কলকাতা, ১৮ মে- প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং নারী নির্যাতনের তদন্তে এবার বড় পদক্ষেপ রাজ্য সরকারের। সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানালেন, এই সমস্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখতে রাজ্য সরকারের তরফে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে। প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, নারী নির্যাতন সংক্রান্ত নবগঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ কমিশনের চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সমাপ্তি চট্টোপাধ্যায়কে। পাশাপাশি, এই কমিশনের মেম্বার সেক্রেটারি বা সদস্য সচিব হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে রাজ্য পুলিশের অত্যন্ত দক্ষ ও আইপিএস অফিসার দময়ন্তী সেনকে। ২০১২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি, রাতের পার্ক স্ট্রিটে নাইটক্লাব থেকে বেরিয়ে চলন্ত গাড়িতে গণধর্ষণের শিকার হন সুজেট জর্ডন। সেই মামলার তদন্ত করেন দময়ন্তী সেন। দুঁদে আধিকারিক হওয়া সত্ত্বেও তারপর থেকে আর সেভাবে কোনও বড়সড় মামলার তদন্তভার পাননি তিনি। মমতা সরকারের আমলে খানিকটা ‘কোণঠাসা’ই ছিলেন। সেই দময়ন্তী সেনকেই ফেরালেন শুভেন্দু অধিকারী। আবার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখতে গঠিত কমিশনের নেতৃত্ব দেবেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু। এই কমিশনের সদস্যসচিব করা হয়েছে রাজ্যের সিনিয়র আইপিএস কে জয়রামনকে। তিনি বর্তমানে এডিজি (উত্তরবঙ্গ) পদে রয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই দু’টি তদন্ত কমিশনই আগামী ১ জুন থেকে কাজ শুরু করে দেবে।
গত সোমবার রাজ্য মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠক হয়েছিল। ওই বৈঠক শেষেই মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, দ্বিতীয় বৈঠকে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং নারী নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে আলোচনা হবে। সেই মতোই আজ এই নতুন কমিশন তৈরি করল রাজ্য সরকার। আজ মন্ত্রীসভার বৈঠকে বকেয়া মহার্ঘভাতা বা ডিএ নিয়ে আলোচনা হবে বলেই আশা করেছিলেন সরকারি কর্মচারীদের বড় অংশ। কিন্তু মন্ত্রীসভার বৈঠকের পরে রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানান, আজকের এই বৈঠকে ডিএ নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি। তার আশ্বাস, ধাপে ধাপে সব কিছু নিয়েই আলোচনা হবে। সোমবার যে বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা হয়নি, পরের বৈঠকগুলিতে তা নিয়ে অবশ্যই আলোচনা হবে। তবে সরকারি কর্মীদের বেতন পরিকাঠামো সংশোধন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। সপ্তম বেতন কমিশন গঠনে সবুজসঙ্কেত দিয়েছে নতুন মন্ত্রীসভা।
প্রথম মন্ত্রীসভার বৈঠকের মতোই দ্বিতীয় বৈঠকেও একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তিতে যে প্রকল্পগুলি চালু ছিল, তা আগামী মাস থেকে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে অগ্নিমিত্রা জানান, তথ্য-সংস্কৃতি দফতর, সংখ্যালঘু বিষয়ক দফতর এবং মাদ্রাসা শিক্ষা দফতরের অধীনে এই ধরনের যে প্রকল্পগুলি ছিল, সেগুলিকে আগামী মাস থেকে বন্ধ হয়ে যাবে। তবে কী পুরোহিত এবং মোয়াজ্জেমদের যে ভাতা দিত পূর্বতন সরকার তা কী বন্ধ হয়ে যাবে, সেই প্রশ্নও উঠেছে। অগ্নিমিত্রা জানান, এই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করে বিস্তারিত জানিয়ে দেওয়া হবে। তবে বৃত্তিমূলক কোনও কর্মসূচি বন্ধ হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
অন্নপূর্ণা ভান্ডার নিয়েও এদিন সরকারের সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন অগ্নিমিত্রা। সোমবার ওই প্রকল্পে নীতিগত অনুমোদন দেয় শুভেন্দুর মন্ত্রিসভা। বৈঠক শেষে অগ্নিমিত্রা আশ্বস্ত করেন, ‘যাঁরা লক্ষ্মীর ভান্ডার পেতেন, তাঁদের নাম অন্নপূর্ণা ভান্ডার প্রকল্পে ‘ট্রান্সফার’ হয়ে যাবে। সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার হবে। যারা এত দিন (লক্ষ্মীর ভান্ডার) পাননি, তারাও আবেদন করতে পারবেন। শীঘ্রই এই সংক্রান্ত পোর্টাল খোলা হবে।’ তিনি আরও জানান, যারা নাগরিকত্বের জন্য সিএএ-র মাধ্যমে আবেদন করেছেন বা ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন, তারাও অন্নপূর্ণা ভান্ডার পাবেন। আগামী ১ জুন থেকে রাজ্যে সরকারি বাসে যাতায়াতের জন্য মহিলাদের কোনও ভাড়া দিতে হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল নতুন সরকার। সেই প্রকল্পেও সোমবার নীতিগত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। স্বল্পদূরত্বের বাসযাত্রা হোক বা দূরপাল্লার বাসে সফর— উভয় ক্ষেত্রেই সরকারি গণপরিবহণে কোনও ভাড়া দিতে হবে না মহিলা যাত্রীদের। রাজ্য সরকারের নতুন বাজেট পেশের পরবর্তী সময়ে কিছু বৈদ্যুতিক বাস কেনা হবে বলে জানিয়েছেন অগ্নিমিত্রা।
রাজ্যের পূর্বতন সরকারের আমলে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি (ওবিসি) শংসাপত্র ঘিরে নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছিল। সেই জটিলতা দূর করতে ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিয়েছে আদালত। মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, এই বিষয়ে আদালতের নির্দেশ মোতাবেক পদক্ষেপ করবে রাজ্য সরকার। রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা আশ্বস্ত করেন, সম্পত্তি কর এতদিন যা ছিল, তা-ই থাকবে। এতে কোনও পরিবর্তন হবে না বলে রাজ্যবাসীকে আশ্বস্ত করেন তিনি। এ বার থেকে পনেরো দিন পর পর রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠক হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।