রাজনীতিতে পরাজয় অনেক দলই দেখে।কিন্তু সব পরাজয় সমান নয়। কিছু পরাজয় কেবল ভোটের ফলাফলে সীমাবদ্ধ থাকে, আবার কিছু পরাজয় দলের ভিতরকার জমাট অসন্তোষ, নেতৃত্বের প্রতি ক্ষোভ এবং ক্ষমতার অন্দরের দ্বন্দ্বকে এক ঝটকায় প্রকাশ্যে এনে দেয়। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেস আজ ঠিক সেই দ্বিতীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি। দলটি জন্মলগ্ন থেকে বহু সংকট দেখেছে। কখনো কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার চাপ, কখনো দলত্যাগের স্রোত, কখনো বিজেপির উত্থান। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির বিশেষত্ব অন্যত্র। কারণ, এই প্রথম তৃণমূলের অন্দরে এমন এক গোষ্ঠী প্রকাশ্যে মাথা তুলেছে, যারা সরাসরি দলের সাংগঠনিক কর্তৃত্বকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। আর সেই বিদ্রোহের মুখ হয়ে উঠেছেন একেবারে নবাগত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রশ্নটা এখানেই। একনাথ শিন্ডে যখন শিবসেনা ভেঙেছিলেন, তখন তিনি ছিলেন দলের অন্যতম শক্তিশালী সাংগঠনিক মুখ। অজিত পাওয়ার যখন এনসিপির ভিত কাঁপিয়ে দেন, তখন তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়? তিনি না তৃণমূলের পুরনো সৈনিক, না সর্বভারতীয় পরিচিত কোন জননেতা। বরং সিপিএমের খরচের খাতায় চলে যাওয়া এক হারানো ব্যক্তি ছিলেন ঋতব্রত। তা হলে কীভাবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ৬০ জন বিধায়ককে এক ছাতার তলায় আনতে পারলেন তিনি? যতই এর পেছনে মহারাষ্ট্র মডেল খুঁজে দেখার চেষ্টা হোক না কেন, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে নির্বাচনি ফলাফলের পর তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা বৈঠকে ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে মাত্র ২০ জনের উপস্থিতি ছিল নিছক সাংগঠনিক ব্যর্থতা নয়; সেটি ছিল এক রাজনৈতিক বার্তা। পরাজয়ের পর দলের প্রথম প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও অধিকাংশ বিধায়ক ও সাংসদের অনুপস্থিতি সেই বার্তাকেই আরও স্পষ্ট করে দেয়। দলের ভিতরে ক্ষোভ ছিল, অসন্তোষ ছিল, কিন্তু এতদিন তা প্রকাশ্যে আসেনি। নির্বাচনি বিপর্যয় সেই বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। এই বিদ্রোহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘সই জাল’ বিতর্ক। বিরোধী দলনেতা নির্বাচন সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবে বহু বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে- এই অভিযোগ সামনে এনে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা কার্যত বিস্ফোরণ ঘটান।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, অভিযোগ জানানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁদের বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু বহিষ্কার বিদ্রোহ দমন করেনি; বরং বিদ্রোহকে বৈধতা দিয়েছে।এর পর যা ঘটেছে, তা তৃণমূলের ইতিহাসে নজিরবিহীন। বিদ্রোহী গোষ্ঠী স্পিকারের কাছে ৬০ জন বিধায়কের সমর্থনপত্র জমা দিয়ে ৪ ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা করার দাবি জানায়। অর্থাৎ, লড়াই আর গোপন নেই। তা প্রকাশ্য ক্ষমতার সংঘর্ষে পরিণত হয়েছে।
তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল, বিদ্রোহীরা এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চ্যালেঞ্জ করছেন না। তাঁরা দাবি করছেন, তাঁদের লড়াই নেত্রীর বিরুদ্ধে নয়; বরং নেত্রীর চারপাশে তৈরি হওয়া একটি ক্ষমতাকেন্দ্রের বিরুদ্ধে। আর এখানেই রাজনীতির আসল নাটক। রাজনৈতিক মহলের একটি বড় অংশ মনে করছে, এই অসন্তোষের প্রকৃত লক্ষ্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে গড়ে ওঠা নেতৃত্বের বলয়। দীর্ঘদিন ধরেই দলের অনেক প্রবীণ নেতা এবং বিধায়কদের মধ্যে অভিযোগ ছিল, সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে চলে যাচ্ছে। নির্বাচনি বিপর্যয়ের পরে সেই ক্ষোভ আর চাপা থাকেনি। মহারাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করা হলেও বাংলার পরিস্থিতি মৌলিক ভাবে ভিন্ন। শিবসেনা বা এনসিপির বিদ্রোহ ছিল আদর্শগত ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রশ্নে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের ফল। কিন্তু তৃণমূলে আদর্শের প্রশ্ন প্রায় অনুপস্থিত। এখানে সংঘাতের কেন্দ্র ক্ষমতা, নেতৃত্ব এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ। ফলে এটিকে অনেক বিশ্লেষক বিদ্রোহ নয়, ‘অভ্যুত্থান’ বলতেই বেশি স্বচ্ছন্দ। আর এখানেই এসে দাঁড়ায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী করবেন? তাঁর সামনে এখন দুটি পথ।
প্রথমত, তিনি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে বর্তমান ক্ষমতার কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখতে পারেন।কিন্তু সেই পথে হাঁটলে দল ভাঙনের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, তিনি বিদ্রোহীদের অভিযোগ এবং ক্ষোভকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন সমঝোতার রাস্তা খুঁজতে পারেন। কিন্তু সেই পথ বেছে নিলে দলের বর্তমান ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে বাধ্য। তৃণমূল কংগ্রেসের ইতিহাসে বহুবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। বিরোধিতার ঝড় সামলে ক্ষমতায় এসেছেন, বারবার রাজনৈতিক মৃত্যুঘণ্টার ভবিষ্যদ্বাণীকে ভুল প্রমাণ করেছেন। কিন্তু এবারের চ্যালেঞ্জ আলাদা। কারণ, এই যুদ্ধ বিজেপির বিরুদ্ধে নয়, সিপিএমের বিরুদ্ধে নয়, দিল্লির বিরুদ্ধে নয়- এই যুদ্ধ নিজের ঘরের ভিতরে। আর ইতিহাস বলছে, বাইরের শত্রুকে পরাজিত করা যতটা সহজ, নিজের ঘরের বিদ্রোহ সামলানো তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। সেই কারণেই ঋতব্রতদের এই বিদ্রোহ কেবল তৃণমূলের সাংগঠনিক সংকট নয়; এটি আগামী কয়েক বছরের বাংলা রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। এখন নজর একটাই- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি এই বয়েসে পারবেন সংকটমোচক হয়ে উঠে দাঁড়াতে? নাকি তৃণমূলের ইতিহাস নতুন খাতে প্রবাহিত হবে, অথবা অন্য মোড়কে পুরো দলটাই গায়েব হয়ে যাবে!