আরও কড়া ব্যবস্থার হুমকি ট্রাম্পের,খামেনেই-এর স্ত্রীর মৃত্যু
ব্রিটিশ সেনাঘাঁটিতে হানা,
বেপরোয়া ইরানের কামড়ে ত্রস্ত আরব
দৈনিক সংবাদ অনলাইন ডেস্ক, ২ মার্চ : পাল্টা হামলায় খামেনেইহীন ইরান ২০২৫-এর লড়াইয়ের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষিপ্র এবং বেপরোয়া। তৃতীয় দিনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালালো নেতানিয়াহুর দপ্তরে। ইজরায়েলের উপর দফাওয়ারি হামলার পাশাপাশি উপসাগরের সাত দেশে মার্কিন ঘাঁটিগুলিতে বড়সড় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সোমবার সন্ধ্যায় কুয়েতে মার্কিন দূতাবাসের পাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে। অপরদিকে হামলার বিস্তৃতি ঘটালো ইজরায়েলও। লেবাননে ইজরায়েলের বোমা হামলায় এদিন ৩১ জন মারা গেছে বলে জানিয়েছে সেই দেশটির প্রশাসন। দাবি করা হচ্ছে, ইরানের হয়ে লেবাননের জঙ্গিগোষ্ঠী হিজবুল্লা মাঠে নেমে ইজরায়েলের ওপর মিসাইল হামলা চালানোর জেরে ইজরায়েল পাল্টা হামলা চালিয়েছে বলে সে দেশের সেনাবাহিনী জানিয়েছে। এদিকে রাতে ইরানের একটি পরমাণু ক্ষেত্র বিমানঘাঁটির কাছাকাছি এলাকায় বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

শনিবার সকালে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হানায় খামেনেই-এর স্ত্রীরও মৃত্যু ঘটেছে বলে ইরান এদিন সরকারীভাবে জানিয়েছে। এদিকে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, শনিবার আমেরিকা-ইজরায়েলের হামলায় এ পর্যন্ত মোট ৫৫৫ জন মারা গেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জায়নবাদী ও আমেরিকার যৌথ হামলায় এখন পর্যন্ত ১৩১টি শহর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুঃখজনকভাবে ৫৫৫ জন নাগরিকের মৃত্যু ঘটেছে। সোমবার ইরানের রেভুলুশনারি গার্ড জানিয়েছে, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর দপ্তর এবং বিমানবাহিনীর
সদর দপ্তরে খাইবার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলার পর নেতানিয়াহুর কোনও প্রকাশ্য বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তৃতীয় দিনেও ঘটনাবহুল ছিল উপসাগরীয় অঞ্চল। বিকেল নাগাদ ইজরায়েল ইরানের রাজধানী তেহরানে আর এক দফা হামলা চালায়। ইজরায়েল অবশ্য এর আগে হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছিল। তেহরানের বিভিন্ন প্রান্তে বিকট শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। আকাশে মিসাইল ও প্রতিহতকারী বোমার মুহুর্মুহু সংঘর্ষের দৃশ্য দেখেছেন তেহরানের মানুষ।

এদিন ওমানের মেরিটাইম সিকিউরিটি সেন্টার জানিয়েছে, বিস্ফোরকবোঝাই নৌকা দিয়ে তেলভর্তি ট্যাংকারে হামলা চালালে ইঞ্জিনে আগুন লেগে যায় এবং বিস্ফোরণ ঘটে। একজন ক্রু কর্মী নিহত হন। বাকিরা প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছেন। ইরান এদিন রাষ্ট্রপুঞ্জের পরমাণুবিষয়ক পর্যবেক্ষণ সংস্থার বোর্ড অফ গভর্নর্সের বৈঠকে জানিয়েছে, শনিবার ইরানের নাতাঞ্জ পরমাণু কেন্দ্রে ও অন্যান্য পরমাণু প্রতিষ্ঠানগুলিতে হামলা চালানো হয়েছে। এদিকে কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে এদিনও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। ইরানের সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, সেনাবাহিনীর স্থল ও নৌ ক্ষেপণাস্ত্র দল ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে কুয়েতে মার্কিন বিমানঘাঁটি আলি আল সালেম লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এছাড়া ভারত মহাসাগরের উত্তরে শত্রু জাহাজগুলিকে নিশানা করেছে।
প্রসঙ্গত, সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল রাস তানুরা কমপ্লেক্স বন্ধ করে দিয়েছে আরামকো কর্তৃপক্ষ। সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, শোধনাগার লক্ষ্য করে দুটি ড্রোন হামলার চেষ্টা হয়। হামলা প্রতিহত করা গেলেও ড্রোনের ভগ্নাবশেষ থেকে আগুন লেগে যায়। তবে হতাহতের খবর নেই। এই ঘটনার পর আরামকো কর্তৃপক্ষ এই চত্বর বন্ধ করে দেয়। প্রসঙ্গত, রাস তানুরা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় শোধনাগারও। এর দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা পাঁচ লক্ষ পাঁচ হাজার ব্যারেল। এদিকে কুয়েতে সোমবারও আমেরিকার যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান। বেশ কয়েকটি বিমান ভূপাতিত হয়। তবে কুয়েতের প্রতিরক্ষামন্ত্রক জানিয়েছে, উদ্ধার অভিযান চলছে। বিমানচালকদের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের অবস্থা স্থিতিশীল। সোমবার দুপুর নাগাদ দুবাই, আবুধাবি, দোহা, মানামা এবং জেরুজালেমে প্রায় একই সঙ্গে হামলা চালায় ইরান। একটি দেশের সেনাবাহিনীর যে কোনও সময়ে এতগুলি দিশায় হামলা চালানোর ঘটনা যুদ্ধের ইতিহাসে অভাবনীয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবি, কাতারের দোহা, বাহরিনের মানামায় তীব্র বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। আরব আমিরাতের জনবহুল শহরগুলিতে বিস্ফোরণের পাশাপাশি জেরুজালেমেও আক্রমণ তীব্র করে ইরানের সেনাবাহিনী। তৃতীয় দিনে ইরান আক্রমণের তীব্রতা ধরে রাখার পাশাপাশি নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ইরানের নিরাপত্তাবিষয়ক প্রধান আলি লারিজানি এদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, তাঁর দেশ আমেরিকার সঙ্গে কোনও আলোচনায় যাবে না। নিহত খামেনেই-এর উপদেষ্টা লারিজানি স্পষ্ট করে দেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা চলছে বলে যা শোনা যাচ্ছে, তা সঠিক নয়। এদিকে রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব ও নিরাপত্তা পরিষদকে চিঠি পাঠিয়েছে ইরান। তাতে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি লিখেছেন, আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলি খামেনেই-এর নিহত হওয়ার ঘটনা ঘৃণ্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। নৃশংস সন্ত্রাসী দুটি দেশের এই ঘটনায় পূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রপুঞ্জ অবিলম্বে দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপ নিক। অন্যদিকে রবিবার গভীররাতে সাইপ্রাসে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা হয়। হামলায় ক্ষয়ক্ষতি কম হলেও ঘটনাটি যুদ্ধবিস্তৃির জন্য একটি দৃষ্টান্ত। রবিবারই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানিয়েছিলেন, ইরানে হামলার জন্য আমেরিকা তাদের ঘাঁটিগুলি ব্যবহার করতে চেয়েছিল, ব্রিটেন সেই অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে। এরপরই মাঝরাতে সাইপ্রাসের অ্যাক্রোটিরি ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা হয়। উপসাগরে এটি ব্রিটেনের সর্ববৃহৎ ঘাঁটি।
