ইরান এবার কোন পথে?
সম্পাদকীয়, 2 মার্চঃ ইরানের স রানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিইর মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হওয়ার পর দেশটি এসে পৌঁছেছে এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ৪৭ বছরের ইতিহাসে এটাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুহূর্ত। আর এর চেয়েও বড় বিষয়, খামেনিইর মৃত্যুর ফলে উপমহাদেশের ভূরাজনৈতিক চিত্রটাই পালটে যাচ্ছে। এই উপমহাদেশের সাতটি দেশে যে পথে, যেভাবে আমেরিকা নিয়ন্ত্রণ তৈরি করেছে, ইরানকেও সেই নিয়ন্ত্রণের বেড়াজালে আনতে চাইছেন ট্রাম্প। এই বিষয়টি স্পষ্ট। এক্ষেত্রে উপমহাদেশের শাকরেদ, একমাত্র পরমাণু শক্তিধর ইজরায়েল তার সঙ্গে। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, আমেরিকা ভেনেজুয়েলা গ্রাসের পর এবার ইরানের তৈলক্ষেত্রকেই নজরে রেখেছে। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতিতে তেল কি আগামী দিনে খুব জরুরি? সেই প্রশ্ন নিয়ে ভাবিত নন ট্রাম্প। তিনি দেখছেন দেশের আসন্ন অন্তর্বর্তী নির্বাচন।

এই নির্বাচনে বৈতরণী পার হতে এখনই ইরানের তৈলক্ষেত্র দরকার। আমেরিকা সম্যক জানে, আগামী দিন বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থ মিনারেলের। এই লড়াইয়ে আমেরিকা অনেক আগেই চিনের কাছে হেরে আছে। ফলে চিন তাদের ব্রহ্মতালুতে ফুঁ দিয়ে যাচ্ছে। ফুঁ আরও অনেকেই দিচ্ছে। তবে সেগুলি ট্রাম্পের ধর্তব্যের বিষয় নয়। রাশিয়া বরাবরই আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব মানতে নারাজ। অতীতে রাশিয়া চিনকে বারবার ইরানের ঘনিষ্ঠতায় দেখে গেছে, ২০২৫ সালে ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধের সময়ে কিংবা যুদ্ধের পরে শান্তি-আলোচনা চলাকালীন সময়েও। তাহলে আজ চিন কোথায়? শনিবার হামলার ঘটনা এবং রবিবার খামেনিইর মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর এখনও পর্যন্ত চিনের কোনো প্রতিক্রিয়া কিন্তু পাওয়া যায়নি। তাহলে চিনের অবস্থান কোথায়! বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই যুদ্ধ কতটা লম্বা হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে চিনের ওপর। চিন বিরল খনিজে বিশ্বসেরা হতে চললেও এই সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল-ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে চিহ্নিত। চিন সস্তায় তেল পেত ভেনেজুয়েলা, ইরান ও রাশিয়ার কাছ থেকে। ভেনেজুয়েলা বন্ধ হয়ে গেল ট্রাম্পের আগ্রাসনের কারণে। এবার ইরানও বন্ধ হয়ে যায়, তা বেইজিং নিশ্চয়ই চাইবে না। আর ইরানেও যদি ট্রাম্পের থাবা বসে যায়, তাহলে বিশাল পরিমাণ তেলের চাহিদা পূরণে রাশিয়া হয়ে উঠবে এক বিকল্পহীন উৎস। এটি আর্থিকভাবে চিনের জন্য বিপদের। অতএব ইরানের যুদ্ধ তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাক, সেটি অন্তত চিন চাইবে না। আর ইরান এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে পারার অর্থ হবে ট্রাম্প, নেতানিয়াহুদের সম্মানজনক পশ্চাৎপসরণের পথ খুঁজে নেওয়া। ২০২৫ সালে ইজরায়েল যা করেছিল ট্রাম্পের মাধ্যমে। কিন্তু খামেনিইর মৃত্যুর পর ট্রাম্প কি সেই অবস্থায় থাকবেন আগামী এক সপ্তাহে?

তবে এই সময়ে ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল তার অভ্যন্তরীণ সংকট যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাটিয়ে ওঠা। দেশটায় এখন কী হবে-এই প্রশ্ন সবার। কী হবে, তা নির্ভর করছে ক্ষমতাকেন্দ্রের ভেতরে কারা প্রাধান্য পান তার ওপর। কট্টরপন্থীরা প্রতিশোধমূলক অবস্থান নিতে চাইবেন। অন্যদিকে এমনও কেউ থাকতে পারেন, যাঁরা বুঝতে চাইছেন যে তাঁদের সময় ফুরিয়ে আসছে এবং এখনই আলোচনার পথ খোঁজার সময়। কিন্তু এর পর? এখান থেকে ইরান কোন পথে এগোবে? দীর্ঘদিনের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ব্যাপক দুর্নীতি এবং শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ সুবিধাভোগের সংস্কৃতি দেশটিকে ভেতরে ভেতরে দুর্বল করেছে। কেবল নিষেধাজ্ঞা বা দুর্নীতি নয়, শাসনব্যবস্থার অদক্ষতাও ইরানকে দুরবস্থায় নিয়ে এসেছে। তবু ইরান এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি এবং যে দেশের সম্ভাবনা বিপুল, বিশাল। ইরানে উচ্চশিক্ষিত বিশাল জনগোষ্ঠী রয়েছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বিস্তৃত প্রবাসী সমাজও শক্তিশালী। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাসের মজুত এবং চতুর্থ বৃহত্তম তেলের মজুত রয়েছে দেশটিতে। এছাড়া সোনা, তামাসহ নানা প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ ইরান।
তবে এইটুকু বলা যায়, আগামী এক সপ্তাহ সময়কাল অনেক কিছুই স্পষ্ট করে দেবে। খামেনিইর চারপাশে থাকা কট্টরপন্থীরা প্রতিশোধের রাজনীতি চালিয়ে যেতে পারেন এবং ইজরায়েল, সৌদি আরব, বাহারিন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করতে পারেন। আবার বাস্তবতা মেনে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেও পারেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষায়, এখন তাঁরা দায়মুক্তির সুযোগ পেতে পারেন, পরে হয়তো কঠোর পরিণতির মুখে পড়বেন। খোমেনিই-বিহীন ইরান ট্রাম্পের কথা গায়ে না মেখেই যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, সেই অধিকার তো তাদের আছেই।
তাদের অভ্যন্তরীণ যে বিষয়গুলি সেই ভাবনাকে প্রভাবিত করবে সেগুলি হল-প্রথমত, ইরান সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো ভেঙে যাওয়ার পথে নেই। কুর্দি ও বালুচ জনগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকলেও আজারিদের মতো বড় জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের মূল কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিজেও আজারি।
দ্বিতীয়ত, দেশের বাইরে অবস্থানকারী গোষ্ঠীগুলো, বিশেষত রাজতন্ত্রের উত্তরাধিকার রেজা পাহলভি-যা-ই বলুন, দেশের ভেতরে তাঁদের সমর্থনের মাত্রা স্পষ্ট নয়। তবে খামেনিইর মৃত্যুর পরও ইরানের দমনপীড়ন হয়তো ভুলে যাওয়া সহজ নয়। জানুয়ারির বিক্ষোভ দমনে বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার তরুণ মারা গেছে, যা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে।
তৃতীয়ত, খামেনিইর অনুপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পথে একটি বড় বাধা সরে গেছে। গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকেই স্পষ্ট ছিল যে খামেনিইর ‘দেরি করা ও এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল’ কার্যকর হয়নি। খামেনিই মারা যাওয়ার আগে আলি লারিজানিকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। এখন লারিজানি ও প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সামনে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ কথা ঠিক, তাঁদের এবার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। ট্রাম্প যা চান তা মেনে নেওয়া তাঁদের দেশের পক্ষে সহজ নয়।
চতুর্থত, চিন ও রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কয়েক বছর ধরে চিন ইরানের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী ও তেল-ক্রেতা। ইরানের বিক্ষোভ দমনে ব্যবহৃত নজরদারি প্রযুক্তি নাকি চিন সরবরাহ করেছে। অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া ইরানি ড্রোন ব্যবহার করেছে। বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে এই দুই দেশের আঞ্চলিক প্রভাবও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।