সোমবার | ০২ মার্চ ২০২৬

উপসাগরের যুদ্ধ

 উপসাগরের যুদ্ধ

সম্পাদকীয়, ১ মার্চঃ উপসাগরের যুদ্ধ এই বার কোন পথে? শনিবার সকালে ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলার পরেই এই যুদ্ধ তার নিজ দিক নির্ণয় করে নেয়। ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পর ইরান সরকারীভাবে খোমেইনি সহ মন্ত্রী ও বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের লোকজনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। এতে যুদ্ধের অভিমুখ বিন্দুমাত্র পরিবর্তনের আশঙ্কা এই ক্ষেত্রে নেই। সেই কথা জানা যায় ইরানের মনোভাব থেকেও। সমর বিশারদেরা বলতে শুরু করেছেন নানা কারণে এই যুদ্ধ দীর্ঘ হবে। ইরানকেই দীর্ঘকালের যুদ্ধে যেতে হবে নিজের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার যখন ঘোষণা করলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর বড়সড় হামলা চালিয়েছে, ঠিক সেই সময়ে ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর তরফ থেকে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের ‘ডজনখানেক সামরিক লক্ষ্যবস্তু’ আঘাতের মুখে পড়েছে।

ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানে এই অভিযানের উদ্দেশ্য হলো ইরানের সামরিক শক্তিকে বিপর্যস্ত করা, তাদের পরমাণু কর্মসূচি গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সরকার বদলে দেওয়া। ট্রাম্প, নেতানিয়াহু যখন এই সব বলছিলেন, সেই সময়ে তেহরানের স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাদের বাস বলে মনে করা হয়, সেখান থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। বিশ্ব যখন এই খবরে চোখ রাখছে, তখন নানা প্রচারমাধ্যম নিজ নিজ মতো করে ঘটনাটিকে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে ৯ কোটির বেশি মানুষের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে রেখে চারটি কঠোর বাস্তবতা এখন সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রথম বাস্তবতা হলো-মার্কিন সামরিক শক্তির উন্মত্ত প্রদর্শন। এই শক্তি প্রদর্শনের নেতৃত্বে আছেন এমন একজন প্রেসিডেন্ট, যিনি দেশীয় ক্ষেত্রে এপস্টিন ফাইল কেলেঙ্কারি, আঞ্চলিক ক্ষেত্রের ভেনেজুয়েলা, কিউবা ও গ্রিনল্যান্ডে সামরিক হানা দেওয়ার ধরা পড়া এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের চিন ও রাশিয়া-সংক্রান্ত টানাপোড়েন ও ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরাতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

সবাই বুঝে নিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে ভুয়া ছিল শান্তি আলোচনা। একটা নাটক সাজিয়ে ট্রাম্প আসলে কালক্ষেপ করছিলেন। আসল উদ্দেশ্য ছিল সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করে কার্যকর আঘাত হানার সুযোগ তৈরি করা। দেখা গেল আমেরিকার মানুষ এই যুদ্ধ মোটেও পছন্দ করছেন না। আবার ট্রাম্পের কর্পোরেট প্রচারমাধ্যম এই যুদ্ধকে ‘প্রতিরোধমূলক হামলা’ হিসেবে তুলে ধরতে ব্যস্ত। যদিও ট্রাম্পের এই ব্যাখ্যা সবাইকে বিশ্বাস করানো সহজ হবে না। দ্বিতীয় বাস্তবতা ইরান নিজেই। গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারীর শুরুতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছিল। দীর্ঘদিনের গভীর অর্থনৈতিক সংকটই ছিল সেই বিক্ষোভের মূল কারণ। সংকটের পেছনে দুটি সমান্তরাল কারণ কাজ করেছে। এক-রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও অদক্ষতা, এবং দুই-আমেরিকার কঠোর নিষেধাজ্ঞা। এই রাজনৈতিক কৌশল আর ক্ষমতার লড়াইয়ের আড়ালে আটকে রয়েছে ৯ কোটির বেশি সাধারণ ইরানি মানুষ। তারা যেন নিজ ভূমেই বন্দি। তাই ইরানে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা প্রকট। ট্রাম্পের কথা মতো এই যুদ্ধ যদি সত্যিই ইরানের ‘সরকার বদলের’ লক্ষ্যে হয়, তবে তার অভিঘাত কেবল রাজনৈতিক পালাবদলে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তার ভার বহন করবে ইরানের সব মানুষ অনেক অনেক কাল ধরে। এটি সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
তৃতীয় বাস্তবতার নাম ইজরায়েল। উপসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক শক্তিতে সমৃদ্ধতম রাষ্ট্র। প্যালেস্তাইনে গণহত্যার পাশাপাশি ২০২৫ সালে লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালিয়েছে তারা। এই নতুন যুদ্ধপর্বে ইরায়েলের একাধিক লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, প্যালেস্তাইনের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে বিশ্বব্যাপী যে নিন্দা সুর তৈরি হয়েছে, তার থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, নিজেদের ‘গ্যারিসন রাষ্ট্র’ আরও বিস্তৃত করা। সেই পরিকল্পনায় ইরানকে ভেঙে দেওয়া জরুরি। চতুর্থ তথা শেষ বাস্তবতা হলো পাহলভি রাজবংশের অবশিষ্ট অংশের একধরনের বিভ্রম। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে ইরানিরা যে শাসনকে উৎখাত করেছিল, সেই পাহলভি বংশের নেতা রেজা পাহলভি ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখছেন। যদিও ইরানের ভেতরে পাহলভিদের কোনো জনপ্রিয় ভিত্তি নেই। কিন্তু গুন্ডামি আর ইসরায়েলের রক্তাক্ত যুদ্ধনীতির সঙ্গে তাদের সখ্যতা-এই যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের পরিচয়চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই যুদ্ধে এরা এখন সংবাদমাধ্যম দখল করবে এবং বিশ্বকে বোঝাতে চাইবে-তাদের লড়াই ন্যায়ের পক্ষে। ইরানের সামনে সব মিলিয়ে দীর্ঘ যুদ্ধই শেষ পথ হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *