শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়
ফ্ল্যাটে ঢুকে ডাইনিং টেবিলের ওপর রাতের জন্য বাইরে থেকে কিনে আনা খাবারের প্যাকেটটা রেখে সোজা বাথরুমে ঢুকে যায় আম্পিউট সার্জেন্ট ডক্টর পরিতোষ গাঙ্গুলী। বাথরুমে গিয়ে স্নান করে ফ্রেশ হয়ে এসে কিনে আনা খাবারের প্যাকেটটা নিয়ে কিচেনে মাইক্রোওভেনে গরম করে সেটা তড়িঘড়ি গলাধঃকরণ করে সোজা বিছানায় গিয়ে লেপ মুড়ি দিলেন তিনি। আজকে শীতটা একটু বেশিই জাঁকিয়ে পড়েছে, তার ওপর সারা দিনের পরিশ্রমের পর ডক্টর গাঙ্গুলীর চোখে নেমে এসেছে রাজ্যের ঘুম। আজ বেশ কয়েকটা অস্ত্রোপ্রচারের কাজ ছিল তার। পরপর দুটো রোগীর পচন ধরে যাওয়া কিডনি শরীর থেকে কেটে বাদ দিয়েছেন আজ। এছাড়াও করেছেন দুটো অপারেশন। তাই সারাদিনের ধকলে নিদ্রা দেবী এখন তার দু’চোখ জুড়ে বিরাজ করছে। বিয়ে-থা করেনি ডক্টর গাঙ্গুলী, তাই নিজে যখন রান্নাটা করার যখন সময় পান না, তখন বাইরে থেকে খাবার কিনে নিয়ে এসে খেয়ে নেন। বিছানায় শুয়ে চোখটা বন্ধ করতে যাবেন, হঠাৎই পাশের ঘরের একটা বয়াম ভেঙে যাওয়ার শব্দ হল।
ডক্টর গাঙ্গুলীর ফ্ল্যাটে এই দুটো মাত্র ঘর। এই ঘরটা তার বেডরুম এবং পাশেই যে ঘরটা আছে, যে ঘর থেকে কাঁচের বয়াম ভেঙে যাওয়ার শব্দ হলো, সেই ঘরটা হলো ডক্টর গাঙ্গুলীর ল্যাবরেটরি। গোটা ঘর জুড়ে সেখানে রয়েছে বিভিন্ন কাচের বয়াম এবং বয়ামের মধ্যে ফরমালিনে ডুবিয়ে রাখা আছে বিভিন্ন মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, যে সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো মানুষের শরীর থেকে কেটে বাদ দিয়েছেন তিনি। বিভিন্ন বয়ামে রয়েছে মানুষের কাটা হাত, পা, কিডনি, হৃদপিণ্ড, বাচ্চা শিশুর মাথা, ভ্রূণ— আরও কত কী।
বিছানা থেকে উঠে পাশের ঘরে গিয়ে আলো জ্বালাতেই ডক্টর গাঙ্গুলী দেখলেন দূরে, ল্যাবরেটরির একটা তাক থেকে একটা বয়াম ভেঙে তার ভেতর থেকে একটা কাটা হাত মাটিতে এসে পড়েছে। এগিয়ে গিয়ে ডক্টর গাঙ্গুলী হাতটা তুলে ল্যাবরেটরির টেবিলের ওপর একটা ট্রের মধ্যে রেখে ভাঙা কাচগুলো পরিষ্কার করে নিয়ে আবার আলো নিভিয়ে নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়লেন।
মাঝরাতে ঘুমটা ভেঙে গেল অনেকগুলো কাচের বয়াম ভেঙে পড়ার শব্দে। বিছানায় ধড়মড়িয়ে উঠে বসতেই ঘরের বাতাসে কেমন যেন একটা অস্বস্তিসূচক গন্ধ পেলেন ডঃ গাঙ্গুলী। এতগুলো বয়াম একসঙ্গে ভাঙল কী করে? ওগুলো তো ভেঙে যাওয়ার কথা নয়! তিনি তো সব ঠিক জায়গায় রেখেছিলেন। ঘরের সমস্ত জানলা বন্ধ। হাওয়া-বাতাস খেলছে না। তাহলে বয়ামগুলো পড়ল কী করে?
আবার উঠে দেখতে যান ডক্টর গাঙ্গুলী, কিন্তু বুঝতে পারেন বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছেন না তিনি। যেন মনে হচ্ছে কোনো এক অদৃশ্য শক্তি তাকে বিছানায় চেপে ধরে রেখেছে। ঘরে একটা বহু পুরনো নাইট বাল্ব জ্বলছে, সেই নাইট বাল্বের ক্ষীণ হলদেটে আলোয় ডক্টর গাঙ্গুলী দেখতে পেলেন, ঘরের কোনায় যে অন্ধকারটা জমেছে, সেই অন্ধকারে দেয়াল ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকজন লোক। না, লোক নয়। লোক হলে তাদের চোখগুলো আগুনের ভাটার মতো জ্বলত না।
ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে ডক্টর গাঙ্গুলীর। এ কী! পাশের ঘর থেকে কাটা হাতগুলো নিজে নিজে মেঝেতে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে কী করে? অনেকগুলো কাটা হাত একসঙ্গে আসছে, যে সমস্ত হাতগুলো ডক্টর গাঙ্গুলী মানুষের শরীর থেকে কেটে বাদ দিয়েছেন।
ঘরের কোণ থেকে একজন বলে উঠল, “কী ডাক্তারবাবু, আপনি বুঝতে পারছেন না এই কাটা হাতগুলো আপনার দিকে কেন এগিয়ে আসছে? এগুলো আমাদের হাত। যে হাতগুলো আপনার সংগ্রহে আছে। আপনি তো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচার করেন ডাক্তারির পাশাপাশি, তাই না? তাই মাঝে মাঝে যখন হাত, পা, কিডনি বা হৃদপিণ্ডের প্রয়োজন হয়, তখন কোনো রোগী ভর্তি হলে ইচ্ছাকৃত ওষুধ খাইয়ে তার সেই সুস্থ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো এমন অকেজো, অবশ করে দেন যেন মনে হয় সে অঙ্গগুলোতে পচন ধরেছে। তারপর আপনি বলেন সেগুলো কেটে বাদ দিতে হবে এবং কেটে ফেলেন, আর নিজের সংগ্রহে রাখেন। পরে এগুলোকে বিক্রি করে প্রচুর টাকা রোজগার করেন আপনি। আপনি জানেন না, এই সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বাদ দেওয়ার ফলে বহু মানুষের তৎক্ষণাত বা কয়েকদিন পরেই মৃত্যু ঘটেছে, এবং আমরা তারাই।”
ঘরের ক্ষীণ আলোটা একটু জোরালো হল, আর তখন লোকগুলোর মধ্যে সামনের দু’জন লোককে দেখতে পেলেন ডক্টর গাঙ্গুলী। আজকে সকালেই ওষুধ খাইয়ে এদের রোগবিহীন কিডনিগুলোকে অবশ করে কেটে বাদ দিয়েছেন তিনি।
কাটা হাতগুলো আস্তে আস্তে বিছানায় উঠে এগিয়ে আসছে ডক্টর গাঙ্গুলীর দিকে। সেগুলো চেপে বসছে সারা শরীরে। কয়েকটা হাত চেপে বসছে তার গলায়। নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না ডক্টর গাঙ্গুলী। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসছে তার। অন্ধকার।