দক্ষিণাকালী মা-য়ের রূপের প্রকাশ ও কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ

রুপক কর্মকার

‘কাল’ মানে ‘সময়’ বা ‘মৃত্যু’, আর ‘কালী’ হলেন যিনি সময়কে নিয়ন্ত্রণ করেন। তন্ত্রমতে দেবী কালী হলেন দশমহাবিদ্যার প্রথম দেবী বা আদিশক্তি। তবে এই তন্ত্রসাধনার ইতিহাস বেশ প্রাচীন এবং সুপ্রসিদ্ধ। পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে তন্ত্রসাধনার বেশ কিছু পীঠস্থান রয়েছে। এই পীঠস্থানগুলোর মধ্যে নবদ্বীপের বিশেষ খ্যাতি আছে। তবে এই তন্ত্রসাধনা যে সব সময় সুখকর হবে তা নাও হতে পারে। শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই নবদ্বীপের তন্ত্রসাধনা সাধারণ মানুষের কাছে বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছিল, কারণগুলো ছিল তান্ত্রিকদের বিকৃত ও উগ্র আদবকায়দা এবং সাধারণ মানুষের উপর তাদের নানাবিধ অত্যাচার।
তন্ত্রসাধনার নামে ধর্মীয় আচারের প্রকাশ্য তামসিকতা সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছিল। তবে এই অবস্থার নিরসনের জন্য সাধকশ্রেষ্ঠ ও পণ্ডিতপ্রবর কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ শুদ্ধাচারে তন্ত্রসাধনা প্রতিষ্ঠা করা এবং ঘরে ঘরে শক্তি আরাধনা প্রবর্তন করার জন্য কৃতসংকল্প হলেন। বাংলা তথা নবদ্বীপের সুপণ্ডিত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ সপ্তদশ শতকের গোড়ার দিকে জন্মগ্রহণ করেন। বিভিন্ন তথ্য বলছে তিনি ১৬০০ থেকে ১৬১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল কৃষ্ণানন্দ ভট্টাচার্য। কথিত আছে তন্ত্রসাধনার আগম পদ্ধতিতে সিদ্ধিলাভ করে তিনি আগমবাগীশ উপাধি পান। পরবর্তীতে তিনি বাংলার কালীসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ নামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। কৃষ্ণানন্দ মহাশয় তাঁর সাধনলব্ধ ঐশ্বরিক শক্তির দ্বারা দৈবাদেশ পান এবং সেই মতো তিনি মা কালীর শান্ত রূপ কল্পনা করেন। সেই রূপ পরবর্তীকালে ‘দক্ষিণাকালী’ নামে খ্যাতি লাভ করে। তবে এই দক্ষিণাকালীর প্রাপ্ত রূপের পেছনে বেশ কিছু অলৌকিক ঘটনা লুকিয়ে আছে। তার মধ্যে একটি পৌরাণিক কথন বেশ চর্চিত, তা হল, কালীসাধক কৃষ্ণানন্দ বেশ কিছুদিন ধরে মায়ের সাধনা করতে থাকেন যে কোনও রূপে পেলে তাঁকে ঘরে ঘরে প্রতিষ্ঠা করা যায়। ভক্তের এই আকুতি মা ফেলতে পারলেন না, মা তাঁকে স্বপ্নাদেশ দিলেন, “মহানিশার অবসানে প্রাতঃ মুহূর্তে কৃষ্ণানন্দ প্রথম যে নারী মূর্তি দর্শন করবেন সেই মূর্তি হবে মায়ের প্রতিষ্ঠা মূর্তি।” পরের দিন সকালে কৃষ্ণানন্দ গঙ্গাস্নানে বেরিয়ে দেখলেন এক দরিদ্র বধূ গাছের গুঁড়ির ওপর একমনে ঘুঁটে দিচ্ছে।
নিম্নবর্গীয় কন্যা, কালো গায়ের রং, বসন এলোমেলো, কনুই দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে গিয়ে সিঁদুর কিছুটা কপালে লেপটে গেছে। এহেন অবস্থায় পরপুরুষ কৃষ্ণানন্দকে দেখে লজ্জায় জিভ কাটলেন সেই গৃহবধূ। সেখান থেকেই শুরু মা-য়ের কল্পিত রূপ এবং গঙ্গামাটি দিয়ে মায়ের সেই মূর্তি গড়া। তখন থেকেই দক্ষিণাকালীর মূর্তি তৈরি বলে ধরে নেওয়া হয়। কৃষ্ণানন্দ দীপান্বিতা অমাবস্যার একই দিনে ছোট আকারের কালীমূর্তি নির্মাণ করে রাতে পূজা-অর্চনা শেষে ভোরে বিসর্জন দিতেন, এই কারণে লোকে বলত ‘আগমবাগীশ কাণ্ড’। তবে এখন তা ‘আগমেশ্বরী মাতা’ নামে সুপ্রসিদ্ধ। তন্ত্রশাস্ত্রে কৃষ্ণানন্দ এতটাই সুপণ্ডিত ছিলেন যে ১৭০টি গ্রন্থের নির্যাস থেকে বিখ্যাত ‘তন্ত্রসার’ গ্রন্থটি রচনা করেন, যা দেশ-বিদেশে বিশেষ সমাদৃত হয়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে তন্ত্রসার ছিল সবচেয়ে মার্জিত তন্ত্রগ্রন্থ। তবে দক্ষিণাকালী রূপে ‘মাতা আগমেশ্বরী’ এখনও পূজিত হন নবদ্বীপে। তবে পণ্ডিত কৃষ্ণানন্দতেই শেষ হয়নি, দক্ষিণাকালীর আরাধনা। পণ্ডিত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের প্রায় দেড়শ বছর পরেও রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় সাড়ম্বরে এই কালীপূজা পালন করেন।
কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ যে তন্ত্রসাধনা এবং কালীপূজার পথ দেখিয়েছিলেন, নদিয়ার রাজপরিবার ও রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তার দ্বারা ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হন। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় বিখ্যাত পদাবলীকার রামপ্রসাদ সেন এবং অন্নদামঙ্গল কাব্যের রচয়িতা ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর উপস্থিত ছিলেন। রামপ্রসাদের কালীনাম ও শ্যামাসংগীত রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল। যা বাংলার কালীপূজার ভাবাবেগ ও ভিতকে আরও সুদৃঢ় করতে সাহায্য করে। এছাড়াও নবাব আলীবর্দী খাঁ ও পরবর্তীকালে মীর কাসেমের আমলে রাজস্ব দিতে না পারার কারণে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অপরদিকে চরম আর্থিক সংকট, এই দুইয়ের চাপে দেবীশক্তির প্রতি সে আরও বেশি অনুগত হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে সেইসব সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার ফলে মা কালী ও জগদ্ধাত্রী মায়ের প্রতি নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন।
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নদিয়া জেলা শুধু নয়, বাংলায় সামগ্রিকভাবে কার্তিক অমাবস্যায় দীপান্বিতা কালীপূজা এক সামাজিক ও বৃহৎ উৎসবের আকার ধারণ করে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের অনুকরণে বিত্তশালী জমিদাররা ব্যাপকভাবে কালীপূজার পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করেন। যার ফলে আরও জাঁকজমকপূর্ণ এবং বিস্তৃত উদ্‌যাপনের প্রচলন ঘটে। শান্তিপুরে প্রায় সাড়ে পাঁচশ বছরের প্রাচীন ‘মহিষখাগী কালীপূজা’র সঙ্গে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নাম জড়িয়ে আছে। কথিত আছে তিনি নিজে এখানে এসে মেষ বলি দিয়েছিলেন। এছাড়াও রানাঘাটের কষ্টিপাথরের প্রাচীন সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরটি রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আমলেই বিশেষ পরিচিতি লাভ করে।

Sumit Chakraborty: