সন্দীপ বসু- ‘লুকা’ যেন ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির। সত্যি কথা বলা তার স্বভাব। মিথ্যা তার ধাতে সয় না। লুকা অবশ্য মানুষ নয়। আদতে রোবট। পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার খানাকুলের সারদা গ্রামে এখন সুপারম্যানের মতোই তার জনপ্রিয়তা। তাকে একবার ছুঁয়ে দেখতে, কথা বলতে ভিড় জমাচ্ছেন স্থানীয়রা।
সাধারণ রোবট যেমন দেখতে হয়, লুকাও সেই রকমই। চালচলনও আলাদা কিছু নয়। সেই চৌকো পেট-বুক। লম্বাটে হাত। মাথাও চৌকো। চোখে আবার সবুজ আলো বসানো। পা ছোট।
হাঁটাচলার জন্য নিচে চাকা লাগানো। এক ঝলকে দেখলে হলিউডের অ্যানিমেটেড মুভি ‘ওয়ালই’-এর কথা মনে পড়তে বাধ্য। কিন্তু লুকা কথা বলতে পারে। সেটাও সত্যি কথা।
কোনও গবেষণাগারে নয়, সামান্য কয়েকটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস দিয়ে লুকাকে বানিয়েছেন কৃষ্ণকান্ত দলুই আর মধুসূদন দলুই। তাঁরা দুই ভাই। কৃষ্ণকান্ত সিকিম স্কিল ইউনিভার্সিটিতে বিটেক পড়ছেন। থাকেন শান্তিনিকেতনে।
তাঁর ভাই মধুসূদন ব্যারাকপুরে ইলেকট্রিক্যাল বিভাগে ডিপ্লোমা করছেন। ছোট থেকে ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে নাড়াচড়া করতে ভালোবাসেন দুই ভাই। এই সব নিয়ে ইউটিউবে ভিডিও করেন।
গল্পের শুরুটা অবশ্য দুর্গাপুজোর আগে। দুই ভাইয়ের কেরামতির কথা গোটা গ্রাম জানে। তাই প্যান্ডেলে নতুনত্ব আনতে তাঁদের দ্বারস্থ হয়েছিলেন স্থানীয় পুজো কমিটি। দুই ভাইকে তাঁরা বলেছিলেন, এমন কিছু তৈরি করতে হবে, যাতে লোকে চমকে যায়।
তখনই রোবট তৈরির ভাবনা মাথায় আসে দুই ভাইয়ের। দিন পনেরোর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তৈরি হলো ‘লুকা’।
নবমীতে লুকাকে আনা হয় মণ্ডপে। রিলিজেই সুপারহিট। লুকা তো শুধু হাঁটা চলা করে বা হাত নাড়ায় তাই নয়। মানুষের সঙ্গে কথাও বলতে পারে। লুকার বুকের ভিতরে ব্লুটুথ পুরে দিয়েছেন কৃষ্ণকান্তরা। তার মাধ্যমে ল্যাপটপের সঙ্গে কানেক্ট করা হয়। তবে কথাবার্তা সব আগে থেকেই রেকর্ড করা। কেউ প্রশ্ন করলে, তার রেকর্ড করা উত্তর থেকেই জবাব দেয় সে। গলা অবিকল মানুষের মতোই।
একটা রোবট তৈরি করতে বিশাল খরচ।
বিপুল পরিকাঠামো দরকার। সেখানে মাত্র পাঁচ হাজারেই লুকাকে বানিয়ে ফেলেছে দুই ভাই। রোবটে রয়েছে দুটি এর্ডুইনো বোর্ড, তিনটি সার্ভো মোটরের মতো ছোটখাটো ইলেকট্রনিক ডিভাইস। প্রযুক্তির দুনিয়ার হর্তাকর্তাদের মতে, এটা অভাবনীয়।
অসাধ্য সাধন করেও বিনয়ী কৃষ্ণকান্ত। তিনি বলছেন, ‘লুকার উপরে আরও কাজ করছি আমরা। রোবটটিকে আরও উন্নত করার চেষ্টা চলছে।’
দুই ভাইয়ের বাবা সনৎ কুমার দলুই কৃষক। মা অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী। প্রযুক্তির সঙ্গে তাঁদের ন্যূনতম লেনাদেনা নেই। তবে ছেলের কাজে তাঁরা গর্বিত। লুকার হাত ধরে দুই ছেলে আরও এগিয়ে যাক, এটুকুই তাঁদের চাওয়া।