সুজয় গুহ (পর্ব-১)
গত কয়েক বছরে ভারতবর্ষে একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনার খবর সামনে আসছে—অভিভাবক মোবাইল কেড়ে নেওয়ায় শিশু বা কিশোরের আত্মহত্যার চেষ্টা, চরম আগ্রাসী আচরণ, এমনকি পরিবারে শারীরিক হিংসা। প্রথমে ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন বলে মনে হলেও, গভীরে তাকালে বুঝতে অসুবিধা হয় না, এর পিছনে রয়েছে মোবাইল আসক্তি।
কোভিড-পরবর্তী সময়ে অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল বিনোদন আর সোশ্যাল মিডিয়া শিশুদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারে। ৮–১৪ বছর বয়সী শিশুরা দিনে গড়ে ৫–৭ ঘণ্টা স্ক্রিনে কাটাচ্ছে—যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের বহু গুণ বেশি। এই অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম ধীরে ধীরে তৈরি করছে ডোপামিন নির্ভরতা, যা নেশার মতোই বিপজ্জনক।
সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মোবাইল কেড়ে নেওয়া বা সময় বেঁধে দেওয়াকে শিশু “শাস্তি” বা “ভালোবাসা কেড়ে নেওয়া” হিসেবে দেখছে। ফলস্বরূপ জন্ম নিচ্ছে তীব্র রাগ, হতাশা ও আত্মবিনাশী প্রবণতা। অনেক অভিভাবকই বুঝতে পারছেন না—এটা শুধু জেদ নয়, এটি এক ধরনের মানসিক নির্ভরতা।
মনোবিদরা বলছেন, দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ব্যবহারে শিশুদের মনোযোগ কমে যাচ্ছে, সহনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে, বাস্তব জীবনের সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে, আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ভেঙে পড়ছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—এই পরিবর্তনগুলো অনেক সময় চুপচাপ ঘটে। বাইরে থেকে শিশুটি স্বাভাবিক মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে সে একাকিত্ব ও উদ্বেগে ভুগতে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—দোষটা কি শুধু শিশুর? নাকি আমরা, বড়রাই অজান্তে এই আসক্তির পথ তৈরি করে দিয়েছি?
বিশ্বজুড়ে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে মোবাইল আসক্তিকে আজ আর সাধারণ অভ্যাস বলা হচ্ছে না। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের প্রখ্যাত মনোবিদ ও নিউরোসায়েন্টিস্ট ড. আন্না লেম্বকে (Dr. Anna Lembke)—যিনি Dopamine Nation বইয়ের লেখক—সরাসরি একে “ডিজিটাল ড্রাগ” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, সোশ্যাল মিডিয়া ও গেমিং অ্যাপগুলি ঠিক মাদকের মতোই মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ ঘটায়, যা ধীরে ধীরে নির্ভরতা তৈরি করে।
ভারতেও এই প্রবণতা ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা ও বিভিন্ন রাজ্যে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিতে দেখা গেছে—অভিভাবক মোবাইল কেড়ে নেওয়ায় শিশু আত্মঘাতী আচরণ করেছে বা চরম হিংস্র হয়ে উঠেছে। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি গভীর মানসিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০১৯ সালেই Gaming Disorder-কে মানসিক রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. ভিক্টোরিয়া ডানকেল (Dr. Victoria Dunckley)—যিনি দীর্ঘদিন স্ক্রিন টাইম ও শিশুদের মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা করেছেন—বলছেন, “অতিরিক্ত স্ক্রিন এক্সপোজার শিশুদের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে দুর্বল করে দেয়, ফলে তারা রাগ, হতাশা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়।”
আজকের শিশুরা বাস্তব জগতের আনন্দের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতের তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। এর ফল—মনোযোগের অভাব, নিদ্রাহীনতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং আত্মমূল্যবোধের অবক্ষয়।
বেশিরভাগ অভিভাবকের অভিযোগ—“আমার ছেলে/মেয়ে কথা শোনে না”, “মোবাইল ছাড়া কিছু বোঝে না।” কিন্তু মার্কিন শিশু মনোবিদ ড. ড্যানিয়েল সিগেল (Dr. Daniel J. Siegel)—The Whole-Brain Child বইয়ের লেখক—বলছেন,
“শিশুর আচরণ বুঝতে হলে আগে তার মস্তিষ্কের বিকাশ বুঝতে হবে।” তিনি সহজভাবে বুঝিয়েছেন,
কিশোর বয়সে আবেগের অংশটি (Amygdala) অত্যন্ত সক্রিয় থাকে, কিন্তু যুক্তিবোধের অংশ (Prefrontal Cortex) তখনও সম্পূর্ণ গড়ে ওঠে না। ফলে হঠাৎ মোবাইল কেড়ে নেওয়া শিশুর কাছে মনে হয়—তার স্বাধীনতা, পরিচয় এবং নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
অপরদিকে, যুক্তরাজ্যের শিশু মনোবিদ ড. তান্য বাইরন (Dr. Tanya Byron) বহু বছর ধরে ডিজিটাল শিশু মনোবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর মতে, “অভিভাবকের কড়া নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং আবেগগত সংযোগের অভাবই মোবাইল আসক্তির মূল কারণ।”