বিরোধী দলনেতা নির্বাচন থেকে CID তদন্ত: তৃণমূলকে ঘিরে নতুন সংকট!!

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকারকে পরাজিত করে এই প্রথম বিজেপি
সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।২৯৪ আসনের বিধাসভায় বিজেপি এককভাবে জয়ী হয়েছে ২০৮টি আসনে। ৮০টি আসনে জয়ী হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। বাকি ৬টি আসনে জয়ী হয়েছে অন্য বিরোধীরা। এই ফলাফলে স্বাভাবিকভাবেই বঙ্গ বিধানসভায় প্রধান বিরোধী দলে বসার কথা তৃণমূল কংগ্রেসের। কিন্তু ৮০ আসনে জয়লাভ করার পরও, তৃণমূল কংগ্রেস বিধানসভায় প্রধান বিরোধী দলের স্বীকৃতি পাবে কিনা? সেটাই এখন প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। বঙ্গ নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর এমনিতেই চরম বিপাকে মমতার দল। পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে, আগামীদিনে বঙ্গ রাজনীতিতে তৃণমূল নামক দলের কোনও অস্তিত্ব থাকবে কিনা? এনিয়েই এখন জোর চর্চা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। শুধু তাই নয়, এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে মমতার তৃণমূল দলকে আরও সমস্যায় ফেলে দিয়েছে বিধানসভায় বিধায়কের স্বাক্ষর জালিয়াতি কাণ্ড। ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই তৃণমূলের এই জালিয়াতি নিয়ে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণের মধ্যেও ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। অনেকেই এনিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, “এখানেও জালিয়াতি!” বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা বাছাই ঘিরে কার্যত নজিরবিহীন বিপাকে তৃণমূল। আর এর জেরে সোমবার দলবিরোধী কাজের অভিযোগ এনে তৃণমূল দল থেকে বহিষ্কার করা হলো দলের দুই বিধায়ককে। এরা হলেন বিধায়ক সন্দীপন সাহা এবং বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত দুই বিধায়ককে ইমেল এবং হোয়াটসঅ্যাপ মারফত জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। একইসাথে তৃণমূলের এই সিদ্ধান্তের কথা বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুকেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রথমত, এই দুই বিধায়ককে দল থেকে বহিষ্কারের পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো, বিরোধী দলনেতা বাছাই নিয়ে বিধায়কদের সই জাল করার বিষয়টি উল্লেখ করে এরাই স্পিকারের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। আর এই অভিযোগের ভিত্তিতেই বিধানসভার সচিব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে হেয়ার স্ট্রিট থানায় এফআইআর দাখিল করেন। জানা গেছে, আরও তিনজন বিধায়ক ভিডিও কলে স্পিকারের কাছে সই জাল করা নিয়ে অভিযোগ করেছেন। আর এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে শুরু হয় সিআইডি তদন্ত। নির্দেশ পেয়েই সিআইডি সিট গঠন করে তদন্ত শুরু করেছে। ইতিমধ্যে সিআইডি তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জিকে ভবানী ভবনে তলব করেছে। এনিয়ে এখন বঙ্গ রাজনীতি নতুন করে সরগরম হয়ে উঠেছে। গত ক’দিন ধরে গুঞ্জন চললেও, বিধানসভার সই জাল কাণ্ডের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি সোমবার দুপুরে নবান্ন থেকে সাংবাদিক সম্মেলন করে জানান, তৃণমূলের দুই বিধায়ক (সন্দীপন, ঋতব্রত) স্পিকারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বিষয়টি তার নজরে আসার পরই তিনি সিআইডিকে তদন্তে যুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। একইসাথে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর বিষয়। দুর্নীতি প্রমাণিত হলে কাউকেই ছাড়া হবে না। কেননা, গণতন্ত্রের জন্যও এটি মারাত্মক। শুভেন্দুর সাংবাদিক সম্মেলনের পরই দুই বিধায়ককে দল থেকে বহিষ্কার করে তৃণমূল।

খবরে প্রকাশ, গত ৪ মে ভোটের ফল প্রকাশের পর ৬ মে বিধায়কদের নিয়ে কালীঘাটে তৃণমূলনেত্রী বৈঠক করেন। তাতে বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করা হয়। ওইদিন যারা উপস্থিত ছিলেন, তারা সকলে হাত তুলে শোভনদেবকে সমর্থন জানান। কিন্তু বিধানসভায় এই সংক্রান্ত যে প্রস্তাবনা জমা দিতে হয়, তা দেয়নি তৃণমূল। এরপর ১৩ এবং ১৪ মে বিধানসভায় তৃণমূল বিধায়কদের শপথগ্রহণ হয়। শপথের পর নিয়ম মেনে সই করেন বিধায়করা। নিয়ম অনুযায়ী বিরোধী দল হিসেবে তৃণমূলের কাছ থেকে বিরোধী দলনেতার নাম নিয়ে প্রস্তাবপত্র চান বিধানসভার সচিব। তা জমা দিতে ১৯ মে ফের কালীঘাটের বৈঠক ডাকা হয় বিধায়কদের। ওইদিন কেউ ছিলেন, কেউ ছিলেন না। উপস্থিত সকলের সই নেওয়া হয় দলের তরফে। মিলিয়ে দেখা হয় ক’জন গরহাজির। পরে দলের প্রস্তাবিত বিরোধী দলনেতার নামে সমর্থন জানিয়ে ৭০ জনের সই করা একটি কাগজ জমা দেওয়া হয় বিধানসভায়। তৃণমূলের তরফে জানানো হয়, ওটাই বিরোধী দলনেতার প্রস্তাবনাপত্র। আর এখানেই গরমিল শুরু। এই চিঠি পাঠিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি। অভিযোগ, ওই প্রস্তাবনাপত্রে অনেক বিধায়ক স্বাক্ষরই করেননি। অথচ তাদের নাম লেখা রয়েছে। অভিযোগ পেয়ে বিধানসভার সচিব দেখেন, ওই প্রস্তাবনাপত্রে অনেক বিধায়কের নাম লেখা বড় অক্ষরে, কারও আবার নামে আদ্যক্ষর সই করা। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনায় পুরো নাম সই করার কথা। তা নেই দেখে সন্দেহ হয় সচিবের। যাচাই করার জন্য তিনি গত ১৩ ও ১৪ মে তৃণমূল বিধায়কদের শপথের দিন হাজিরা খাতায় সই করা পাতাগুলির ফটোকপি করে নেন। এরপর ওই প্রস্তাবনাপত্রের স্বাক্ষরের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখেন। তাতে অন্তত ২০ জনের স্বাক্ষর মেলেনি বলে খবর। তাতেই সই জালের অভিযোগে থানায় এফআইআর করেন বিধানসভার সচিব। এখন তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে, বিধানসভায় জমা দেওয়া প্রস্তাবনায় সই করেননি বিধায়করা তাহলে অনেকেরই বিপদে পড়তে হবে। বিরোধী দলের মর্যাদা ধরে রাখতে ৩০ জন বিধায়ক দরকার। প্রস্তাবনায় ৭০ জনের সই আছে। তাদের মধ্যে কতজন নিজেরা সই করেননি, তদন্ত শেষের পরই তা প্রমাণিত হবে। কিন্তু এমন নজিরবিহীন জালিয়াতি কাণ্ড সম্ভবত ভারতবর্ষে প্রথম। ফলে বঙ্গ রাজনীতিতে আগামীদিনে কী কী ঘটতে চলেছে, তা সময়ই বলবে।

Dainik Digital: