কলকাতা, ১১ মে- দেশের অন্যান্য বিজেপি শাসিত রাজ্যের উন্নয়নের পথ অনুসরণ করেই এগোবে বাংলার নতুন সরকার, সোমবার মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠকের পর নবান্নে আজ এমনই জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুধু তাই নয়, বাংলায় যে সামাজিক প্রকল্পগুলি চলছে সেগুলোর কোনওটাই বন্ধ হবে না বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
নির্বাচনের আগে বিজেপির তরফে জানানো হয়েছিল, বাংলায় বিজেপির সরকার এলে তা মহাকরণ থেকে পরিচালিত হবে। কিন্তু মহাকরণে মেরামতির কাজ শেষ না হওয়ায় আপাতত কিছুদিন নবান্ন থেকে কাজ চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর সোমবার প্রথা মেনে প্রথম মন্ত্রীসভার বৈঠকের পাশাপাশি প্রশাসনিক বৈঠকও করলেন শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে শুভেন্দু ছাড়াও বিজেপি সরকারের পাঁচ মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পল, ক্ষুদিরাম টুডু, অশোক কীর্তনিয়া ও নিশীথ প্রামাণিক উপস্থিত ছিলেন। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফকে জমি দেবে সরকার। পূর্বতন তৃণমূল সরকার সীমান্তে জমি দিচ্ছে না বলে আগে একাধিকবার অভিযোগ তুলেছে কেন্দ্রের সরকার। বাংলার প্রচারে এসেও অনুপ্রবেশ ইস্যুতে তৃণমূলের সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে অমিত শাহ, হিমন্ত বিশ্বশর্মা, যোগী আদিত্যনাথরা। এবার প্রথম মন্ত্রীসভার বৈঠকে এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “রাজ্যের জনবিন্যাস বদলে গিয়েছে। প্রথম দিনই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং বিএসএফ-কে আমরা জমি হস্তান্তরে অনুমোদন দিলাম। ভূমি ও রাজস্ব সচিব এবং মুখ্যসচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হল। ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফ-এর হাতে প্রয়োজনীয় জমি তুলে দেওয়া হবে।”
মুখ্যমন্ত্রী আজ আরও বলেছেন, ‘দীর্ঘ দিন বাদে ভয়হীন, মৃত্যুহীন নির্বাচন হল। গোটা বিশ্ব তা দেখেছে। আমরা প্রথমেই বাংলার জনগণ, ৯৩ শতাংশ ভোটারকে নতমস্তকে কৃতজ্ঞতা জানালাম। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন, ভোটকর্মী, গণনাকর্মী, রাজ্য পুলিশ, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল, সংবাদমাধ্যম, প্রত্যেকের প্রতি ক্যাবিনেট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে।’ বাংলায় তৃণমূল সরকার কেন্দ্রের প্রকল্পগুলি চালু হতে দিচ্ছে না বলে বারবার অভিযোগ উঠেছে। আজ মন্ত্রীসভার বৈঠকের পরে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা, প্রধানমন্ত্রী কৃষক বিমা যোজনা, পিএম শ্রী, বিশ্বকর্মা, বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও, উজ্জ্বলা যোজনা-সহ একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্পে রাজ্যকে সক্রিয় ভাবে যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। জেলাশাসকদের দ্রুত সমস্ত আবেদন কেন্দ্রীয় মন্ত্রকে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য মন্ত্রিসভা। সোমবার থেকে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্পে যুক্ত হল পশ্চিমবঙ্গ।
ভোটের প্রচারে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে নিয়োগের জট কাটবে, সুযোগ পাবেন বঞ্চিতরা। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করলেন না পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার নবান্নে নবগঠিত সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে তিনি জানিয়ে দিলেন, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সের ঊর্ধ্বসীমা একধাক্কায় ৫ বছর বাড়িয়ে দেওয়া হল। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, আগের সরকার রাজ্যে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা কার্যকর করেনি। আজ থেকে বাংলায় সংবিধান মেনে বিএনএস অনুযায়ী কাজ হবে। পাশাপাশি, রাজ্যের আইএএস ও আইপিএস অফিসারদের কেন্দ্রীয় সরকারের ট্রেনিংয়ে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে যে অনীহা ছিল, তা কাটাতে ভিনরাজ্যের নিয়ম অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
বিজেপির নিহত ৩২১ জন কর্মীর পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া হবে বলে জানিয়ে দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “বিজেপির অকালে ঝরে যাওয়া ৩২১ জনকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছি, সমবেদনা জানিয়েছি। তাদের পরিবারের প্রতি এই সরকার দায়বদ্ধ। হত্যার বিচার চান তারা। তা আমরা দেব।” মুখ্যমন্ত্রী জানান, পূর্ববর্তী সরকার জনগণনা সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ১৬ জুন, ২০২৫-এর নির্দেশ দীর্ঘ দিন কার্যকর করেনি। বর্তমান সরকার অবিলম্বে সেই প্রশাসনিক নির্দেশ কার্যকর করছে বলে জানান তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী সোমবার নতুন সরকারের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার বৈঠক হবে। ওই দিন ডিএ, সপ্তম পে কমিশন-সহ একাধিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এছাড়াও ওই বৈঠকেই আর জি কর-সহ নারী নির্যাতন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “পরবর্তী সোমবার আমরা মন্ত্রিসভার আরও একটি বৈঠক করব। আরজি কর-সহ নারী নির্যাতন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, পে কমিশন, মহার্ঘ ভাতা (ডিএ), এরিয়ারের বিষয়ে আমরা ওই দিন আলোচনা করব।” ডিএ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন সরকারি কর্মচারীরা। এবার সেই ডিএ নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় নতুন সরকার সেদিকেই নজর সকলের।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে সুশাসন, সুরক্ষা এবং ডবল ইঞ্জিন সরকারের যে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে, তা দেশের অন্যান্য বিজেপি শাসিত রাজ্যের উন্নয়নের পথ অনুসরণ করেই এগোবে।” সংবিধানপ্রণেতা বাবাসাহেব অম্বেডকরের ‘ফর দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, অফ দ্য পিপল’-এর আদর্শ অনুসরণ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি। সাংবাদিক বৈঠকে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শুভেন্দু এও বলেন, “বেঁচে থাকা চার-পাঁচ শতাংশ সমালোচকও যাতে খুঁত না ধরতে পারে, আমরা তেমনভাবেই কাজ করব।”