিস্তানজুড়ে একাধিক হামলার পর সামাজিক মাধ্যমে অস্বাভাবিকভাবে কঠোর ও ক্ষুব্ধ ভাষা ব্যবহার করেন।
তিনি লিখেছেন, ‘পাকিস্তান সরাসরি এবং বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। পূর্ণমাত্রায় কূটনীতি চালিয়েছে। আমাদের ধৈর্যের পেয়ালা উপচে পড়েছে। এখন আমাদের এবং তোমাদের মধ্যে খোলা যুদ্ধ।’ সেই দিন আফগানিস্তানে ইসলামাবাদের বোমা হামলা ছিল ব্যাপক। এর মধ্যে বিমান ও গোলন্দাজ হামলাও ছিল। এই হামলাগুলো চলে কাবুল, পাকতিকা, কান্দাহারসহ প্রধান শহরগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো হয়। কান্দাহারেই তালিবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা বাস করেন। তালিবানের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ অবশ্য ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি হালকা করে দেখিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘কাপুরুষ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়ার কিছু স্থানে বোমাবর্ষণ করেছে। আল্লাহর রহমতে কেউ হতাহত হয়নি।
পাকিস্তানের হামলার জবাবে তালিবান কিছু ‘অসাধারণ’ দাবি করে তারা ইসলামাবাদের ফয়জাবাদের কাছে একটি সামরিক ঘাঁটি, নওশেরার একটি সেনা ক্যান্টনমেন্ট এবং অ্যাবোটাবাদে বিমান হামলা করে দেয় যা পাকিস্তানের ভেতরে তালিবানের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হামলা। প্রসঙ্গত, আফগান তালিবান বাহিনী পাকিস্তানের সীমান্তচৌকিতে হামলা চালিয়ে ২০ জন পুলিশ ও অসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছিল। বস্তুত এর কয়েকদিন পরই পাকিস্তানের এই অভিযান শুরু হয়। পাকিস্তান পূর্ব আফগানিস্তানে সন্দেহভাজন জঙ্গি ঘাঁটি লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালালে পাল্টাপাল্টি এসব সংঘর্ষ ঘটে। তালিবান জানায়, সীমান্তে পাক হামলায় নারী-শিশুসহ ১৮ জন নিহত হয়েছিল।

বহু দিন ধরে ধারাবাহিকভাবে সম্পর্কের অবনতির পর দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক এখন তলানিতে। ২০২১ সালে তালিবানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনকে পাকিস্তান স্বাগত জানায়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছিলেন, আফগানরা দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলেছে। কিন্তু মধুচন্দ্রিমা ছিল স্বল্পস্থায়ী। দুই দেশের বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে পাক সন্ত্রাসীদের আফগানিস্তানের আশ্রয়-প্রশ্রয়। ইসলামাবাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ হলো পাকিস্তানের জঙ্গি গোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) আশ্রয় পাচ্ছে আফগানিস্তানে। আশ্রয় দিচ্ছে আফগান তালিবানরা। এই গোষ্ঠীটি (টিটিপি) পাকিস্তানের ভেতরে ক্রমবর্ধমান প্রাণঘাতী হামলার নেপথ্যে কাজ করে যাচ্ছে। কাবুল এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। বরং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ইসলামিক স্টেট-সংশ্লিষ্ট যোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তোলে তালিবান সরকার – যা ইসলামাবাদও দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সর্বশেষ বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল ২০২৫-এর অক্টোবরে। সেই সময় তুরস্ক ও কাতারের মধ্যস্থতায় পরিস্থিতির আর অবনতি ঘটেনি, তবে সে প্রক্রিয়ার যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। গত সপ্তাহের হামলা নিয়ে পাকিস্তানের দাবি, ২৭০ জনের বেশি আফগান তালিবান যোদ্ধা মারা গেছে, ১৮টি সামরিক ঘাঁটি দখল হয়েছে, ডজনখানেক ঘাঁটি ও গোলাবারুদের গুদাম ধ্বংস করেছে। উল্টোদিকে তালিবানের দাবি, তারা ৫৫ পাকিস্তানি সৈন্যকে নিকেশ করেছে, একাধিক সীমান্তচৌকি দখল করে নিয়েছে। উভয় দেশের সরকারই একে অপরের দাবি বা বক্তব্য খণ্ডন করছে। উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের সংখ্যা পৃথকভাবে কারো পক্ষে যাচাই করা কঠিন। তবে উপসাগরের যুদ্ধের কারণে এই দুই প্রতিবেশীর যুদ্ধের মেজাজ খানিক নরম হয়ে এলেও এই বিরতি সাময়িক, তা বোঝা যাচ্ছে।