কলকাতা, ২০ জুলাই- একুশে জুলাইয়ের সমাবেশ নিয়ে বাংলায় যখন রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে সেইসময়েই সোমবার বিধানসভায় একুশে জুলাই নিয়ে তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এতদিন ধামাচাপা পড়ে থাকা রিপোর্ট থেকে যে সমস্ত তথ্য বেরিয়ে এল, নিঃসন্দেহে তা যথেষ্ট বিস্ফোরক।
রিপোর্টের বয়ান অনুযায়ী, ‘তদন্ত সাপেক্ষে কমিশন মনে করছে, ২১ জুলাই মহাকরণ অভিযানে গুলি চালানো ছিল অপ্রয়োজনীয়, অযৌক্তিক ও উসকানিবিহীন। পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর যথার্থতা প্রমাণ হয়নি। মণীশ গুপ্তের নির্দেশেই গুলি যেখানে গুলি চলেছিল, তা রাইটার্স বিল্ডিং থেকে অনেকটা দূরে। রাইটার্স বিল্ডিংয়ে বিক্ষোভ আছড়ে পড়তে পারে, তা সম্পূর্ণ কাল্পনিক আশঙ্কা। মেয়ো রোড, রেড রোড, ডোরিনা ক্রসিং – যেখানে যেখানে গুলি চলেছিল, তা পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয়।’ একুশে জুলাই নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৈরি চ্যাটার্জি কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনবেন বলে বিধানসভায় ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, ‘১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই কী হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এখনও ঠিকমতো জানে না। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তদন্ত কমিশন তৈরি করলেও তার রিপোর্ট কখনও প্রকাশ্যে আনেননি।আমি এই রিপোর্ট পড়ে শোনাচ্ছি। কারণ, বিধানসভা চলাকালীন আমি অন্য কোথাও এই রিপোর্ট প্রকাশ করতে পারতাম না। সেদিনের ঘটনায় পুলিশ কমিশনারের রিপোর্ট, আধিকারিকদের রিপোর্টের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যে তদন্ত কমিশন তৈরি হয়েছিল, সেখানে আজ যিনি নিজেকে সবচেয়ে বড় আন্দোলনকারী বলেন, তৎকালীন কংগ্রেস যুবনেত্রী, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই কখনও তদন্তের জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। হয়ত বারণ করা ছিল।’
রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে যে, এই ঘটনায় যে ৪৪ জনকে সাক্ষী হিসেবে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্তও। বাংলায় ক্ষমতায় আসার পরে যে মণীশকে মন্ত্রীও করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। শুভেন্দু অভিযোগ তোলেন, মণীশ গুপ্ত ফেঁসে যাওয়ার ভয়েই সেই সময়ের একটি নথিও দেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিধানসভায় আজ রিপোর্ট তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মণীশ গুপ্তের নির্দেশই গুলি চলেছিল। পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর যথার্থতা প্রমাণিত হয়নি।’ ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই। বাংলার ক্ষমতায় বামেরা। তৎকালীন যুবকংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সচিত্র পরিচয়পত্রের দাবিতে মহাকরণ অভিযানকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছিল তিলোত্তমা।তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্তর নির্দেশে গুলি চলেছিল বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে। তাতে ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মী নিহত হন। ২০১১ সালে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেই একুশে জুলাইয়ের সেই ঘটনার যথাযথ তদন্তের জন্য বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তদন্ত কমিশন গঠন করেন মমতা। তারপর পেরিয়েছে ১৫ বছর। রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসেনি। যে মণীশ গুপ্তর নির্দেশে গুলি চলেছিল সেই মণীশকে মন্ত্রীসভায় জায়গা দেওয়াকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস এবং তৃণমূলেরও একাংশের মধ্যে ক্ষোভ ছিল।
তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পেশ করে শুভেন্দু অধিকারী জানান, সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য মোট ৪৪ জনকে তলব করা হয়েছিল। তার মধ্যে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য-সহ পুলিশের একাধিক কর্তা ছিলেন। কিন্তু যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটনার মূল সাক্ষী হওয়ার কথা, তাঁকেই নাকি ডাকেনি কমিশন। রিপোর্ট পড়ে শুভেন্দু অধিকারী জানান, সেদিন উসকানি ছাড়াই গুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছিল। মণীশ গুপ্তের নির্দেশেই চলে গুলি। তবে তাকে কে নির্দেশ দিয়েছিল তা জানা যায়নি। রিপোর্ট অনুযায়ী যেখানে গুলি চলেছিল, তা রাইটার্স বিল্ডিং থেকে অনেকটা দূরে। রাইটার্স বিল্ডিংয়ে বিক্ষোভ আছড়ে পড়তে পারে, তা সম্পূর্ণ কাল্পনিক আশঙ্কা। মেয়ো রোড, রেড রোড, ডোরিনা ক্রসিং-যেখানে যেখানে গুলি চলেছিল, তা পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম না-করে তিনি অভিযোগ করেন, ‘আগামী কাল ২১ জুলাই। এই দিনটাকে ব্যবহার করে অনেকে অনেক কিছু করে নিয়ে গিয়েছেন। শুধু রাজনৈতিক পদ বা সরকারি ক্ষমতা নয়, ব্যক্তিগত বিষয় সম্পত্তি, আমেরিকায় গিয়ে চোখের চিকিৎসা, চার্টার্ড ফ্লাইটে ঘোরা, হরিশ চ্যাটার্জি ও হরিশ মুখার্জি স্ট্রিটে ৩৮টা প্লটের মালিক হওয়া, অসংখ্য প্রাসাদের মতো বাড়ি তৈরি করা— অনেক অনেক কিছু করে নিয়ে গিয়েছেন। তৎকালীন ঘটনায় কমিশন রিপোর্ট জমা দেওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘ দিন তা বিধানসভার টেবিলে এনে সাধারণ মানুষের সামনে সত্য তুলে ধরা হয়নি।’ কমিশনের সুপারিশের কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী প্রাক্তন তৃণমূল সরকারের সমালোচনায় মুখর হন। তিনি বলেন, ‘কমিশন নিহত ১২ জন শহিদের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু তৃণমূল সরকার নিহতদের মাত্র ২ লক্ষ এবং আহতদের মাত্র ১৫ হাজার টাকা দিয়ে ‘প্রতারণা’ করেছে।’ তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি চাইলে এই ঘটনার বিরুদ্ধে নতুন করে এফআইআর দায়ের করার সুযোগ বর্তমান সরকার দেবে। পাশাপাশি, কমিশনের সুপারিশ মেনে নিহতদের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে প্রদান করা হবে।
এর পাশাপাশি সরকারি কাজে এবার থেকে বাংলাকে বাধ্যতামূলক করা হবে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।