২৬০ বছর ধরে বিসর্জন হয়নি দুর্গামূর্তির, আজও কাশীতে পূজিত হয় সেই প্রতিমা

সন্দীপ বসু- সাল ১৭৬৭। দুর্গাপুজোর দশমীর দিন। ঘামে ভিজে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন ১৫ জন বলিষ্ঠ গোয়ালা। কিন্তু তা সত্ত্বেও একচুল নাড়াতে পারেনি কাশীর মদনপুরার মুখোপাধ্যায় পরিবারের বাড়ির দুর্গাপ্রতিমাটি। দড়ি দিয়ে টেনেও ছয় ফুটের একচালা মাটির প্রতিমাকে সরানো যায়নি কোনওভাবেই।
কথিত রয়েছে, সেদিন রাতে পরিবারের কর্তা কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নে আবির্ভূত হয়েছিলেন মা দুর্গা। জানিয়েছিলেন, তিনি কাশীবাসীর সঙ্গে চিরকাল থাকতে চান। দেবীর সেই স্বপ্নাদেশ মাথা পেতে মেনে নেয় মুখোপাধ্যায় পরিবার।
বিষয়টিকে প্রাচ্য মহাবিদ্যার অধ্যক্ষ ড. জয়ন্ত কুশারী ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বললেন, “এ যেন ‘শিবের ঘরে এসে আমি সুখেই আছি। এখান থেকে আমাকে সরাস না। আমাকে সারা জীবন এই কাশীতেই কাশীবাসীর সঙ্গে থাকতে দে।” সেই থেকে শিবের আপন ঘর কাশীতে ২৬০ বছর ঘরণীর দায়িত্ব সামলে চলেছেন দুর্গা। যেখানে আবাহন হয়, বোধন হয়, সন্ধিপুজো হয়, বিজয়া দশমীর সিঁদুরখেলা হয়, ঘট বিসর্জন হয়। কিন্তু, প্রতিমার নিরঞ্জন নেই।
তার থেকেও অবিশ্বাস্য ঘটনাটি হল; পারিবারিক প্রথা মেনে ২৬০ বছর ধরে একই একচালার মূর্তিতে পুজো চলে আসছে। কারণ, শিবের কাশী ছেড়ে স্বপ্নাদেশে খোদ দুর্গার কৈলাসে যাওয়াতে আপত্তি। আর তাই প্রায় ২৬০ বছর ধরে একই মাটির দুর্গাপ্রতিমার পুজো হয়ে আসছে কাশীর পুরোনো দুর্গাবাটিতে।
খড়, বাঁশ, পাটের দড়ি ও মাটি দিয়ে তৈরি সেই একচালা প্রতিমার সঙ্গে রয়েছেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশও। প্রতি বছর নতুন প্রতিমা তৈরি বা বিসর্জন দেওয়ার পরিবর্তে একই প্রতিমাকে সারা বছর ধরে যত্ন ও পুজো করা হয় এখানে। বিষয়টি নিয়ে বহুবার ভারতে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষকরা এসে মূর্তিটির চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে একদল গবেষক প্রাচীন দুর্গামূর্তিটি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে জানিয়েছিলেন, বাঁশ, খড় আর মাটির মূর্তিতে এখনও এতটুকুও ঘুণ বা পচন ধরেনি।
মুখোপাধ্যায় পরিবারের শিকড় পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার জনাই রোডে। পারিবারিক বিবাদের জেরে সম্পত্তি হারানোর পর কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায় পরিবার নিয়ে চলে আসেন কাশীতে। সেই সময় থেকেই বাংলার দুর্গাপুজোর ঐতিহ্যও জায়গা করে নেয় কাশীর বুকে।
১৭৬৭ সালে বাংলার কারিগররাই নির্মাণ করেছিলেন ছয় ফুটের একচালা প্রতিমাটি। নৌকায় করে সেটি পৌঁছেছিল বেনারসে। প্রতিমাটির মুখাবয়বও দেখবার মতো, দেবী এখানে তুলনামূলকভাবে তরুণী রূপে দেখা দেন ভক্তকে। সে বছর দশমীর দিন সিঁদুরখেলা শেষ হওয়ার পর প্রতিমাকে বিসর্জনের জন্য নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়। কিন্তু যতবারই প্রতিমা তোলার চেষ্টা করা হয়, তা ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বলিষ্ঠ গোয়ালাদের ডেকে আনা হয়। দড়ি বেঁধে বহু মানুষ মিলে টানলেও প্রতিমা নড়েনি। শোনা যায়, এরপরেই স্বপ্নাদেশ পান বাড়ির কর্তা।
পুরোনো দুর্গাবাটির পুজোর আরেকটি বিশেষত্ব হল এখানকার ভোগ। এখানে সারা বছর প্রতিদিন মাকে নিবেদন করা হয় ভেজানো ছোলা ও গুড়। দুর্গাপুজোর ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত ফল, ভেজানো মটর, মুগ ডাল-সহ নানা নিবেদন থাকে। পঞ্চমীতে তৈরি হয় নারকেল নাড়ু। একসময় ১৫১টি নারকেল দিয়ে নাড়ু তৈরি হলেও এখন ব্যবহার করা হয় ৫১টি নারকেল।
আজ কাশীর বাঙালি টোলার পুরোনো দুর্গাবাটি বহু ভক্তেরও আবেগের জায়গা। প্রতিদিন প্রায় আধঘণ্টার আরতি হয়, আর দুর্গাপুজোর সময় তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪৫ মিনিটে।
এখানে বড় কোনও প্যান্ডেল নেই, নেই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। বিশ্বাস-ঐতিহ্যে ভর করে আজও পুজোর সময় দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন।

Sumit Chakraborty: