সম্পর্কের সেই সূক্ষ্ম মুহূর্তগুলো… এক এবং দুই

এই লেখায় তুলে ধরা হয়েছে সম্পর্কের সেই সূক্ষ্ম মুহূর্তগুলো, যেখানে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং প্রয়োজন বোঝাপড়া, মন দিয়ে শোনা আর পারস্পরিক বিশ্বাস।

পরিবার ও বন্ধুত্ব—দু’টি সম্পর্কই ভালোবাসার জায়গা থেকে তৈরি হলেও, বর্তমান সময়ে সেখানে সবচেয়ে বেশি ঢুকে পড়ছে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা। সন্তানের প্রতি অতিরিক্ত যত্ন যেমন ধীরে ধীরে তার আত্মবিশ্বাস কেড়ে নিতে পারে, তেমনই বন্ধুত্বে না বলা কষ্ট আর তুলনার চাপ দূরত্ব তৈরি করে। এই লেখায় তুলে ধরা হয়েছে সম্পর্কের সেই সূক্ষ্ম মুহূর্তগুলো, যেখানে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং প্রয়োজন বোঝাপড়া, মন দিয়ে শোনা আর পারস্পরিক বিশ্বাস। এই বিষয়ে আলোকপাত করেছেন কলকাতার স্বনামধন্য প্যারেন্টাল কনসালটেন্ট পায়েল ঘোষ এবং ‘মনোসিজ, অ্যা মেন্টাল হেলথ ইউনিট অব টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপ’-এর সিনিয়র ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট দেবদীপ রায় চৌধুরি। লিখছেন আনন্দিতা সরকার

(এক…)

বাবা-মায়ের ভয় কীভাবে সন্তানের জীবনের উপর প্রভাব ফেলে?
প্রায় সব অভিভাবকের মনেই কিছু সাধারণ ভয় কাজ করে— রাস্তায় বিপদ হবে না তো? পরীক্ষার ফল প্রত্যাশা মতো হবে তো? বন্ধুমহল ঠিক থাকবে তো? শরীর খারাপ করবে না তো। বেশিরভাগ সময়েই এই ভয়গুলো নিয়ে বাবা-মায়ের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা হয় সন্তানের সামনেই। শিশুরা সরাসরি এই কথাগুলোর অর্থ না বুঝলেও অবচেতনে এগুলো গ্রহণ করে। ধীরে ধীরে তাদের মনে এমন এক বিশ্বাস তৈরি হয়— ‘আমি একা কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারি না, সব কিছুর জন্যই আমাকে বাবা-মায়ের উপর নির্ভর করতে হবে।’

এই নির্ভরতা কি বড় বয়সেও থেকে যায়?
হ্যাঁ, অনেক ক্ষেত্রেই থেকে যায়। ছোটো বয়সে এই নির্ভরতা স্বাভাবিক হলেও, সমস্যা শুরু হয় যখন প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও সন্তান সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। উচ্চশিক্ষা, কর্মজীবন, এমনকী বিবাহিত জীবনেও কোথায় থাকবে, কী করবে, কী সিদ্ধান্ত নেবে— এসব বিষয়ে বাবা-মায়ের অনুমোদনের উপর অতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে সন্তান। এই নিয়ন্ত্রণ একদিনে তৈরি হয় না; এটি বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠে।

অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কি সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে?
বাস্তবে তা করে না। বরং সন্তানকে মানসিকভাবে দুর্বল করে তোলে। প্রতিটি শিশুর মধ্যেই ধীরে ধীরে পরিণত হওয়ার ক্ষমতা তৈরি হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা, সমস্যা মোকাবিলার সাহস এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে তখনই, যখন তাকে ছোটো ছোটো সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া হয় এবং ভুল করার সুযোগ দেওয়া হয়। অতিরিক্ত প্রোটেকটিভ পরিবেশে বড় হওয়া সন্তানরা বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলে কীভাবে সামলাবে, সেই মানসিক প্রস্তুতিটাই পায় না।

বাবা-মায়ের নিরাপত্তাহীনতা সন্তানের আত্মবিশ্বাসের বিকাশে কতটা প্রভাব ফেলে?
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তান দৈনন্দিন জীবনের খুব সাধারণ সিদ্ধান্তগুলোও নিজে নিতে পারে না— কী খাবে, কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলবে বা কোনও পরিস্থিতিতে কী প্রতিক্রিয়া জানাবে, এসব ক্ষেত্রেও সে অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ছোটোখাটো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও তার মধ্যে দ্বিধা ও ভয় কাজ করে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই সন্তানই, যার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা ভেবেই অনিচ্ছাকৃতভাবে তার উপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল।

বাবা-মা কীভাবে এই নিরাপত্তাহীনতা কাটিয়ে উঠতে পারেন?
এর জন্য প্রয়োজন ধাপে ধাপে মানসিক পরিবর্তন। ছোটো বয়স থেকেই সন্তানকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা জরুরি। যেমন— নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে বন্ধুর জন্য উপহার বেছে নিতে দেওয়া, টিফিনে কী খাবে বা বাজার থেকে কী আনবে— এই ধরনের ছোটো ছোটো দায়িত্ব তাকে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে। একইভাবে, পড়াশোনায় যে বিষয়ে সে দক্ষ, সেখানে তাকে নিজে চেষ্টা করতে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। শুরুর দিকে ভুল হবেই, কিন্তু সেই ভুলের মধ্যে দিয়েই শেখার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয় এবং ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। এই পথে বাবা-মায়ের ভূমিকা হওয়া উচিত সহায়ক ও দিশানির্দেশকের— নিয়ন্ত্রকের নয়।

সন্তানকে স্বাধীন মানুষ করে গড়ে তুলতে বাবা-মায়ের মানসিক বদল কতটা জরুরি?
এটি অত্যন্ত জরুরি। পেরেন্টিং জীবনের একমাত্র ভূমিকা নয়। দাম্পত্য, পেশাগত জীবন, ব্যক্তিগত আগ্রহ— জীবনে সব কিছুরই সমান গুরুত্ব রয়েছে। সন্তানের প্রতি অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা এবং সারাক্ষণ নজরদারি অনেক সময় বাবা-মায়ের নিজের মধ্যেই নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে, যার প্রভাব পড়ে সন্তানের উপর।

সন্তানের বিয়ের পর বাবা-মায়ের নিরাপত্তাহীনতা কেন বাড়ে?
এর পেছনে আবেগ ও বাস্তবতার মিশ্রণ থাকে। আর্থিক নির্ভরতার ভয়, সন্তানের সঙ্গে আগের ঘনিষ্ঠতা হারানোর আশঙ্কা। বাবা-মায়ের অনেক সময় মনে হয়, ‘আমার মতো করে কি আমার সন্তানকে কেউ আগলে রাখবে?’— এই ভাবনা, এই অনুভূতিগুলো মানবিক, তবে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের স্বাধীন জীবন মেনে নেওয়াই সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি।

বিবাহিত সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত?
নিজের নিজের জগৎ থাকবে, বিপদে পাশে দাঁড়ানো, আনন্দ ভাগ করে নেওয়া সবই থাকবে— এই ভারসাম্যই স্বাস্থ্যকর সম্পর্কের মূল চাবিকাঠি।


সন্তান বড় হয়ে গেলে বা বিয়ে হলে বাবা-মা কীভাবে নিজের জীবনে নতুন অর্থ ও উদ্দীপনা খুঁজে পেতে পারেন?
এই সময়টিকে আসলে আনন্দের সময় হিসেবেই দেখা উচিত। সন্তান সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে পারা মানেই বাবা-মায়ের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের স্বীকৃতি। তাই এই পর্যায়ে এসে শুধুমাত্র শূন্যতার দিকে না তাকিয়ে, জীবনের ইতিবাচক দিকগুলোকে উপভোগ করাই বেশি প্রয়োজন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর-স্বাস্থ্যের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা, দৈনন্দিন হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম— এই অভ্যাসগুলো বাবা-মাকে দীর্ঘদিন স্বনির্ভর থাকতে সাহায্য করে। নিজের সুস্থতার দিকে সচেতন না হলে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয়ভাবে সন্তানের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়, যা মানসিক অস্বস্তির কারণও হতে পারে। এই সময়টাই পুরোনো শখগুলোকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার সবচেয়ে ভালো সুযোগ। সংসার ও সন্তান প্রতিপালনের ব্যস্ততায় যে সব ইচ্ছেগুলো একসময় হারিয়ে গিয়েছিল যেমন—গান, ছবি আঁকা, পড়াশোনা, লেখালেখি কিংবা সামাজিক কাজ— সেগুলোর দিকে আবার মন দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে এই পর্যায়ে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে নিজেদের সম্পর্ককে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সন্তান বড় করার দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে অনেক দম্পতিই নিজেদের মধ্যে যে ‘কোয়ালিটি টাইম’ কাটাতে পারেননি, এখন সেটার জন্য সময় বের করা সম্ভব। একসঙ্গে সময় কাটানো, ছোটো ভ্রমণ বা নিয়মিত আড্ডা— এই সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে।
অনেক বাবা-মায়েরই কম বয়সে ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছা থাকলেও সন্তান লালন-পালনের কারণে তা পূরণ করা হয়ে ওঠেনি। শরীর ভালো থাকলে এই সময়ে নিজের মতো করে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা যেতেই পারে। একা যেতে অনিশ্চয়তা থাকলে, বর্তমানে বিভিন্ন ভ্রমণদল বা সিনিয়র গ্রুপের সঙ্গে যাওয়ার সুযোগও রয়েছে। এছাড়া পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, রি-ইউনিয়নের আয়োজন করা কিংবা নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ— এগুলোও মানসিকভাবে প্রাণবন্ত থাকতে সাহায্য করে। সন্তান বড় হয়ে গেলে বা বিয়ে হয়ে গেলে বাবা-মায়ের জীবনে বার্ধক্য নেমে আসে— এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। বরং এই সময়টাই জীবনকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার, নিজের জন্য বাঁচার এবং বহুদিনের অপূর্ণ ইচ্ছেগুলোকে পূরণ করার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কীভাবে ইনসিকিউরিটি কমাতে সাহায্য করতে পারে?
আজকের দিনে শুধু পাঠ্যশিক্ষা যথেষ্ট নয়। ভ্যালু-বেসড এডুকেশন এবং পার্সোনাল মেন্টরিং অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষার্থীদের আচরণ বা মানসিকতায় কোনও অস্বস্তি লক্ষ্য করলে তাদের সঙ্গে কথা বলা, বোঝার চেষ্টা করা— এগুলোও শিক্ষকের দায়িত্বের অংশ হওয়া উচিত।

ইনসিকিউরিটি কমাতে শিক্ষার্থীদের জন্য কী ধরনের বাস্তব ও কার্যকর পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে?
দূর ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত ভাবনা থেকেই অনেক সময় ইনসিকিউরিটি তৈরি হয়। এর থেকে বেরতে—
ছোটো ছোটো লক্ষ্য স্থির করুন, প্রতিদিন যতটুকু সম্ভব কাজ করুন, নিজের ছোটো সাফল্যের জন্য নিজেকেই বাহবা দিন। এই ছোটো অর্জনগুলোই ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে।

(দুই…)

অতিরিক্ত ভাবা এবং মানসিক প্রভাব—
যারা অহেতুক বেশি ভাবেন, তাদের ক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় over-interpretation বা over thinking driven insecurity

উদাহরণ:

  • একটু দেরিতে ফোন ধরলে মনে হতে পারে, ‘আমি মানুষের কাছে গুরুত্ব হারিয়েছি?’
  • কাছের বন্ধু ব্যস্ত থাকলে, অন্যজন অনায়াসে ধরে নেয়, ‘নিশ্চয়ই ও আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে।’

সন্তানের বড় হওয়া: অভিভাবকদের মনের নিরাপত্তাহীনতা
যখন সন্তান বড় হতে শুরু করে, তখন অভিভাবকদের মধ্যে ছোটো ছোটো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। অনেক সময় তারা নিজেকে প্রশ্ন করতে শুরু করেন— ‘হয়তো আমি ভালো অভিভাবক নই।’ ঘটনা ছোটো মনে হলেও মানসিকভাবে তা অনেক বড় হয়ে দাঁড়ায়। এই ক্ষুদ্র পরিবর্তনগুলোও কখনও অভিভাবকের মধ্যে উদ্বেগ, নিরাপত্তাহীনতা এবং অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এ ধরনের মানুষ সাধারণত:

  • আবেগের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল—
    ছোটো ঘটনাও তাদের গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
  • সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেন— পরিবার বা সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্কের প্রতিটি মুহূর্তকে তারা গুরুত্বের সঙ্গে বোঝেন।
  • নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস ঠিক মতো শেখেননি— ফলে ছোটো সংকেতও বড় উদ্বেগের জন্ম দিতে পারে।
    ফলস্বরূপ, সম্পর্কের মধ্যে যে কোনও পরিবর্তন তাদের মনে নিরাপত্তার সংকট তৈরি করে।

বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্কের নিরাপত্তাহীনতা

  • ‘আমার সন্তান কি আমাকে আগের মতো ভালোবাসে?’
  • ‘আমি কি ওর জীবনে অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাচ্ছি?’—
    এই ভাবনা থেকে জন্মায় অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ, নিয়ন্ত্রণ বা অভিমান। তবে বাস্তবে, সন্তান বড় হওয়া মানে ভালোবাসা কমে যাওয়া নয়— শুধু প্রকাশের ধরন বদলানো।

সন্তানদের দৃষ্টিকোণ:

  • ‘আমি কি বাবা-মাকে হতাশ করছি?’
  • ‘আমার ভালোবাসা কি শর্তসাপেক্ষ?’
    এই ভয় থেকে সন্তানরা নিজেদের গুটিয়ে নিতে পারে।

বন্ধুত্বে নিরাপত্তাহীনতা
বন্ধুত্বে নিরাপত্তাহীনতা অনেক সময় নীরব থাকে। কেউ সরাসরি জানায় না, কিন্তু মনে মনে জমিয়ে রাখে

  • ‘আমি কি ওদের দ্বিতীয় পছন্দ?’
  • ‘ওরা কি আমাকে ছাড়া আরও ভালো থাকে?’
    ফলাফলে আসে তুলনা, দূরত্ব, এবং অপ্রয়োজনীয় মানসিক কষ্ট।

নিজেকে নিরাপত্তাহীনতার কবল থেকে রক্ষা করার কিছু দৃষ্টিভঙ্গি :

১. সব অনুভূতি সত্য, কিন্তু সব চিন্তা সত্য নয় :
খারাপ লাগা মানে সব সময় কিছু ভুল হয়েছে— এমন নয়।

২. নিজেকে প্রশ্ন করতে শিখুন :

  • এই ভাবনার পক্ষে প্রমাণ কী?
  • আমি কি নিশ্চিত, না কি অনুমান করছি?

৩. সম্পর্কের দায়িত্ব ভাগ করুন :
একজন মানুষ একাই সম্পর্কের ভার বইতে পারবে না।

৪. নীরবতা মানেই প্রত্যাখ্যান নয় :
মানুষের ব্যস্ততা, ক্লান্তি বা নিজস্ব জগৎ থাকতে পারে।

৫. নিজের আবেগ একমাত্র সম্পর্কের মাধ্যমে সামলাবেন না :
নিজস্ব আত্ম-মূল্যবোধ না থাকলে সম্পর্ক চাপের হয়ে ওঠে।

৬. নিরাপত্তাহীনতা কমানোর কৌশল :
নিরাপত্তাহীনতা পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না, তবে তার প্রভাব কমানো সম্ভব।

৭. নিজের মধ্যে ‘মানসিক সীমানা’ তৈরি করুন :
সব অনুভূতি সঙ্গে সঙ্গে অন্যের ঘাড়ে চাপানো দরকার নেই। প্রশ্ন করুন— এটা আমার ভয়, নাকি সত্যিই অপরপক্ষের আচরণ?

৮. সম্পর্কের বাইরে নিজের মূল্যবোধ গড়ে তুলুন :
যদি আত্মসম্মান সম্পূর্ণভাবে সঙ্গীর প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে, তাহলে নিরাপত্তাহীনতা বাড়বেই। নিজস্ব আগ্রহ, কাজ, পরিচয়, বন্ধুত্ব—এগুলো আপনাকে সম্পর্কের বাইরে দাঁড় করায়।

৯. সব ভাবনা শেয়ার করাই সুস্থতা নয় :
সব বললেই সম্পর্ক ভালো থাকবে— এমন নয়। কিছু ভাবনা নিজের ভেতর সামলানো প্রয়োজন, তাতে সম্পর্ককে রক্ষা করা সম্ভব। নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে, ‘এটা বললে কি সমাধান হবে, না কি শুধু অস্থিরতা বাড়বে?’

নিজেকে প্রটেক্ট করা মানে দূরত্ব তৈরি করা নয়। বরং এতে সম্পর্কের উপর চাপ কমে। যখন একজন মানুষ নিজের আবেগ নিজে সামলাতে শেখে, তখন সম্পর্ক হয় হালকা, নিরাপদ এবং কম ক্লান্তিকর।

দাম্পত্য বা রোম্যান্টিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে—
১) অভিযোগ নয়, অভিজ্ঞতার ভাষা ব্যবহার করুন।
২) সঙ্গীকে ‘emotional therapist’ বানাবেন না। মনে রাখতে হবে, আপনার সব ইনসিকিউরিটি সারানোর দায়িত্ব সঙ্গীর নয়।

৩) আশ্বাস চাওয়া আর নির্ভরশীলতার পার্থক্য বোঝা জরুরি :
প্রতিদিন, প্রতিটি বিষয়ে আশ্বাস চাইলে সম্পর্ক হাঁপিয়ে ওঠে।

৪) স্পেস মানেই ভালোবাসার অভাব নয়— এটি মেনে নিন :
সঙ্গী আলাদা সময় চাইলে, চুপ থাকলে, বা নিজস্ব জগতে থাকলে— তা সম্পর্ক ভাঙার ইঙ্গিত নয়। বরং সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখে। একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট হিসেবে বলতে পারি, নিরাপত্তাহীনতা কোনও চরিত্রগত দুর্বলতা নয়। এটি শেখা যায়, বোঝা যায়, এবং ধীরে ধীরে বদলানো যায়। সম্পর্ক টিঁকে থাকে তখনই, যখন আমরা বুঝি— সব দূরত্ব মানেই বিচ্ছেদ নয়, আর সব নীরবতা মানেই ভালোবাসার অভাব নয়। যারা বেশি ভাবেন, তাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিজের ভেতরে নিরাপত্তা তৈরি করা। সেখান থেকেই সব সম্পর্ক হয় হালকা, গভীর, এবং স্থায়ী।

Sujoy Guha: