ত্বকের বার্ধক্য ধীর করতে কী করবেন? অ্যান্টি এজিং-এর চিকিৎসাবিজ্ঞান

ডা. প্রিথা দাস

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শরীরের মতো ত্বকেও পরিবর্তন আসে। চোখের কোণে সূক্ষ্ম রেখা, কপালে ভাঁজ, ত্বকের শুষ্কতা, উজ্জ্বলতা কমে যাওয়া কিংবা ত্বক কিছুটা ঢিলে হয়ে পড়া— এসবই স্বাভাবিক বার্ধক্য প্রক্রিয়ার অংশ।

তবে প্রশ্ন হল, ত্বকের এই বার্ধক্য কি পুরোপুরি থামানো সম্ভব?
উত্তর হল, না। বার্ধক্য একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া এবং তাকে পুরোপুরি থামানো সম্ভব নয়। কিন্তু সঠিক জীবনযাপন ও বৈজ্ঞানিক ত্বকের যত্নের মাধ্যমে ত্বকের অকাল বার্ধক্য অনেকটাই ধীর করা সম্ভব। Anti-ageing-এর অর্থ তাই ‘চিরযৌবন’ ধরে রাখা নয়; বরং ত্বককে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখা এবং অকাল ক্ষতি কমানো।

ত্বকের Ageing কেন হয়?
ত্বকের বার্ধক্যের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। একদিকে রয়েছে স্বাভাবিক বা অভ্যন্তরীণ বার্ধক্য। বয়স বাড়ার সঙ্গে ত্বকে কোলাজেন ও ইলাস্টিনের উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে। ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতাও কমতে থাকে। ফলে ত্বক পাতলা, শুষ্ক ও কম টানটান হতে পারে। অন্যদিকে রয়েছে বাহ্যিক কারণ। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি।
সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের কোলাজেন ও ইলাস্টিনের ক্ষতি করে। ফলে ত্বকে বলিরেখা, কালো দাগ, অসমান রং ও অন্যান্য পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে দ্রুত দেখা দিতে পারে। একে অনেক সময় ফটো এজিং বলা হয়। ধূমপান, অতিরিক্ত দূষণ, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, অপর্যাপ্ত ঘুম ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসও ত্বকের স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

Anti-ageing-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ: Sunscreen
ত্বকের অকাল বার্ধক্য প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাসগুলোর একটি হল নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার।
অনেকে মনে করেন শুধু গরমের দিনে বা সমুদ্রসৈকতে গেলেই সানস্ক্রিন দরকার। আসলে দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের ক্ষতি করতে পারে।
ত্বকের উপযোগী, পর্যাপ্ত সুরক্ষাযুক্ত সানস্ক্রিন ব্যবহার করা এবং বাইরে দীর্ঘক্ষণ থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনরায় লাগানো গুরুত্বপূর্ণ।
সানস্ক্রিন শুধু বলিরেখা কমানোর জন্য নয়; সূর্যের কারণে হওয়া পিগমেন্টেশন ও ত্বকের অন্যান্য ক্ষতি কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ।

Moisturizer কি সত্যিই দরকার?
বয়স বাড়ার সঙ্গে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতা কমতে পারে। ফলে ত্বক শুষ্ক ও খসখসে হয়ে যেতে পারে।
নিয়মিত উপযুক্ত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং ত্বকের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বা স্কিন ব্যারিয়ার ভালো রাখতে সহায়তা করে।
তৈলাক্ত ত্বক হলেও ময়েশ্চারাইজার একেবারে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ত্বকের ধরন অনুযায়ী হালকা ও উপযুক্ত ময়েশ্চারাইজার বেছে নেওয়া যেতে পারে।

Retinoid-এর ভূমিকা
Anti-ageing-এর ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত উপাদানগুলোর একটি হল রেটিনয়েড।
রেটিনয়েড ত্বকের কোষের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে এবং দীর্ঘমেয়াদে সূক্ষ্ম বলিরেখা ও ত্বকের গঠনে উন্নতি আনতে সাহায্য করতে পারে। ব্রণ ও ব্রণের পরের দাগের চিকিৎসাতেও কিছু রেটিনয়েড ব্যবহার করা হয়।
তবে রেটিনয়েড সবার জন্য একইভাবে উপযুক্ত নয়। শুরুতে ত্বকে শুষ্কতা, জ্বালা বা লালচে ভাব হতে পারে। তাই বিশেষ করে শক্তিশালী রেটিনয়েড নিজের ইচ্ছায় শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
গর্ভাবস্থায় কিছু রেটিনয়েড ব্যবহার করা যায় না। তাই গর্ভবতী বা গর্ভধারণের পরিকল্পনা থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা জরুরি।

Vitamin C কি ত্বকের জন্য উপকারী?
ভিটামিন সি একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা ত্বকের অক্সিডেটিভ ক্ষতি কমাতে সাহায্য করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ত্বকের অসমান রং ও সূর্যের কারণে হওয়া ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে ভিটামিন সি-যুক্ত ত্বকের প্রসাধনী ব্যবহার করা হয়।
তবে বেশি মাত্রায় বা ভুলভাবে ব্যবহার করলেই বেশি উপকার হবে— এমন নয়। সংবেদনশীল ত্বকে কিছু পণ্য জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে।
শুধু ক্রিম নয়, খাবারও গুরুত্বপূর্ণ
সুস্থ ত্বকের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন, শাকসবজি, ফল, বাদাম, বীজ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখা উচিত।
অতিরিক্ত চিনি ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে সুষম খাদ্য গ্রহণ করা ভালো।
পর্যাপ্ত পানি পান করাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু বেশি পানি খেলেই বলিরেখা চলে যাবে— এমন ধারণা ঠিক নয়।

ঘুম ও মানসিক চাপের গুরুত্ব
ঘুমের সময় শরীরের বিভিন্ন মেরামতির প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকে। দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ত্বকের স্বাভাবিক ভারসাম্য ও চেহারায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অতিরিক্ত মানসিক চাপও শরীরের বিভিন্ন হরমোন ও প্রদাহজনিত প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই Anti-ageing-এর অংশ হিসেবে পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ধূমপান ত্বকের বড় শত্রু
ধূমপান শুধু ফুসফুস ও হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি করে না, ত্বকেরও ক্ষতি করে। এটি ত্বকে রক্তপ্রবাহ কমাতে এবং কোলাজেনের ক্ষয় বাড়াতে পারে। ফলে ত্বকে অকাল বার্ধক্যের লক্ষণ দ্রুত দেখা দিতে পারে।
তাই ত্বককে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে ধূমপান সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দামি Anti-ageing Cream কি অপরিহার্য?
একেবারেই নয়।
Anti-ageing-এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিয়মিত ও বৈজ্ঞানিক ত্বকের যত্ন। প্রতিদিনের রুটিনে—
সানস্ক্রিন + ময়েশ্চারাইজার + ত্বকের উপযোগী পরিষ্কার করার উপাদান
এই মৌলিক বিষয়গুলো ঠিক রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এর পর প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে রেটিনয়েড, ভিটামিন সি বা অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করা যেতে পারে।
দামি পণ্য মানেই বেশি কার্যকর— এমন কোনো নিয়ম নেই।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
বয়সের সঙ্গে কিছু পরিবর্তন স্বাভাবিক হলেও হঠাৎ ত্বকের রং বা গঠন পরিবর্তিত হলে, অস্বাভাবিক দাগ দেখা দিলে, দীর্ঘদিনের ব্রণ বা পিগমেন্টেশন থাকলে অথবা কোনো প্রসাধনী ব্যবহারের পর ত্বকে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালা ও প্রদাহ হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
যারা রাসায়নিক খোসা ছাড়ানো, লেজার, বোটুলিনাম টক্সিন বা অন্যান্য সৌন্দর্যবর্ধক চিকিৎসা নিতে চান, তাদেরও অবশ্যই যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ভুল হাতে এসব চিকিৎসা করলে উপকারের বদলে ত্বকের ক্ষতি হতে পারে।

শেষ কথা
ত্বকের বার্ধক্য থামানো সম্ভব নয়, কিন্তু অকাল বার্ধক্য অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এর জন্য হাজার টাকার প্রসাধনীর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল নিয়মিত সানস্ক্রিন, ত্বকের উপযোগী ময়েশ্চারাইজার, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ধূমপান থেকে দূরে থাকা। Anti-ageing-এর আসল বিজ্ঞান হল— বয়সকে লুকিয়ে ফেলা নয়, বরং ত্বকের স্বাভাবিক স্বাস্থ্যকে দীর্ঘদিন ধরে রাখা।
তাই আজ থেকেই ত্বকের যত্ন শুরু করুন। কারণ ত্বকের সুস্থতার জন্য সবচেয়ে কার্যকর সময় হল— এখনই।
(লেখক এমবিবিএস, চিকিৎসক)

Sumit Chakraborty: