পরিকল্পনা কমিশন ছিল স্বাধীন ভারতের অর্থনৈতিক আত্মার প্রতীক। সুভাষচন্দ্রবসুর ভাবনায় জন্ম নেওয়া পরিকল্পিত উন্নয়নের সেই দর্শনকে ২০১৪ সালের পর 'অচল', 'সেকেলে' বলে বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল এক ঝটকায়। তার বদলে তৈরি হল নীতি আয়োগ- যার দশ বছরের অস্তিত্ব আজও প্রমাণ করতে পারেনি, আদৌ সে পরিকল্পনা কমিশনের শূন্যস্থান পূরণ করতে পেরেছে কি না। রাজ্যগুলির আর্থিক স্বার্থরক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সামাজিক ন্যায্যতা-এই প্রশ্নগুলিতে নীতি আয়োগ কার্যত নীরব দর্শক হয়েই থেকেছে। এবার সেই একই পথে হাঁটতে চলেছে মোদি সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রেও।

দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড বলে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি বাতিল করার সিদ্ধান্ত শুধু একটি সংস্থা তুলে দেওয়ার ঘোষণা নয়, এটি আসলে স্বাধীন ও সমালোচনামূলক শিক্ষাব্যবস্থার উপর সরাসরি আঘাত। ইউজিসি মানেই শুধু অর্থ বরাদ্দ নয়, ইউজিসি মানে ছিল ন্যূনতম মানদণ্ড, স্বশাসন এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ঢাল। সরকারের দাবি, নতুন কাঠামো নাকি 'সংস্কারমূলক','সরলীকরণ'-এর অংশ। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলছে, মোদি সরকারের এই তথাকথিত সংস্কারের অর্থ একটাই-কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো, ভিন্নমত দমন করা এবং স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলিকে অনুগত দপ্তরে রূপান্তরিত করা। নীতি আয়োগ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পরিকল্পনা কমিশনের যে জায়গায় যে প্রতিষ্ঠান এলো, তার কোনও সাংবিধানিক ক্ষমতা নেই, কিন্তু কেন্দ্রের নির্দেশ মানতে রাজ্যগুলিকে বাধ্য করার এক অদৃশ্য হাত সেখানে সবসময় সক্রিয়। ইউজিসি তুলে দিয়ে যদি একই ধরনের 'কেন্দ্রীয় সুপারভাইজরি বডি' তৈরি হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে-বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা কোথায়? গবেষণার স্বাধীনতা কোথায়? উচ্চশিক্ষা কি তবে পুরোপুরি সরকারের নীতি ও আদর্শের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়বে? সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, এই ধরনের মৌলিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে কোনও বিস্তৃত জাতীয় আলোচনা ছাড়া। সংসদে পূর্ণাঙ্গ বিতর্ক নেই, শিক্ষাবিদদের মতামত নেই, রাজ্যগুলির সঙ্গে প্রকৃত পরামর্শ নেই। যেন প্রতিষ্ঠান গড়া বা ভাঙা কোনও কর্পোরেট বোর্ডরুমের সিদ্ধান্তমাত্র। স্বাধীনতার পর দেশ যে প্রতিষ্ঠানগুলি গড়ে তুলেছিল, সেগুলি ছিল শুধু প্রশাসনিক কাঠামো নয়, সেগুলি ছিল গণতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষাকারী স্তম্ভ। পরিকল্পনা কমিশন হোক বা ইউজিসি- এই সংস্থাগুলি সরকার বদলালেও রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখত। আজ একের পর এক সেই স্তম্ভভেঙে ফেলা হচ্ছে।২০১৪ সালের পর থেকে ভারতের শিক্ষা, প্রশাসন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, সরকারী প্রকল্প একে একে হয় বাতিল করে নতুন ভাবে নির্মাণ করা হয়েছে অথবা নাম পরিবর্তন হয়েছে। সেই বদল তালিকায় যুক্ত হল মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি স্কিম, তেমনই আবার উচ্চশিক্ষা নীতিরও কাঠামো বদলের জন্য নতুন আইন আনার প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করল মোদি সরকার। চলতি সংসদ অধিবেশনে লোকসভায় পেশ করা হল, বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান বিল ২০২৫। বিলের লক্ষ্য-কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির বর্তমানে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিকে বাতিল করে দেওয়া। নতুন একটি কমিশন গঠন করা হবে। আর থাকবে তিনটি পৃথক কাউন্সিল। এটি কিন্তু ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নয়। বরং আগামী দিনে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা তথা নীতি নির্ধারণ সংক্রান্ত যাবতীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকবে শিক্ষামন্ত্রকের হাতে। অর্থাৎ কেন্দ্রই নিয়ন্ত্রণ করবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। আর তাই বাতিলা হয়ে যাচ্ছে এতদিনের বহু প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ইউজিসি। যদিও এদিন বিরোধীদের প্রবল আপত্তিতে এই মর্মে আশ্বস্ত করা হয় যে বিলটিকে যৌথ সংসদীয় কমিশনে পাঠানো হবে, সেটির মাথায় থাকবেন একজন চেয়ারপার্সন। তাকে নিয়োগ করবেন রাষ্ট্রপতি। অর্থাৎ ঘুরপথে নিয়োগ করবে মোদি সরকারই। আইআইটি, এনআইটি, আইআইএস, আইআইএসইআর, আইআইএম, আইআইআইটি ইত্যাদি প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এই একটি কমিশনের অধীনে থাকবে। এতদিন পর্যন্ত আইআইটি কিংবা আইআইএম ইউজিসির নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল না। এবার নতুন কমিশনের আওতায় সেগুলিও চলো
আসছে। বিলটি পাস হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট আইন কার্যকর হবে সমস্ত কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ওপেন, ডিসট্যান্স লার্নিং, অনলাইন ও ডিজিটাল এডুকেশন সর্বত্র। জাতীয় শিক্ষা নীতির ধাঁচেই তৈরি হয়েছে নয় আইনটি। তিনটি কাউন্সিল তৈরি করা হবে। সেগুলির অন্যতম হল নিয়ন্ত্রক কাউন্সিল, যা হবে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির নিয়ন্ত্রক অনুমোদনকারী সংস্থা হবে অ্যাক্রডিটেশন কাউন্সিল। আর স্ট্যান্ডার্ড কাউন্সিল স্থির করবে উচ্চশিক্ষার গুণমান, সিলেবাস। যদিও একটি নামও ইংরেজিতে থাকবে না।রেগুলেটরি কাউন্সিলের নাম হবে শিক্ষা বিনিয়মান পরিষদ। শিক্ষা গুণবত্তা পরিষদ নাম দেওয়া হলে অনুমোদনকারী সংস্থাকে। আর স্ট্যান্ডার্ড কাউন্সিলের নামে হবে শিক্ষ মানক পরিষদ। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষার নিয়ন্ত্রক প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের না হবে হিন্দি ভাষায়। আইনের নাম হিন্দিতেই উচ্চারণ করতে হলে লিখতেও হবে। তাই প্রশ্নটা আর ইউজিসি থাকবে কি থাকবে না- সৌ নয়। প্রশ্ন হল, মোদি সরকার কি এমন এক ভারত গড়তে চাইতে যেখানে চিন্তা, শিক্ষা ও পরিকল্পনার সব সুতো থাকবে এককেন্দ্রি ক্ষমতার হাতে? ইতিহাস স্বাক্ষী- যে রাষ্ট্র তার প্রতিষ্ঠান ধ্বংস কে সে শেষ পর্যন্ত নিজের ভিত্তিকেই দুর্বল করে ফেলে। এখনই এ সিদ্ধান্ত নিয়ে সর্বস্তরের বিতর্ক জরুরি। নইলে নীরবতার মধ্য দিয়ে হয়তো ভারতের উচ্চশিক্ষার স্বাধীন অধ্যায়টি শেষ হয়ে যাবে।