গল্প : অপারেশন

সুকুমার রুজ

ডাক্তারবাবু বালিশ থেকে মাথাটা একটু উঁচু করে কান পাতেন। নাহ! এটা ঘরের টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার শব্দ নয়। তবুও উনি ঘাড় উঁচিয়ে একবার চালের দিকে তাকান। মনে হচ্ছে কেউ বাইরের দরজায় কড়া নাড়ছে!
উনি উঠে বসেন। কানে আসে বৃষ্টির শব্দ মেশানো পুরুষের গলা। ভাবেন, পাশের বাড়ির ন্যালাখ্যাপা ছেলেটা ঘ্যান ঘ্যান করছে! আজ হয়তো ওর বায়নাক্কা বেড়েছে! রোজকার মতো হেঁড়ে গলায় বলছে, ‘মা, পান্তা খাবু।’
কিন্তু না, এটা তো ওর গলা নয়! মনে হচ্ছে কেউ চিৎকার করছে— ও ডাক্তারবাবু!
ডাক্তারবাবু বিছানা ছেড়ে ওঠেন। এবার আওয়াজটা আরও স্পষ্ট— ও ডাক্তারবাবু! দরজা খুলুন!
তাহলে বাইরে কেউ…! উনি দাওয়ার আলো জ্বালেন। দাওয়া থেকে বাইরের দরজার মাঝে উঠোনটা বেশ বড়। বৃষ্টির জলে পিছল হয়ে গেছে। কয়েকটা ব্যাঙ সেখানে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। ঝড় আর বৃষ্টি পাল্লা দিয়ে চলছে। ডাক্তারবাবু ছাতা খোঁজেন, পান না। কোথায় রেখেছেন মনে করতে পারছেন না। ওদিকে দরজার বাইরে মরিয়া চিৎকার। ডাক্তারবাবু তড়িঘড়ি গিয়ে দরজা খোলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা যায়, কোলের উপর ডাক্তারি ব্যাগ নিয়ে সাইকেলের ক্যারিয়ারে ডাক্তারবাবু বসে রয়েছেন। আর ঝড়বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একটা যুবক প্রাণপণ চেষ্টায় সাইকেলটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যুবকটা ডাক্তারের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে একটা টর্চলাইট। সেটার হলদেটে আলোয় পথ তেমন দেখা যাচ্ছে না।
কয়েকবার যুবকটাকে সাইকেল থেকে নামতে হয়। নামতে হয় ডাক্তারবাবুকেও। কাঁচা রাস্তা। এবড়ো খেবড়ো। রাস্তার দু’পাশে গাছগাছালি। কোথাও গাছের শুকনো ডাল কিংবা পাখির বাসা ভেঙে পড়েছে। কোথাও জল জমেছে। অন্ধকারে ডাক্তারবাবু কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। এতো কম আলোয় যুবকটা কী করে রাস্তা দেখছে, ওই জানে।
একসময় রাস্তাটা ছোট্ট নদীর ধারে গিয়ে শেষ হয়। গাঁয়ের শেষে এই নদী। সারাবছর মরানদী, বর্ষায় জেগে উঠেছে। চারপাশ ফাঁকা। দু’একটা তালগাছ। বাতাসের শন শন শব্দটা আর নেই। কিন্তু বাচ্চার কান্নার মতো আওয়াজ আসছে কোথাও থেকে। এত অন্ধকার হওয়া সত্ত্বেও নদীর জল দেখা যাচ্ছে। মেঘে ঢাকা আকাশের অন্ধকারেও নদী কোথায় থেকে আলো পায় কে জানে!
ব্যাটারি শেষ হয়ে যাওয়া টর্চের হলুদ আলোয় দেখা যায়, নদীর কিনারায় একটা নৌকা। সেটাতে কোনও মাঝি আছে বলে মনে হয় না। নৌকাতে জলের ধাক্কায় ছলাৎ ছল শব্দ হচ্ছে। যুবকটা বলে— ডাক্তারবাবু, আমার হাত ধরে সাবধানে নামুন। ঘাট ভারী পিছল!
ওরা দু’জনে নৌকায় ওঠার মুহূর্তে একজন লোক যেন অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। লোকটার হাতে একটা লম্বা বাঁটওয়ালা ছাতা, গোটানো। ডাক্তারবাবু চমকে ওঠেন। লোকটার কাতর গলা— এই, আমিও ওপারে যাব, খুব দরকার। একটু নিবি রে!
যুবকটা ডাক্তারের মুখের দিকে তাকায়। ডাক্তারবাবু বলেন— মানুষ বিপদে পড়েছে, নিয়ে নাও।
উঠতে পারো। কিন্তু নৌকা ভারি হয়ে যাবে। তোমাকে লগি ঠেলতে হবে। আমার খুব তাড়া আছে।
ঠিক আছে— ব’লে লোকটা তড়াক করে লাফ মেরে নৌকায় ওঠে। দুলে ওঠে নৌকা। সে সাইকেলটা নৌকায় তুলতে সাহায্য করে।
বৃষ্টির তোড়ে নৌকায় তিনজন মানুষ ও একটা সাইকেল ভিজছে। আর ভিজছে ডাক্তারি-ব্যাগ ও লোকটার গোটানো ছাতা। নদীর ওপারে কিছু দেখা যায় না।
সরকারি হাসপাতাল এ-গ্রাম থেকে তেরো কিলোমিটার দূরে। তাই ওঁর পঞ্চাশটাকা ভিজিট-এর চিকিৎসাই গ্রামগুলোর মানুষের ভরসা। সব বাড়িতেই যাতায়াত। আশপাশের গ্রামের প্রায় সমস্ত মানুষ ডাক্তারের চেনা। অন্ধকারের মধ্যেও ডাক্তারবাবু লোকটাকে চেনার চেষ্টা করেন। চিনতে পারেন না। এত বৃষ্টিতেও লোকটা ছাতাটা কেন যে খুলছে না, এটাই ভাবেন ডাক্তারবাবু।
লোকটা অস্বস্তি কাটাতে কথা বলে— আপনার ব্যাগ দেখে মনে হচ্ছে আপনি ডাক্তার। এই ঝড়জলের রাতে কি রোগী দেখতে?
— হ্যাঁ, ওই ছেলেটার বাড়িতে অসুস্থ রোগী। তা আপনি?
— আমিও আপনার মতই…। ও গাঁয়ে একজনকে সাপে কেটেছে, বিষ ঝাড়তে যাচ্ছি।
— ওঝা?
বলতে পারেন। আবার ইউনানী বৈদ্যও বলতে পারেন। দরকারে অপারেশনও করতে হয়।
ডাক্তারবাবু কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় যুবকটা নৌকার হাল শক্ত করে ধরে বলে— ডাক্তারবাবু, একটু ধরে বসবেন! নৌকাটা পাড়ে ধাক্কা খাবে।
অচেনা লোকটা নৌকা থেকে নেমে নদীর পাড় ধরে জোরে পা চালায়। যুবকটা ও ডাক্তারবাবু অন্য পথে। এবার আর ডাক্তারবাবু সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসেন না। পিছনটা জ্বালা জ্বালা করছে। উনি সাইকেলের পিছনে পিছনে প্রায় দৌড়তে থাকেন। দূরে চাপ চাপ অন্ধকার। ওটাই গ্রাম।

দুই
টালির চালের বাড়িটায় কোনো পাঁচিল নেই। নিস্তেজ টর্চের আলোয় দেখা যায় কাদাভর্তি উঠোনে পুঁইমাচা ও অন্যান্য গাছপালা। তার নীচে একটা রাতচরা সাপ। যুবকটা পাশ কাটিয়ে মাটির দাওয়ায় ওঠে। ডাক্তারবাবু ওর পিছনে পিছনে। ঘরের দরজায় শিকল তুলে তালা দেওয়া ছিল। দরজা খুলতেই ভেতরে মেয়েমানুষের কাতরানি শোনা যায়।
— আসুন ডাক্তারবাবু! ওই যে ময়না। সেই সন্ধে থেকে…। গাঁয়ে দাই-মা নেই। বিটির-বাড়ি গিয়েছে।
— দেখি মা! গায়ের চাদরটা সরাও তো!
— ডাক্তারবাবু, আপনি পুরো ভিজে একসা হয়ে গেছেন, সব ছেড়ে ফেলুন। এই ধুতিটা পড়ুন!
— না, ঠিক আছে। তবে গায়ের জামাটা খুলতেই হবে। বৃষ্টিতে ভিজে শীত শীত করছে। একটা কিছু যদি…!
— দাঁড়ান ডাক্তারবাবু…।
যুবকটা টিনের বাক্স খোলে। ভাঁজ করা একটা পোশাক বের করে— এটা পরে নিন! আর তেমন কিছু নেই। এটা পুলিশের সোয়েটার, খেতুপুলিশ দিয়েছিল। হাতাদুটো ছিঁড়ে গিয়েছিল, তাই কেটে দিয়েছি। এতে শীত লাগাটা কমবে।
— ঠিক আছে, তুমি যাও, এক হাঁড়ি জল গরম করতে দাও!
ঘন্টা দুয়েকের চেষ্টায় ডাক্তারবাবু নাড়ি কেটে দুটো মানুষকে আলাদা করতে সক্ষম হন। দু’জনই মেয়েমানুষ। একটা মেয়েমানুষ নিস্তেজ হয়ে পড়েছে, আর অন্যটা কীসের কষ্টে যেন ওয়াঁও-ওয়াঁও করে কেঁদে ওঠে। কান্না শুনে নিস্তেজ মেয়েমানুষটার ঠোঁটের কোণে নরম হাসি।
বাইরে তখনও বৃষ্টি ঝরছে। মাঝে মাঝে মেঘের ডাক। সেইসঙ্গে কিছু পাখির ডাকও শোনা যায়। কিন্তু পাখির ডাক ছাপিয়ে একটা কোলাহল কানে আসে। কোলাহলটা যেন নদীর দিক থেকে আসছে!
যুবকটা বলে— হাটুরেরা। নদীর পাড়ে সবজি ডাঁই করছে।
আমি এখন চলি ভাই। সকালেই অন্য গাঁয়ে রোগী দেখতে যেতে হবে। তোমার এই সোয়েটারটা একটু কেচে দিও। দু’-এক জায়গায় রক্তের দাগ লেগে গেছে।
— রক্ত! ডাক্তারবাবু, অপারেশন করতে হল নাকি?
— অপারেশন! তা বলতে পারো। অনেক কষ্ট করে ডেলিভারি করাতে হল। বেশ কিছুটা চিড়ে গিয়েছিল, সেলাই করতে হল।
— ডাক্তারবাবু, একটু চা করি, খান। তারপর বেরোবেন। ততক্ষণে ভোর হয়ে যাবে। খেয়ানৌকা পাবেন। হাটুরেরা ভোররাতে সবজি নিয়ে ওপারে যায় তো!
— চা! তা করতে পারলে করো।
ডাক্তারবাবুর দিকে চায়ের কাপ বাড়িয়ে যুবকটা বলে— বলছিলাম, আপনার ভিজিটের জন্য পঞ্চাশটাকা এখন আমার কাছে নেই। আপনি এই সাইকেলটাতে চড়ে চলে যান। এটা আর ফেরত দিতে হবে না। আপনার কাজে লাগবে।
কাজে লাগবে না। আমি সাইকেল চালাতে জানি না। হেঁটেই চলে যাব। তুমি পারো যদি একটু দুধ জোগাড় করে এনে গরম করে তোমার স্ত্রীকে খাওয়াও। আমি তাড়াতাড়িতে টাকার ব্যাগ নিতে ভুলে গেছি। তা না হলে দুধ কেনার দামটা…।
— ডাক্তারবাবু সাবধানে যাবেন। রাস্তাঘাট খুব পেছল।
— আমি চলে যেতে পারব। তুমি তোমার স্ত্রীর খেয়াল রাখো। বাচ্চাটার ঠান্ডা না লাগে।

তিন
নদীর ধারে অনেক লোকজন। একখানা নৌকা ঘাটে বাঁধা। তাতে ঠাসাঠাসি ভিড়। ডাক্তারবাবু তড়িঘড়ি এগিয়ে কোনক্রমে নৌকায় ওঠেন।
নৌকা ছেড়ে দেয়। নৌকায় ভিড়ের মধ্যে থেকে কে একজন বলে ওঠে— নদীর পাড়ে ওই এম এল এ কালু চক্কোত্তির সোমত্ত মেয়ের বডিটা পড়ে আছে। ধড় থেকে মুণ্ডু আলাদা করা। তাকানো যাচ্ছে না।
অন্য একজন বলে ওঠে— চক্কোত্তির মেয়েটা জগন বাউড়ির ছেলের সঙ্গে মজেছিল যে! চক্কোত্তি অনেক বাধা দিয়েছিল, বুঝিয়েছিল, ফল হয়নি। তাই…।
নৌকার মাঝি দাঁড় বাইতে বাইতে বলে ওঠে— কাল রাতে কেউ আমার নৌকোর নোঙর তুলেছিল। পারাপারও করেছে। তার মানে গাঁয়ের কেউ এ কাজ করেনি। মনে হয়, ভিন গাঁয়ের লোকের কাজ।
অন্য একজন বলে ওঠে— দেখিস, এরপর জগনের ছেলেটাও যাবে। এর আগেও অন্য পার্টির কয়েকজন হাপিস হয়ে গেছে। নিজের মেয়েটাকেও ছাড়ল না। অপারেশন হয়ে গেল। সবই সম্মান আর টাকার খেল!
‘অপারেশন’ কথাটা শুনে ডাক্তারবাবুর গায়ের রোম খাড়া হয়ে যায়। উনি আড়চোখে নৌকায় থাকা সমস্ত লোকের মুখগুলোতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুড়ে কালকে রাতে দেখা সেই গোটানো লম্বা ছাতা হাতে লোকটাকে খুঁজতে থাকেন।

Sumit Chakraborty: