গল্প: ভাড়াটে

শিবজ্যোতি দত্ত

— মানুষ কি সত্যিই স্বাধীন, বলুন তো?
— মানে?
মানে এই যে, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কারও না কারও অধীনে থাকতে হচ্ছে। বাবার অধীনে, বসের অধীনে।
— বুঝেছি, নেক্সট বউয়ের অধীনে বলবেন। আমার বউ এসব শুনলে—
— আপনার বউ এখানে কোথায়?
— এখানে নেই ঠিকই। কিন্তু বাতাসে কান পেতে থাকেন। অলৌকিক ক্ষমতা, মশাই। তা স্বাধীনতার কথা কী বলছিলেন যেন? সকাল সকাল দার্শনিক হয়ে পড়লেন? না কি কোনো গণ্ডগোল হল?
— না, কোনো গণ্ডগোল নেই। ভাড়াবাড়ির কথা মনে পড়ছিল।
— ভাড়াবাড়ি! আপনি ভাড়াবাড়িতে ছিলেন?
ছিলাম মানে! সতেরোটা বছর। ত্রিপুরা থেকে কলকাতায় চাকরি নিয়ে এলাম, পকেটে বিশেষ কিছু নেই তখন, তাই সস্তায় যা পেলাম তাতেই উঠলাম।
— কোথায় থাকতেন?
প্রথমে এই তো শ্যামবাজারে। হরিপদ মল্লিকের বাড়ি। মাসিক দুশো পঁচিশ টাকা।
— দুশো পঁচিশে! সে তো জলের দরে পেয়েছিলেন, মশাই।
— জলের দর, কিন্তু জলও মিলত না ঠিকঠাক। নিয়ম করে এক ঘণ্টা জল দিতেন। হরিপদবাবুর আবার এক্সট্রা নিয়ম— ছাদে ওঠা বারণ। জোরে গান চালানো, গান গাওয়া বারণ।
— গানের বারণ, তাও বোঝা যায়। ছাদে উঠতে দেবেন না কেন?
— সেটা জানতে তিন মাস সময় লেগেছিল। ছাদে গোপন বাগান আছে। ফুলটুল নয়, পেঁয়াজ-রসুন-পালং— এসব। শহরের বুকে নিজস্ব কৃষিকাজ। আমি ছাদে উঠলে ফসল যদি নষ্ট করে ফেলি, সেই ভয়ে।
— এঃ হেঃ। কিন্তু ছাদে না উঠলে অসুবিধে কীসের? একলা মানুষ আপনি তখন, বেশি কাপড়চোপড় তো থাকার কথা নয় যে ছাদে মেলতে হবে।
— অসুবিধে এই যে, কলকাতার গরমে ছাদ না থাকলে মানুষ সেদ্ধ হয়ে যায়, মশাই। তার উপর সন্ধেবেলা হরিপদবাবুর ধূপের উৎপাত। ভক্ত মানুষ কিনা! ধূপ জ্বালাতেন এমন পরিমাণে যে মনে হতো, পুরো বাড়িটাকেই তিনি পরলোকে পাঠাতে চাইছেন। সেই ধোঁয়ায় মশা আর আমি উভয়েই শয্যাগত প্রায়, আর বাড়িময় হরিপদবাবুর বউয়ের রান্নার গন্ধ ভেসে আসত।
— কীসের গন্ধ?
— ডালের বড়া ভাজার গন্ধ। সন্ধেবেলা প্রায়— দিন। কড়াইয়ে তেল ফুটছে, ডালবাটা তেলমগ্ন হয়ে টুসটুসে মুচমুচে হয়ে কড়াইয়ের পাড়ে উঠছে, তাদের তেলস্নানের যে ছ্যেকছ্যেক শব্দটা, মশাই— তার উপর বড়ার গন্ধটা ধূপের ধোঁয়া ভেদ করে আমার নাকে এসে বলত, তুমি এই বাড়িতে আছ, কিন্তু এই বাড়ির কেউ নও।
— এটা তো কবিতার মতো কথা হয়ে গেল।
— কবিতা নয়, যন্ত্রণা। ভাড়াটের যন্ত্রণা হল—গন্ধ পাবে, খেতে পাবে না। হরিহরের মতো। পথের পাঁচালী পড়েছেন?
— পড়তে শুরু করেছি বহুবার। ইন্দির ঠাকরুন মরতেই চোখে জল এসে বই বন্ধ হয়ে যায়।
— সে যাকগে। হরিহর সারাজীবন ঘুরে বেড়ান, কোথাও থিতু হতে পারেন না। আমিও তাই। পার্থক্য শুধু এটুকু যে, হরিহর যেতেন স্বপ্নের টানে, আমি যেতাম বাড়িওয়ালার ঠেলায়।
— হাঃ হাঃ। তারপর কোথায় গেলেন?
— বেহালায়। নরেন্দ্রবাবুর বাড়ি। সাতশো টাকা ভাড়া। বাড়িতে একটাই রান্নাঘর।
— হুম, একটু বেশি।
— বেশি বটে। কিন্তু নরেন্দ্রবাবু আধুনিক মনের মানুষ। ছাদে উঠতে পারি, ধূপটুপের বালাই নেই। তবে রান্নাঘরটা ছিল তাঁর পুলকেশীর রত্নভাণ্ডার।
— মানে?
বিশ্বের নানান জায়গা থেকে বেছে বেছে কাটলারি আনিয়েছেন, মডুলার কিচেন, মশাই। রোজ সকালে রান্নাঘর ইন্সপেক্ট করতেন। কাল মশলার কৌটো ঢাকনা না দিয়ে রেখেছেন কেন, পরশু চুলার পাশে তেলের ছিটে পড়েছে কেন, বৃহস্পতিবার বেসিনে কাঁচা মাছের আঁশ পাওয়া গেছে।
— সিবিআই একেবারে।
— ঠিক। কিন্তু আসল বিপদ হল একদিন। শীতকালের সন্ধেবেলা, মাথায় চাপল ড্রাই ডাক প্যাক প্যাক বানাব।
— ড্রাই ডাক প্যাক প্যাক! এ আবার কী জিনিস?
— হাঁসের মাংস দিয়ে শুকনো চিনে রান্না। হাঁসের টুকরো আগে রোস্ট করে নিতে হয়। তারপর চড়া আঁচে কড়াই বসিয়ে তেল গরম করে কাঁচালঙ্কা চিরে দিতে হয়। সেই লঙ্কার সুগন্ধ বেরোনো অবধি অপেক্ষা করতে হবে। তারপর হাঁসের টুকরো দিয়ে ভালো করে টস। তারপর যত সস আছে দুনিয়ায়, ঢালবেন ওতে। মাংসের গায়ে সস লেগে গেলে টুকরোগুলো চকচক করে ওঠে, ঘরময় একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে— কাঁচালঙ্কার ঝাঁজ আর সয়া সসের মিষ্টি আঁচ একসঙ্গে মিলে কী যে একটা জিনিস হয়—
— আহা, শুনতেই জিভে জল আসছে, মশাই। আমার এক মাসি ছিলেন, তিনিও হাঁস রাঁধতেন। সেই রান্নার গন্ধ পেলেই বাড়ির সবাই রান্নাঘরের দরজার সামনে ঘুরঘুর করত। আচ্ছা, তারপর?
— তারপর দরজায় নক। নরেন্দ্রবাবু।
— ইন্সপেক্টর হাজির!
— আবার কী? দরজা খুলতেই তাকালেন রান্নাঘরের দিকে। বললেন, দাদা, ফোঁড়নটোরন দেওয়ার আগে এগ্‌জস্ট ফ্যান চালিয়ে নেবেন। দেয়ালে তেলের দাগ পড়ে।
— গন্ধ পাননি রান্নার?
— পেয়েছিলেন। নাকের পাটা একটু ফুলেছিল বটে, কিন্তু সেটা আমাকে বুঝতে দেননি। খেতে ডেকেছিলাম। বললেন, রাতে হালকা খান। বেরোনোর সময় বললেন, চুলা বন্ধ করতে ভুলবেন না।
— খাবেন না, কিন্তু দেয়ালের দাগের হিসেব রাখবেন! আমার এক বন্ধু ছিল, শিয়ালদায় ভাড়া থাকত। বাড়িওয়ালা নাকি রোজ রাতে ঘুমের আগে মিটার রিডিং নিতেন। ডায়েরিতে লিখে রাখতেন। মাসের শেষে ইউনিট মেলাতেন।
— এরকমই হয়। তা বেহালা ছেড়ে গেলাম গড়িয়ায়। ফণীন্দ্রবাবুর বাড়ি। বারোশো টাকা ভাড়া।
— ভাড়া তো বেশ চড়া।
— চড়া বটে। কিন্তু ফণীন্দ্রবাবু সব দিক দিয়ে স্বাধীনতা দিতেন। ছাদে যাওয়া যায়, গান করা যায়, রান্নাঘরে যা খুশি রান্না করলে কেউ কিছু বলে না।
— তাহলে তো ভালোই হল।
— হল। কিন্তু ফণীন্দ্রবাবুর একটা টিয়াপাখি ছিল।
— পাখিতে অসুবিধে কী?
— টিয়াটা ছিল কুচুটে স্বভাবের। আমি বাড়ি ফিরলেই চেঁচাত, দেরি করে এলি কেন? ফণীন্দ্রবাবু শিখিয়েছিলেন কিনা।
— টিয়ার কাছেও জবাবদিহি! হাঃ হাঃ।
— হাসছেন! একদিন বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখি বাড়িতে আমি একা, আর আছে শুধু টিয়া। সে হঠাৎ বলে উঠল, চুরি করিস না যেন।
— হাঃ হাঃ হাঃ। আহা, মশাই, এ যে সত্যিকারের বিপদ।
— হাসছেন? কিন্তু শুনুন, পরের দু’দিন নিজের হাতের দিকে তাকাতে পারিনি। তারপরও বারো বছর সেই বাড়িতে ছিলাম। শেষদিন পর্যন্ত আমাকে দেখলেই চেঁচাত, এ কী করলি? এ কী করলি?
— পাখিটাও আপনাকে চিনল না বারো বছরেও! তাহলে এত কষ্ট সহ্য করে থাকলেন কেন?
— তখন রোজগার কিছু করছি। ভাড়াটা গায়ে লাগে না খুব একটা। মানুষ ভাড়া কম পেলে অনেক কিছু সহ্য করে। হরিপদবাবুর ধূপ থেকে নরেন্দ্রবাবুর হিসেব থেকে ফণীন্দ্রবাবুর টিয়া— সব মেনে নিয়েছি। এটাই ভাড়াটের ধর্ম।
— এমন ধর্মপালন কঠিন, মশাই। তা এখন কোথায় আছেন?
— এখন নিজের বাড়ি।
— বাঃ। কবে হল?
— বছর দশেক হল। গড়িয়ায়। দোতলা বাড়ি। ছাদ আছে, নিজের মতো গান করা যায়, রান্নাঘরে কেউ আসে না, টিয়াপাখি নেই।
— চমৎকার। বাড়িটা নিজের নামে তো?
— আজ্ঞে, না।
— না মানে! তাহলে কার নামে?
— ফণীন্দ্রবাবুর মেয়ের নামে।

Sumit Chakraborty: