January 8, 2026

আবার ফিরিয়ে দাও আমার উৎসব, সেই পুতুল নাচ!!

 আবার ফিরিয়ে দাও আমার উৎসব, সেই পুতুল নাচ!!

অনলাইন প্রতিনিধি :-কাকড়াবনের হারিয়ে যাওয়া পুতুল নাচ – কালিকিশো মাঠের বুক জুড়ে আজও ধুকপুক করে এক অদৃশ্য স্মৃতি। কাকড়াবনে সন্ধ্যা নামত ধীরে ধীরে। পশ্চিম আকাশে লালচে আলো থিতিয়ে এলেই মনে হতো – কিছু একটা ঘটতে চলেছে। গ্রামের শিশুদের আনমনা চোখ হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠত। কারণ তারা জানত – আজ কালিকিশো মাঠে পুতুল নাচ। মায়ের কোল ছেড়ে, বাবার হাত ধরে, ভাইবোনের সাথে তাল মিলিয়ে এক লম্বা সারি নামত মাঠমুখী। পথের ধুলো উড়ে যেত, বাতাসে ছড়িয়ে পড়ত উৎসবের গন্ধ। সেই কালিকিশো মাঠ – যে মাঠে হাঁসফাঁস করে উঠত গেরুয়া টিনের মঞ্চ, বাঁশের ফ্রেমে সাজানো চট, গামছা ঢাকা স্পিকার, আর আলো-ছায়ার এক মহাযাদু। আজ সেই মাঠে দাঁড়ালে মনে হয় যেন বাতাস পর্যন্ত অন্য ভাষায় কথা বলে – নীরবতার ভাষায়। যে মাঠে রাত জেগে যেত, আজ সেখানে আধুনিকতার ঠাণ্ডা আলো।মাঠের মাঝখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে কমিউনিটি হল – পাকা দেওয়াল, কংক্রিটের মেঝে, বাতাস ঠেকানো জানালা। উন্নয়নকে কে না চায়? কিন্তু প্রশ্ন হলো, উন্নয়ন কি সবসময় স্মৃতির জায়গা বুঝে হাঁটে? অনেক প্রবীণ লোকজন বলেন, ‘মাঠ তো থাকলো, কিন্তু মাঠ যে চলে গেল, তা কি বোঝেন? কালিকিশো মাঠ আর সেই মাঠ নেই, যেখানে শিশুরা দৌড়াদৌড়ি করত, যেখানে নারীরা শাড়ির আঁচল গুটিয়ে হাসতে হাসতে আসন ঠিক করতেন, যেখানে পুরুষেরা কাজের ক্লান্তি ভুলে একবেলা বুঁদ হয়ে থাকতেন সুতোর পুতুলের নাচে। পুতুল নাচ শুধু নাট্যরূপ ছিল না। ছিল পরিবারের আনন্দবৃত্ত। পুতুল নাচ দেখতে যাওয়া ছিল এক ধরনের পারিবারিক অনুষ্ঠান। যেখানে ঝগড়াঝাটি ভুলে সব পরিবার মিলেমিশে বসত। মাঠের কোণে ইট সাজিয়ে তার উপরে রাখা হ্যারিকেনের আলোয় ক্রমান্বয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠত মঞ্চ।গল্প চলত কখনও শ্যাম-লক্ষ্মীর বিবাহ, কখনও বা জননী গঙ্গার আহ্বান। আর সেই পুতুলগুলো! মুখে রঙ, চোখে কাচের টুকরো, ঠোঁটে পাতলা তুলি যেন জীবন্ত হয়ে উঠত শিল্পীর আঙুলের বদৌলতে। শিশুরা বিস্ময়ে চুপ হয়ে যেত। নারীরা গল্পের মোড়ে মোড়ে শ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকতেন। আর পুরুষেরা গম্ভীর মুখে চরিত্রগুলোর সংলাপ শুনতেন যেন তারা মাটির তৈরি পুতুল নয়, সত্যিকারের মানুষ। পরিবর্তনের স্রোতে ভেসে গেল সহজ আনন্দ, রইল কেবল স্মৃতি।সময়ের সাথে সাথে বদলে গেছে সব। মোবাইলের স্ক্রিনের আলো গ্রাস করেছে পুতুল নাচের মৃদু প্রদীপ; ইন্টারনেটের গল্প খেয়ে ফেলেছে মঞ্চের গল্প; শিশুরা এখন জানে কার্টুনের চরিত্র, কিন্তু জানে না কাঠের পুতুলের ঠোঁট নড়ানোর লুকোনো কৌশল।
শিল্পীরাও একে একে নেমে গেছেন মঞ্চ থেকে – কারো সংসারের চাপ, কারো জীবিকার তাগিদ ও কারো বয়সের ভার। পুতুলগুলো এখন হয়তো আগুনে পুড়ে গেছে, হয়তো কারো ঘরের মাচায় ঝুলে আছে, হয়তো কোনো ভাঙা বাক্সে ধুলো জমছে। কমিউনিটি হল- থাকল ভবন, হারাল উৎসব। যে কমিউনিটি হল দাঁড়িয়ে আছে এখন মাঠজুড়ে – তার চারপাশে হয়তো সরকারী অনুষ্ঠান হয়, বা মাঝে মাঝে সাংস্কৃতিক সভা। কিন্তু সেই সভায় নেই ঢোল-করতাল, নেই আলতার লাল আলো, নেই ছেলেমেয়েদের দৌড়াদৌড়ির শব্দ, নেই সেই গলা ফাটানো ঘোষণা – ‘পুতুল নাচ শুরু হইছে, সবাই সামনে আসেন!’ গ্রামবাসী হতাশ গলায় বলেন, হল তো হলো, কিন্তু হল দিয়ে কী হলো? যদি সেখানে দু-চারবার পুতুল নাচ হত, তাহলে না হয় পুরানো দিনের স্বাদ ফিরত। লোকশিল্প বাঁচাতে পারে নতুন প্রজন্মই। মজার বিষয় হলো, আজও যদি উদ্যোগ নেওয়া হয়, নতুন করে যদি ডাকা হয় পুরনো পুতুল নাচের দলগুলোকে, বা নতুন শিল্পীদের তৈরি করার আয়োজন করা হয়, তাহলে সম্ভব খুবই সম্ভব কাকড়াবনে পুরানো রাত্রির জাদু ফিরিয়ে আনা। কমিউনিটি হলের প্রতি বছরের নির্দিষ্ট কয়েকটি সন্ধ্যা পুতুল নাচের নামে উৎসর্গ করা হলে মাঠ-হলের পার্থক্য মুছে যেতে পারে। আর যদি স্কুল-কলেজের ছাত্রীরা শেখে, কীভাবে সুতোর টানে প্রাণ পায় পুতুল – তাহলে হয়তো আবার কোনো সন্ধ্যায় হঠাৎ মাঠের দিক থেকে ভেসে আসবে উৎসবের হাওয়া।কাকড়াবন অপেক্ষায় আছে। কোনো এক সন্ধ্যায় আবার যেন আলো জ্বলে ওঠে। কাকড়াবনের মানুষ এখনও ভুলে যায়নি। যারা শৈশবে পুতুল নাচ দেখেছে, তারা আজও সেইদিনের কথা বলতে গিয়ে চোখ ভিজিয়ে ফেলে। কিংবা হয়তো হাঁটার সময় পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে – কমিউনিটি হলের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে তাদের শৈশব। কাকড়াবন যেন নি:শব্দে বলছে, ‘আমাকে আবার ফিরিয়ে দাও আমার উৎসব।’ সেই পুতুল নাচ, যেটি নিছক শিল্প ছিল না – এটি ছিল গ্রামের হাসি, আনন্দ, মিলন আর ঐতিহ্যের নরম স্পর্শ। আর যদি কোনো ভোরে হঠাৎ কোনো শিল্পী পুরানো পুতুলগুলো মুছে নিয়ে প্রস্তুতি নেয়, তাহলে হয়তো আবার কোনো গোধুলিবেলায় কাকড়াবন শুনতে পাবে – পুতুলের নরম, সুরেলা টুংটাং শব্দ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *