রাজকুমার শেখ
ভোরের ঝুজকি লেগেছে। গত রাতে বৃষ্টি নেমেছিল। মনে হল বৃষ্টি ছাড়বে না। মেঘের গজগজ শব্দ। জানবিবি বালিশ আঁকড়ে শুয়ে থাকে। বরাবর সে মেঘের ডাককে ভয় পায়। এখন তো একা সে। আরও বেশি তার ভয়। নিজেকে আগলে রাখা। বেড়া ভেঙে কখন কে ঢুকে পড়ে, কে বলতে পারে? এত দিন জামিল তার পাশে ছিল। এখন জামিল নেই। পরিযায়ী হয়ে গেল। সে বার কাজে গিয়ে আর সে ফিরল না। তার খোঁজ কেউ দিতে পারেনি।
আজও পথ চেয়ে বসে থাকে ও। তার এ পথ চেয়ে থাকা হয়তো শেষ হবে না। কতবার ওর বাপ মেছের আলি নিয়ে যেতে চেয়েছেন বাড়িতে। কিন্তু জানবিবি আর তাদের বাড়িতে ফিরতে চায়নি। দুখ-ধান্দা করে তার একার পেট চালিয়ে নেয়। মেয়েটাকে দেখলে মেছের আলির বুক ভেঙে যায়। কত আদরে তাকে মানুষ করেছে। গাঁয়ের স্কুলে পড়েছে। আজ তার মেয়েটা কত একা।
মেছের আলির চোখ বেয়ে জল নামে। এই তো সেদিন তার কোলে চেপে মেলা দেখতে গিয়েছিল। মনে হয় সময়টা থমকে আছে। তার বুকে এখনো সেই ছোট্ট জানের গায়ের গন্ধ মিশে। মেছের আলি তার বুকে হাত বোলায়। আর কাঁদতে থাকে।
বাবজী, কাঁদোনি গো! তুমার জান ভালো আছে। তুমি কাঁদলে আসমান জমিন যে নড়ি যাবে। খোদার আরশ কাঁপবে!
মেছের আলি আরও জোরে কাঁদতে থাকে। জানবিবি ওর বাপের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক দৃষ্টিতে। ওর বুক মুচড়ে মুচড়ে ওঠে।
আজ অনেক দিন পর ওর বাপের কথাগুলো মনে পড়ে গেল। বেশ কিছু দিন মেছের আলি আসতে পারেননি। শরীর খারাপ। জান ভাবল সকাল হলে যাবে বাপকে দেখা করতে। কিন্তু এ বাড়ি ফেলে যাওয়া মুশকিল। দুটো গাছগাছালি লাগানো আছে। কারও গরু এসে হয়তো সব খেয়ে যাবে। সবজি বেচে দুটো পয়সা হয়। জামিলের কাজ না থাকলে বাড়ি-লাগোয়া এক ফালি জমিটুকুতে এটা-সেটা লাগাত। জানবিবি জল দিত গাছগুলোতে। জামিল বলত, ‘বুঝলি জান, জমি মা রে। বাপ-দাদার জমি-জিরেত ছিল এক সময়। কত ফসল কুটো হতো। পোড়া ভাঙন সব খেলি। লদীটো আর আমাদের লয়! ও পর হয়ি গেছি। অজানা। জান, তুকে তেমন করি আর সুখ দিলিম কই! এই পোড়া কপালে তুইও এলি ঘরটো করতি!’
‘ও কথা বলতি আছি গো? মা রাগ করবেক তুমার কথা শুনি। মাটি, লদী কখনো পর হয়নি গো। আপন। সব আপন। কী সোন্দর এই মায়া ভরা পৃথিবী।’
‘জান, তু কী ভালো কথা বলিস বটে। মেলা পড়েছিস। তুর বুদ্ধি হবিনি।’
কথাটা বলেই জামিল হাসতে থাকে।
‘দে-দে, গাছের গোড়ায় পানি দে। তুর হাতের পানিতে গাছগুলো বাঁচুক!’
আজও সেই জমিটুকুতে ও নিজ হাতে চাষাবাদ করে। নিড়ানি দেয়। আগাছা তোলে। গোবরে সার দেয় গাছের গোড়ায়। ফনফনিয়ে ওঠে গাছে। যেন রোদ পিছলে পড়ে পাতা থেকে। জান চেয়ে চেয়ে দেখে। জামিল থাকলে খুব খুশি হতো।
ও পাড়ার লতিবুর সবজি কেনে বাজারে বেচে। ও আসে জমি থেকে নিতে। বসে মাটির দাওয়াতে। দু’-একটা কথা জানের সঙ্গে বিনিময় হয়। টাকা মিটিয়ে এক সময় ও চলে যায়।
লতিবুর কথায় কথায় বলে, ‘জানবিবি, এবার একটা বে করে লাও। আর কত একা থাকবি? জামিল ভাই আর কি ফিরবি?’
লতিবুর কথাটা বলে বিড়িতে টান দেয়। তেরছা চোখে তাকায় জানের দিকে। তার ভরাট বুকের দিকে তাকিয়ে থাকে হাঁ করে। জানবিবি নিজেকে শাড়ির আঁচল দিয়ে আড়াল করে। মনে মনে বলে ও, গু-খেকুর বেটা, কখন যাবে তার বাড়ি থেকি?
তার মনের মতলব ওর বুঝতে বাকি থাকে না। কিন্তু অগত্যা তাকে সবজি বেচতে হয়। নগদ পয়সাটা পায় হাতে। আর বাড়ি বয়ে এসে খরিদ করে। জানবিবি তাকে এড়িয়ে যায়। বাপু, তুমার পয়সা পেয়ে গেছি। মানে মানে এবার কেটে পড়।
ও মনে মনে ভাবে কথাটা।
ভোরের ঝুজকি হয়ে আসছে। এবার তাকে উঠে ফজরের নামাজ পড়তে হবে। বড় মসজিদে আজান হয়ে গেছে। বৃষ্টিতে ভেজা ভোর। জামিল থাকলে তাকে এখনো আঁকড়ে ধরে শুয়ে থাকত। মানুষটার গায়ের সুগন্ধি এখনো সে পায়। গোটা ঘরে ছড়িয়ে আছে সে গন্ধ। সে অনুভব করে আজও। কত সুখের রাত। আজও ও খালি পাশটা শুতে গিয়ে তাকিয়ে থাকে। শূন্য বিছানা। কত রাত অবধি তার ঘুম আসে না। রাতের পাখিগুলো ডানা ঝাপটিয়ে শিশির ঝরে ফেলে। কলা গাছের পাতা থেকে শিশির পড়ে টুপটুপ শব্দ করে। বেড়ার ওপাশে কাদের পায়ের চলাচলের শব্দ ভেসে আসে। জানবিবি একা একা রাত কাটায়। পাহাড়সমান রাত কাটতে চায় না। জামিল থাকতে যেন তাড়াতাড়ি রাত কেটে যেত। মনে হতো এই তো শুতে গেলাম। এখন কত ভারি লাগে রাতকে। বুকের ওপর চেপে বসে থাকে কালো রাত।
ওদের চালের ওপর একটা পেঁচা রোজ এসে বসে ডাকে। ও কাকে ডাকে, কে জানে! রাতকে খানখান করে ডাকতে থাকে। ওর চোখ দুটো এদিক-ওদিক চায়। জানবিবি একা ভয় পায়। জামিলকে সে কথা বলেছিল। জামিল হেসে বলেছিল, ‘আমি যখন দূরে কাজে যাব, তখন কি থাকতি পারবি? একেই বলে মেয়ে মানুষের জান!’
জামিল কথাটা বলে হাসতে থাকে।
জানবিবি আর কথা বাড়ায় না। জামিল চলে গেল ফেরি করতে। জানবিবি একা হয়ে গেল। জামিলের জন্য ওর মনটা কেমন করে ওঠে। সকল ফেরিওয়ালা ফিরে এল। কিন্তু সে ফেরে না। ওর চোখের জল শুকিয়ে কাঠ।
জানবিবি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। কলতলায় গিয়ে ওজু করে। নামাজ আদায় করে ফজরের। সকালের পাখিগুলো ডাকছে। সুন্দর এই সকালটা কত পবিত্র। বাড়ির সামনে দিয়ে কেউ গেলেই ও তাকিয়ে থাকে। এই বুঝি জামিল আসছে। তার পথ চাওয়া শেষ হয় না। কবে শেষ হবে তার এই পথ চাওয়া? নামাজে বসে জামিলের জন্য ও দোয়া করে।
পাখিগুলো ডাকছে। বেলা হয়ে আসছে। কলা পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে মিঠে রোদটা এসে পড়েছে ওদের উঠোনে। এমন সময় হঠাৎ ছকু বুড়ি এসে হাজির। বেড়া ঠেলে ও ঢোকে।
‘কই— রি জান! ওলো, এখনো উঠিসনি? বেলা যে অনেক হল। বেটা-বউ সব কাজে চলি গেল। আর মাগীর ঘুম ভাঙেনি। উঠ লো, উঠ!’
‘বুড়ি, আমি সেই কখন উঠেছি। তুমার মতো অত ঘুরি বেড়াইনি।’
‘মাগীর বড়ো কলা— লো!’
আজ তাকে দিয়ে শুরু হয়ে গেল দিন। সকাল হলেই কারও না কারও বাড়ি ঢুকে পড়ে বুড়ি। চোপা বাড়ে যত দিন বাড়ে। ওর চোপাও বাড়তে থাকে। বুড়ির মুখে কিছু আটকায় না। জানবিবি যতই কাজের দোহাই দিক না কেন, বুড়ি দাওয়াতে বসে চলবে কত কথা। কার বউ কার সঙ্গে কী করে— সব খবর ওর কাছে থাকে। বুড়িকে গাঁয়ের লোকজন এড়িয়ে চলে। আজ জানের কপালে যে কী আছে! কোন কথা বলতে কোন কথা বলে বসবে— বিশ্বাস নেই। জান কাজে মন দেয়।
‘ওলো— জামালের মাগ, তুর কী হবে লো? ভরা যৌবন। লদীর মতো উতলা। মাগী—মুখপুড়ি! মিনসে ধর। তা না হলি তুকে কে দেখবে লো? যৌবন মরি গেলি আর কেউ আসবিনি।’
বুড়ি কথাটা বলেই হাসতে থাকে। এখনো মনে হয় ওর রস মরেনি। সব সময় রসে থাকে বুড়ি।
জান ভাবে কথাটা।
ঘরে মুড়ি ছিল। আখের গুড় দিয়ে বুড়িকে খেতে দেয়। বড়ো বড়ো চোখ করে তাকায় বুড়ি। কোনো কথা না বলে মুড়ি খেতে লাগে। জান উঠোন ঝাঁট দিতে থাকে। খাবার সময় কথা বলে না। ওর যত মুখ বন্ধ থাকবে তত ভালো। একবার মুখ খুললে তা আর বন্ধ হবে না। এখন শান্ত পরিবেশ। পাখিগুলো ডাকছে। জান ঝাঁট দিতে দিতে ও পাখির শোনে। সকাল সকাল ও কাজ সেরে বাপকে দেখতে যাবে বলে আগেই সব ঠিক করে রেখেছে। না গেলেও ওর উপায় নেই। টাকাও আনবে সংসারটার জন্য। মাঝে মাঝে ওর বাপের কাছে টাকা চায়। ক’দিন আসেননি ওর বাপ।
বুড়ি মুড়ি শেষ করে বলে, ‘চলা গেলিম রে জান। অন্য সময় আসব।’
বুড়ি বেড়া ঠেলে চলে গেল। জান হাঁপ ছেড়ে বাঁচে।
এমন সময় হঠাৎ লতিবুর এসে হাজির।
‘কই লা জান ভাবি? ফসল কুটো কি আছে? বাজার ভালো আছে। দাম পাবা ভালো।’
ও বেশ জানে কেন সে বারবার আসে। ওর মতলব আলাদা। জানকে সে ফুঁপিয়ে মেলায় নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু জানবিবি রাজি হয়নি। ওর সঙ্গে গেলেই সুযোগ পেয়ে যাবে।
‘তা এত সকালে কী মন করি?’
‘এলিম। যদি তোমার গাছে ফল ধরে।’
লতিবুর তেরছা চোখে তাকায়। জানবিবির গা পুড়তে থাকে। বমি পেয়ে গেল। আজ সকালটাই অন্য রকম। হাতের কাজ থামিয়ে বলে, ‘আজ আমি সবজি বেচব না। কাল এসো লতিবুর।’
‘জান ভাবি, তুমার অনেক কাজ। এলুম একটু কথা বলব।’
লতিবুর পকেট হাতড়ে একটা বিড়ি ধরিয়ে টান দেয়। সকালটা নষ্ট হয় ওর বিড়ির ধোঁয়াতে। জানবিবির কষ্ট হয় বাতাস নিতে। ও মনে মনে বলে, নামুনি কলেরা, শূল, কুরবানি— আর সময় হল না আসবার!
জানবিবির মুখে রক্ত ছলকে বের হবে মনে হচ্ছে। লতিবুর ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ঝাঁট দেওয়া শেষ করে। আজ সকালটা কেমন যেন। বুড়িকে সে তাড়ালো। কিন্তু এই মিনসে কে কেমন করে তাড়াবে? আর ভালো লাগে না। তার মানুষটা ওকে খাদে ফেলে গেছে। এ সব ফেলে সে তার বাপের বাড়িও যেতে পারছে না। ও না থাকলে বাড়িটাকে গিলে নেবে আগাছাতে। জামিলের ওপর ওর রাগ হয়। দেশ-গাঁয়ে কি কাজ ছিল না? দুটো পেটের জন্য তাকে বাইরে যেতে হয়। এখানে তেমন কাজ নেই। মানুষটা এখনো ফিরল না!
জানবিবি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। একটা মানুষ নেই, তাই লতিবুর সুযোগ খুঁজছে। তাকে বাগে পেলেই কামড়ে খেয়ে ফেলবে। জানবিবি সবই বুঝতে পারে। কিন্তু সে কিছু মুখে বলতে পারে না।
‘ও জান ভাবি, একবারটি বসতি বললি না? সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি।’
লতিবুর বলে কথাটা।
‘না ভাই, আমার তাড়া আছে। বাপকে দেখতে যাব। তুমি আজ এসো।’
তাও লতিবুর দাঁড়িয়ে থাকে। জানের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর শরীর পরখ করছে। জান নিজেকে সামলে অন্য ঘরে চলে আসে। তারপর ও ঘর বন্ধ করে রাস্তায় এসে পড়ে। লতিবুর ওর চলে যাওয়া দেখে। রোদের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে জান রাস্তার বাঁকে মিলিয়ে গেল।
২.
জামিল ফিরেছিল অনেক দিন পর। কিন্তু ফিরে সে কী পেল? শূন্য ঘর। সংসারে জানবিবিকে সে পায়নি। যে জানবিবিকে সে রেখে গিয়েছিল, তার সংসারে ঢুকে পড়েছে লতিবুর। তাকে ফুঁসলিয়ে তার জালে আটকে যায় জানবিবি— জামিল মনে করে কথাটা। জান কি সেই আগের মতো আছে? কেমন পরপর মনে হয়। সবজি জমিতে না হলেও লতিবুর আসে। জানের সঙ্গে ঘন হয়ে বসে কথা বলে। জামিল দূরে দাঁড়িয়ে সে সব দৃশ্য দেখে। সে ভাবে মনে, এখানে আর না এলেই ভালো হতো। থাক ওরা ওদের মতো করে। জান তার মনের মানুষ জুটিয়ে নিয়েছে।
জামিলের বুকটা হাহাকার করে ওঠে। রাতে শুয়ে তার কত কথা মনে পড়ে যায়। মেয়েরা কি সত্যি বদলে যায়? ওর মন কেমন যেন করে ওঠে।
একটু আগেই লতিবুর এসেছিল। জানের সঙ্গে কী সব কথা বলছিল। জামিল সে দিকে কান করে না। ওর মতো করে সবজি মাঠটুকুতে আগাছা তুলতে থাকে। তার গোটা বাড়ি আগাছাতে ভরে গেছে। এখনই আগাছা পরিষ্কার না করলে তার বুকের জায়গাটুকুও দখল করে নেবে লতিবুরদের মতো আগাছা। জামিল তার দু’হাত দিয়ে সহজ মাটির বুক থেকে উপড়ে ফেলে তার জমিতে দখল নেওয়া আগাছাটাকে।