“বিশ্ব তামাক বিরোধী দিবস” – তামাককে না বলুন, জীবনকে হ্যাঁ বলুন

ডাঃ সমীর রঞ্জন দত্ত চৌধুরী

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে ১৯৮৮ সাল থেকে প্রতি বছর ৩১শে মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া দাপ্তরিক নাম) বা বিশ্ব তামাক বিরোধী দিবস (সমার্থক ও সর্বাধিক জনপরিচিত নাম) পালিত হয়ে আসছে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো তামাক ব্যবহারের ক্ষতিকারক দিকগুলি সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা এবং বিশেষ করে শিশু, কিশোর ও তরুণ প্রজন্মকে তামাক কোম্পানিগুলির চটকদার, আকর্ষণীয় ও মিথ্যা প্রচারে প্রলোভিত করার কুটকৌশলের ফাঁদ থেকে রক্ষা করা। প্রথমেই তামাক নামক এই অভিশপ্ত সামগ্রীটি আমাদের দেশে কবে এসে কীভাবে আধিপত্য বিস্তার করল, এই নিয়ে খুব সংক্ষেপে আলোচনা করছি। আমেরিকার ইউটা অঙ্গরাজ্যে তামাকের ব্যবহারের নিদর্শন হিসেবে আজ থেকে ১২,৩০০ বছর আগে ব্যবহৃত হওয়া তামাকের পোড়া বীজ প্রত্নতাত্ত্বিকগণ খুঁজে পেয়েছেন। এছাড়া প্রাচীন মায়ান সভ্যতার সময়ে (প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী) মন্দিরগুলিতে ধূপ হিসেবে এবং ঔষধি কাজে তামাকের ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০০ অব্দে আমেরিকায় পরিকল্পিতভাবে তামাকের চাষ শুরু হয়। ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের (১৪৯২) পর ইউরোপে তামাক প্রবেশ করে এবং সেখানে তামাকের চাষ ও বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয়। ভারতে পর্তুগিজদের মাধ্যমে তামাকের চাষ ও ব্যবহার শুরু হয়। তবে মুঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে পর্তুগিজ ব্যবসায়ীরা তাঁর দরবারে তামাক নিয়ে আসেন এবং মুঘল সাম্রাজ্যের অভিজাত ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এর ব্যবহার ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, সম্রাট আকবরের পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গীর পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম শাসক, যিনি ১৬১৭ সালে ফরমান জারি করে মোগল সাম্রাজ্যের সর্বত্র তামাকের চাষ ও ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে তা ফলপ্রসূ না হওয়ার প্রধান কারণ ছিল তামাকের প্রতি তীব্র আসক্তি এবং এর ব্যাপক অর্থনৈতিক মুনাফা। উনি তামাকের নেশা উৎপাদনকারী ক্ষমতা এবং স্বাস্থ্যের উপর এর ক্ষতিকারক প্রভাব নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন।

এবারে বিশ্ব তামাক বিরোধী দিবস পালনের মূল আলোচনা পর্বে আসা যাক। বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৮২ লক্ষ লোক ধূমপান ও তামাক সেবনের ফলে মারা যায় এবং এক্ষেত্রে ভারতে এই মৃত্যুসংখ্যাটি ১০ লক্ষ ৪০ হাজারের কাছাকাছি। এছাড়াও পৃথিবীতে প্রতিবছর প্রায় ১২ লক্ষ এমন লোক মারা যায়, যারা ধূমপান কিংবা তামাক সেবন করে না, কিন্তু ধূমপায়ীদের ধূমপানকালে তাঁদের সংস্পর্শে আসে। এদেরকে বলা হয় পরোক্ষ ধূমপায়ী। এরা সিগারেট না খেয়েও ধূমপানরত অবস্থায় কোনও প্রত্যক্ষ ধূমপায়ীর ধোঁয়া সরাসরি গ্রহণ করে। এই ধোঁয়ার মধ্যে চার হাজারের বেশি বিষাক্ত উপাদান আছে এবং এর মধ্যে সত্তরটি উপাদান ক্যানসার সৃষ্টিকারী। প্রত্যক্ষ ধূমপায়ীদের ফুসফুস ধীরে ধীরে ধোঁয়ায় অভ্যস্ত হয়ে যায়। তবে প্রত্যক্ষ ধূমপায়ীদের (Active Smokers) শরীর বা ফুসফুস সিগারেটের ধোঁয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে বলে মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি হতে থাকে। কিন্তু পরোক্ষ ধূমপায়ীগণ, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা, হঠাৎ করে এই বিষাক্ত ধোঁয়ার সংস্পর্শে এসে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বিভিন্ন চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে যে, পরোক্ষ ধূমপানের কারণে ফুসফুসের ক্যানসার এবং অন্যান্য জটিল রোগের ঝুঁকি প্রায় ২০% থেকে ৩০% বা ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেশি বৃদ্ধি পায়। প্রসঙ্গত, মনে রাখতে হবে যে, ফিল্টারযুক্ত সিগারেট কোনওভাবেই নিরাপদ নয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিল্টারযুক্ত সিগারেট স্বাস্থ্যঝুঁকি কমায় না এবং এটি সম্পূর্ণ একটি বিপণন কৌশল বা প্রতারণা।

তামাকের ব্যবহার প্রধানত দুটি উপায়ে হয়ে থাকে। প্রথমত – ধোঁয়াযুক্ত তামাক এবং ধোঁয়াবিহীন তামাক। ধোঁয়াযুক্ত তামাকের মধ্যে পড়ে সিগারেট, বিড়ি, পাইপ, হুঁক্কা/হুঁকো ও সিগার, সিগারিলো, ই-সিগারেট (ভ্যাপ) এবং এই প্রক্রিয়ায় তামাক পুড়িয়ে ধোঁয়া সরাসরি ফুসফুসে নেওয়া হয়। ধোঁয়াবিহীন তামাকের মধ্যে আছে খৈনি, জর্দা (পানের সঙ্গে), গুটখা, গুল ও স্নাস (তামাক গুঁড়া, নুন ও সুগন্ধির মিশ্রণ) এবং নস্যি। এই পদ্ধতিতে তামাক পোড়ানো হয় না, বরং সরাসরি মুখ বা নাকের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ই-সিগারেট কম ক্ষতিকারক বলে বাজারে প্রচারিত হলেও বাস্তবে তা সাধারণ সিগারেটের মতোই সমান ক্ষতিকর এবং তেমনি হুঁকোর ধোঁয়া মোটেই জলে ফিল্টার হয়ে কম ক্ষতিকারক হয় না। গবেষণায় দেখা গেছে, এক ঘণ্টা হুঁক্কা খাওয়া ১০০টি সিগারেট খাওয়ার সমান ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তামাকের এই ব্যবহারগুলো অত্যন্ত আসক্তি সৃষ্টিকারী এবং ক্যানসার, হৃদরোগ ও ফুসফুসের নানা প্রাণঘাতী রোগের কারণ। তামাকের ব্যবহার আমাদের স্বাস্থ্যের উপর কী কী ধরনের মারাত্মক প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে আলোচনায় আসা যাক।

তামাকের মধ্যে লুকিয়ে আছে এমন একটি উপাদান, যা একযোগে নায়ক ও খলনায়ক উভয়ের দ্বৈত ভূমিকা পালন করে। উপাদানটির নাম হলো নিকোটিন, যা তামাকে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়।

কেন নিকোটিন ‘নায়ক’? (আসক্তির কারিগর)

আনন্দ ও তৃপ্তি: নিকোটিন মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক হরমোনের নিঃসরণ বাড়ায়, যা সাময়িকভাবে মানসিক চাপ কমায় এবং প্রশান্তি বা আনন্দের অনুভূতি দেয়। এছাড়া এটি সাময়িকভাবে স্মৃতিশক্তি ও একাগ্রতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, যার জন্য মানুষ বারবার তামাক গ্রহণে প্রলুব্ধ হয়, যদিও অনিবার্যভাবেই ক্রমে ক্রমে শরীরে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মারাত্মকভাবে দেখা দেয়।
কেন নিকোটিন খলনায়ক – এর কারণ হচ্ছে, নিকোটিন অত্যন্ত দ্রুত (ব্যবহারের দশ সেকেন্ডের মধ্যে) মস্তিষ্কে পৌঁছায় এবং হেরোইন বা কোকেনের মতো শক্তিশালী আসক্তি তৈরি করে এবং শারীরিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি রক্তচাপ বাড়ায়, হৃদস্পন্দন দ্রুত করে এবং রক্তনালী সংকুচিত করে, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

তামাক মূলত হৃৎপিণ্ড, লিভার ও ফুসফুসকে আক্রান্ত করে। ধূমপানের ফলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD – এমফাইসিমা ও ক্রনিক ব্রংকাইটিস-সহ) এবং ক্যান্সার (বিশেষত ফুসফুসের ক্যান্সার, প্যানক্রিয়াসের ক্যান্সার, ল্যারিংস ও মুখগহ্বরের ক্যান্সার)-এর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়। প্রসঙ্গত, শরীরের ক্যান্সারের প্রায় ৩৮ শতাংশ মুখে হয় এবং বিশ্বব্যাপী মুখের ক্যান্সারের (Oral Cancer) প্রায় ৮০% থেকে ৯০%-এর প্রধান কারণ হলো তামাকের ব্যবহার। এর মধ্যে ধূমপান এবং জর্দা, গুটখা, পানমশলা বা খৈনির মতো ধোঁয়াবিহীন তামাকের প্রত্যেকটি সমানভাবে ক্ষতিকর। তামাকের নিকোটিন রক্তনালীকে সংকুচিত করে উচ্চ রক্তচাপ ও প্রান্তীয় রক্তনালীর রোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে এর প্রভাব নির্ভর করে একজন ব্যক্তি দৈনিক কতটি ও কয় বছর ধরে ধূমপান করে, তার উপর। অল্পবয়স থেকে এবং অধিক তামাকের ঘনত্বসম্পন্ন সিগারেট খাওয়ার ফলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। পরিবেশ থেকে প্রাপ্ত তামাকজাত ধোঁয়া ও পরোক্ষ ধূমপানও সকল বয়সী ব্যক্তির ক্ষেত্রে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। গর্ভবতী নারীদের উপর তামাকের ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। ধূমপায়ী নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভপাত ঘটার হার বেশি। এছাড়া গর্ভস্থ ভ্রূণেরও অনেক ক্ষতি করে, যেমন অকালে শিশুর জন্ম হওয়া (Premature Birth), জন্মের সময় নবজাতকের ওজন আদর্শ ওজনের তুলনায় কম হওয়া (LBW) ও সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোম (SIDS)-এর হার ১.৪-৩% বেড়ে যায়।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, তামাক সেবনের ফলে একজন তামাক সেবনকারীর জীবনের দশ বছর আয়ু কমে যায় এবং জীবন সুখকর হয়ে ওঠে না। আমাদের দেশে তামাক সেবন একটি গুরুতর সমস্যার পর্যায়ে চলে গেছে। এখানে ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের ১৪.৬ শতাংশ, পুরুষদের ৪২ শতাংশ এবং মহিলাদের ১৪ শতাংশ তামাক সেবনকারী। প্রসঙ্গত, উত্তর-পূর্ব ভারতের মধ্যে মিজোরাম তামাক ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রথম স্থানে রয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ধূমপানের (সিগারেট বা বিড়ি) চেয়ে ধোঁয়াহীন তামাক বা চিবানো তামাকের (যেমন— গুটখা, খৈনি, জর্দা, পান মসলা) ব্যবহার অনেক বেশি প্রচলিত। গুটখা ও ধোঁয়াহীন তামাক ব্যবহারের ক্ষেত্রে ত্রিপুরা এবং মণিপুর ভারতের শীর্ষ রাজ্যগুলির অন্তর্ভুক্ত। তবে এই সংকট নিরসনে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার যৌথভাবে আইন প্রণয়ন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার কমানোর জন্য জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন কাজ করে চলেছে। যদিও প্রশ্ন উঠতে পারে যে, ভারত সরকার কেন তামাক চাষ ও এর ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে না। কিন্তু তা না পারার মূল কারণ হলো অর্থনৈতিক গুরুত্ব (বিপুল রাজস্ব আয় ও বিশ্বের প্রধান তামাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন), বিপুল কর্মসংস্থান এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতা–এই সবকিছু মিলিয়ে একটি জটিল সমীকরণ। একদিকে তামাকের কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বিপুল চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ থাকলেও, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি ও কোটি কোটি মানুষের জীবিকা এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

আজকের এই “বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস” বা ‘বিশ্ব তামাক বিরোধী দিবস’ যে নামেই এই দিনটিকে অভিহিত করি না কেন, এটা কেবল তামাকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর দিন নয়, বরং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তামাক সেবন বর্জনের একটি সম্মিলিত প্রতিজ্ঞা গ্রহণের দিন। এখানে অবশ্যই জানিয়ে রাখা প্রয়োজন যে, আমাদের রাজ্যে আগরতলা সরকারি ডেন্টাল কলেজ-সহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে তামাক পরিহার ক্লিনিক (Tobacco Cessation Clinic) আছে, যেখানে তামাকাসক্ত ব্যক্তিদের প্রমাণ-ভিত্তিক চিকিৎসা এবং মানসিক সহায়তার মাধ্যমে তামাকজাত দ্রব্য (যেমন: সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুল) ছাড়তে সাহায্য করা হয়। এগুলো সাধারণত কাউন্সেলিং এবং ওষুধের যৌথ প্রয়োগে কাজ করে। আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, শুধুমাত্র নিজে তামাক থেকে দূরে থাকাই যথেষ্ট নয়, বরং অন্যদেরকেও তামাক ছাড়তে উৎসাহিত করা এবং পরিবারের নারী ও শিশুদেরকে পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি থেকে রক্ষা করা আজকের এই অঙ্গীকারের মূল ভিত্তি। পাশাপাশি তামাক কোম্পানিগুলির বিভ্রান্তিকর ও প্রলোভনকারী প্রচার থেকে তরুণদেরকে মুক্ত রাখা এবং একটি তামাকমুক্ত সুস্থ সমাজ গড়ে তোলা এর অন্যতম উদ্দেশ্য। তাই আজকের এই বিশেষ দিনে চলুন আমরা সবাই তামাককে বলি – “না” আর জীবনকে বলি – “হ্যাঁ”। এভাবেই আমরা গড়ে তুলব একটি সচেতন, সুস্থ এবং তামাকমুক্ত সুন্দর পৃথিবী।

Sumit Chakraborty: