January 7, 2026

আমেরিকার নিকট-শত্রু

 আমেরিকার নিকট-শত্রু

যাএক সময় কল্পনাও করা যায়নি, সেটাই কি ঘটতে চলেছে আমেরিকা যা আর আর ইউরোপে?আমেরিকা দিনে দিনে আর ইউরোপের বন্ধু নয় প্রতিপক্ষ হিসাবে পরিগণিত হয়ে চলেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা নীতি নিয়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলি যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। তারা মনে করছেন গৃহীত নীতিতে আছে স্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা। ইউরোপের নেতাদের মনে বুঝি আর কোনো দ্বিধার সুযোগ দিচ্ছে না ট্রাম্পের প্রশাসন। এর চেয়েও গুরুতর বিষয় হলো ইউরোপের ভেতরেই ইউরোপ বিরোধিতা তৈরি করা এখন আমেরিার খোলাখুলি ঘোষিত নীতি। অর্থাৎ গোপণে নয়, এখন প্রকাশ্যেই ওয়শিংটন ইউরোপকে দুর্বল করতে চায় নিজের প্রতিপক্ষ হিসাবে।
এ বাস্তবতার ভেতরেই রয়েছে এক স্পষ্ট বার্তা, ইউরোপ হয় লড়বে, নতুন বা ধ্বংস হবে। যদিও আপাতত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে নিজের শক্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞাত না হয়েই ট্রাম্প এই ধরনের ঝুঁকি নিচ্ছেন। কারণ ইউরোপের হাতে এমন বেশ কিছু অস্ত্র রয়েছে, যার ব্যবহারে কুপোকাত হতে পারে ট্রাম্পের অর্থনীতি। অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতার মতো শক্তিশালী তুরুপের তাস আছে ইউরোপের হাতে। ইউরোপের নেতারা যদি চক্ষুলজ্জা ঝেড়ে সাহসী ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তবে এসব তাস কার্যকরভাবে খেলানো সম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা এখন এতটাই বিশাল যে ট্রাম্পের কট্টর জাতীয়তাবাদী শ্বেতাঙ্গ সমর্থকদের পেনশন পর্যন্ত আটকে যেতে পারে। ভঙ্গুর অবস্থা নিতে পারে ট্রাম্প প্রশাসনের আর্থিক ব্যবস্থাপনা।

এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ মার্কিন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি। ছলতি আর্থিক বছরের প্রথমার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির প্রবৃদ্ধির প্রায় ৯২ শতাংশ এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাদ দিলে প্রবৃদ্ধি প্রায় নগন্য, মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। ডোনাল্ড ট্রাম্প যতই সাহসী বক্তব্য দিন না কেন, তার অর্থনৈতিক ভিত্তি মোটেও শক্ত নয়, বরং নড়বড়ে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক জোটও ভঙ্গুর। গত জুলাই মাসে ও এই ডিসেম্বরে ট্রাম্প মার্কিন সিনেটে রিপাবলিকানদের বাধ্য করার চেষ্টা করেছিলেন তার প্রস্তাবিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিষেধাজ্ঞা (মোরাটোরিয়াম) আইন পাস করাতে। এই আইন পাস করানো না গেলে অঙ্গ রাজ্যগুলোকে নিজেদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা তৈরিতে বাধা থেকে যাচ্ছে। ট্রাম্পের চেষ্টা ব্যর্থ হয়।ট্রাম্প আজকাল প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি ইউরোপের নেতাদের দুর্বল মনে করেন এবং মনে করেন এই সব নেতারা তাদের নাগরিকদের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রক্ষা করতে অক্ষম। তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ইউরোপের যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে তা ট্রাম্পের ধারণাকে দৃঢ় করেছে। ইউরোপ যদি তার সক্ষমতা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে এ সংঘাতের চূড়ান্ত ফলাফল হয়তো ওয়াশিংটনের পক্ষে নয়, ব্রাসেলসেই নির্ধারিত হবে। মেগা (শ্বেতাঙ্গ জাতীয়দাবাদী) আন্দোলনের স্টিভ ব্যাননপন্থী সংগঠন মনে করে,কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে ব্যাপক কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।শিশুরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কী দেখছে তা নিয়েও উদ্বিগ্ন।মেগা ভোটাররা বড় মাত্রার প্রযুক্তির রাজনৈতিক ক্ষমতাকে অবিশ্বাস করেন। প্রযুক্তি নীতি ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দুর্বলতাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে তার নিজ দলের মধ্যেও।
ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ভন ডার লেনের হাতে যে দুটি শক্তিালী হাতিয়ার আছে, যা ট্রাম্পের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বুদ্বুদ ফাটিয়ে দিতে পারে। ট্রাম্পের গদি গুরুতর সংকটে পড়তে পারে। প্রথম হাতিয়ার এএসএমএল। নেদারল্যান্ডসের এই কোম্পানির নিজস্ব প্রযুক্তির ওপর বিশ্বের মাইক্রো চিপ বানোনার কারিগরি নির্ভরশীল। এরা একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রাখে, যাকে বলা হয় এক্সট্রিম আলট্রাভায়োলেট লিখোগ্রাফি। এটি অত্যাধুনিক চিপ বানোনোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি কোম্পানি হিসেবে বিবেচিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া এই যন্ত্রণাগুলোর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। এর রপ্তানি সীমিত করলে নেদারল্যান্ডসের অর্থনৈতিক লোকসান হবে বটে তবে ইউরোপের জন্য রাজনৈতিকভাবে হবে কঠিন সিদ্ধান্ত। এতে আমেরিকার ক্ষতির পরিমাণ হবে অপরিমেয়। ইউরোপ যদি যুক্তরাষ্ট্রের অথবা তাইওয়ানে এ যন্ত্র রপ্তানি ধীর করে বা বন্ধ করে দেয়, তাহলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান এবং একে ভর করে গড়ে ওঠা ডেটা সেন্টারগুলো একেবারে দেওয়ালে ঠেকবে। ইউরোপের হাতে দ্বিতীয় হাতিয়ারটির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে সহজ। সে হলো ইউরোপের তথ্য সুরক্ষা আইন। এটি কঠোরভাবে কার্যকর হলে আমেরিকার গুগলের মতো কোম্পানিগুলো কতটা দুর্বল তা প্রমাণিত হয়ে যাবে। অন্যদিকে মেটা এখনও মার্কিন আদালতে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা দিতে পারেনি, তাদের অভ্যন্তরীণ সিস্টেম কীভাবে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে-কারা সেই তথ্য দেখতে পায় কিংবা কী উদ্দেশ্যে তা ব্যবহৃত হয়। এই অনিয়ন্ত্রিত তথ্য ব্যবহারের সুযোগ কোম্পানিগুলোকে বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতে সাহায্য করছে যা ইউরোপীয় আইনের আওতায় সম্পূর্ণ বেআইনি। এদিকে ব্রাসেলস যদি কেবল আয়ারল্যান্ডকে বাধ্য করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়মগুলো ধারাবাহিক ও কঠোরভাবে কার্যকর করতে, তাহলে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ভয়াবহ পরিণতির মুখে পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *