গল্প : চোরাবালির বুকে বাস্তুভিটা

লিটন আচার্য

এখানে জ্যোৎস্না উদাসীন। আউল-বাউল। বাতাস তন্দ্রাচ্ছন্ন। মাথায় শিশিরের বোঝা চাপিয়ে তৃণ সব কেমন এক লজ্জাভারে ন্যুব্জ। দূরে মেঠো পথের সীমানা ছাড়িয়ে কাঁটাতার। কাছেই বাংলাদেশ। একদা কথিত ‘সোনার বাংলা’। জন্মভূমি নোয়াখালি জেলা। সায়েবের আঁট (সাহেবের হাট)। মুন্সিগঞ্জ। কুমিল্লা। চট্টগ্রাম। ঢাকা। বিটিভি। একাঙ্ক নাটক — বন্ধু আমার। তাসের ঘর। তুমি। নিলয় না জানি। শিল্পী। গ্রামের নামটি খঞ্জনা। মেগা সিরিয়াল — সংশপ্তক। অয়োময়। ঢাকায় থাকি। বহুব্রীহি। নক্ষত্রের রাত। এইসব দিনরাত্রি (জাদুর পেন্সিল)। কোথাও কেউ নেই। হুমায়ূন আহমেদ। সুবর্ণা। সুবর্ণা মোস্তাফা (বাল্য-কৈশরের সন্ধিক্ষণ। ফাস্ট ইল্যুশন। রূপ-লাবণ্য-বিমুগ্ধতা। তারওপর কৈশর-যৌবনের মিলনবেলা। ভালো লাগা-ভালোবাসা। প্রথম প্রেম।)
রিনির ঈর্ষা হতো? ভয়ানক রকমের। প্রেমিকের প্রথম প্রেম। ভাগ্যিস টিভির পর্দায়। ধরাছোঁয়ার বাইরে। আবার দ্বিধাও ছিল। নিজেরও তো পছন্দের অভিনেত্রী সুবর্ণা। দূর পাহাড়ের বুক ছুঁই ছুঁই মেঘেরা গাভীর মতো চরে এখানেও। চট্টোপাধ্যায় শক্তির মেঘদের মতো। আলস্যের কাঁধে ভর দেওয়া সন্ধ্যা। ভূত-জিনের পরস্তাব, তাবিজের ছোঁয়ার মতো ধন্বন্তরি হয় এই মায়াবী বিকেলবেলায়। রিনি কাছ ঘেঁষে বসে। ও বলে কম, শোনে অনেক। কত কী কথা হয়। আগেরটা পরে। পরেরটা আগে হয়ে যায় কোনো কোনো গোধূলিতে।
গাভী হারিয়ে চোখের জলে ভাসে রিনি। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামে কোনো কোনো দিন। বন-বাদাড় ভেঙে হারানো গাভী তাড়িয়ে ঘরের পথ ধরিয়ে দিতে হয় এই অভিরূপকেই। অনেক বার ঘরে ফিরে যেতে বলে গেলেও, ফিরি ফিরি করেও ফেরা হয় না মেয়েটার। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে গোল টিলার মাথার কাঁঠাল গাছটার তলায়। বাড়ি ফিরলে পর বরাতে নিশ্চিত লাঞ্ছনা বরাদ্দ জেনেও। মা এক একদিন মারতে মারতে মাথার চুল ছিঁড়ে বাতাসে উড়িয়ে দেয়।
‘বুক উইঠবার সময় ওইছে, অনঅ অন্ধকার রাইত হোইযন্ত জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুইরতে শরম লাগে না তোর। গোরু আজি গেলে আজি যাক। হুনমারাক গোই গোরু। সোইন্ধ্যার আগে তুই বাড়িতএনা চোলি আইবি।’ আরো কত কী কানে হাত দেওয়ার মতো অশ্লীল ইঙ্গিতে কথা বলে মা। রাতে ঘুমোতে গেলে কিছুতেই ঘুম আসে না। অসহ্য ব্যথা শরীরে। ফ্রক খুলে বুকে-পিঠে রসুন-তেল মালিশ করে দেয় মা। বুকে হাতের ছোঁয়া লাগলে কেমন সুড়সুড়ি লাগে, অদ্ভুত এক শিহরণ জাগে দেহ-মনে। এখন থেকে এমন এলেবেলে চালে চলা যাবে না। নিজেকে গুটিয়ে রাখতে হবে। পাড়ার ষোড়শী রেনুপিসি পোয়াতি হয়ে কালুদের আমগাছে ফাঁস লাগিয়েছে কেন, সেই কাহিনি শোনায় মা। কিছুটা বোঝে। বাকিটা কেমন রহস্যমোড়া মনে হয়। কেমন অজানা এক ভয় জাগে মনে। মাকে জড়িয়ে ধরে এক সময় ঘুমের দেশে হারিয়ে যায়।
অভিরূপ যুগোপযোগী নয়। কত কত উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়েও মানুষ কতটা কী আর হাসিল করতে পারে আজকাল। নয় নয় করেও অন্তত নব্বই তো তোমাকে চাইতেই হবে। তবেই না তোমার ঝুলিতে সত্তর-ষাট বা নিদেনপক্ষে পঞ্চাশ হলেও জুটবে। তুমি চাইবেই পঞ্চাশ। তো হাসিল করবে কী। কাঁচকলা। রিনির ধারণা অন্তত তা-ই। মুখে ঠিক এমনটা না বললেও বাকি সব কথা আর আচরণ কিন্তু ঠিক বুঝিয়ে দেয়, অভিরূপ রায়ের গলায় একদা বরমালা পরানো ছিল জীবনের মস্ত বড় ভুল।
সেই পরিচিত ডায়লগ
“কলেজে হোইডবার সময় কত ভালা ভালা ঘরের তুন আলাপ আইছিলো, কোনোয়ানে রাজি ওই ন। কত মাইর খাইছি মা’র। অনঅ হিডে দাগ আছে। মা ঠিকই কোইতো, একদিন পস্তাইবি। হেসুমগা কী আর জাইনতামনি এ বেডা আছিলো হোকির, হারা জীবন থাইকবোঅ হোকির।” প্রথমদিকে এক এক সময় মাথায় আগুন ধরে যেত। কত কী বাকবিতণ্ডা। ইচ্ছে করত পায়ের জুতা খুলে জুতিয়ে পালিশ করে দেয়। আজকাল গা-সওয়া হয়ে গেছে।
পাঁচ দিনও পার হয়নি বিয়ের। সেই প্রথম অসন্তুষ্টি প্রকাশ পায়
‘ঠিক মতো বুঝি এইকগা বালিশঅ বানাইতা হার ন এতদিনে। কী শক্ত শক্ত বালিশ কতুগুন। মাতাত দিলে বালিশে মাতা রাইখছি না থান ইটে মাথা থুইছি বুজন মুশকিল। বাবার দেওইন্যা বালিশগুন মনে কোইরছিলাম স্মৃতি ইসাবে তোলা রাখি দিমু। অন ত দেইয়ের হিগুন ছাড়া আর গোতি নাই।’ কিছুদিন পার হতেই নয়া আবদার,
“কতবার কোইছি আরঅ কোয়ান টিউশানি বাড়াঅ। গ্রুপ-ডি। ইয়ান এক্কান চাকরি নি। এ টেবিলের তুন হেই টেবিলে ফাইল টানন। বেতন কত? ছ’মাসে চাইরানা, গিরা বান্ধি হারে না।”
যত দিন যায় হাওয়া উতলা হয়। উত্তরোত্তর ডালপালা ছড়াতে থাকে রিনির চাহিদারা। এ সেই রিনি, যে শুনতেই অভ্যস্ত ছিল, বলত খুব কম। আর ইদানীং একবার মুখ খুলেছে তো, খই ফোটার গতিও হার মানে বাচালতায়। দাঁড়ি-কমারা পালিয়ে বেড়ায় কেবলই। ওর ইদানীংকালের ফেইচবুক পোস্টে চোখ বুলালেই যে কারোরই ওর বর্তমান (হয়তোবা বরাবরের) মানসিক অবস্থান সম্বন্ধে সহজে অনুমান করে নিতে খুব একটুও বেগ পেতে হবে না। প্রায় প্রতিদিনের পোস্টে কুবের ও মাতা লক্ষ্মী, লোকনাথ বাবা, কালিমাতা ইত্যাদি প্রভৃতি। ‘যে বাবার ছবিটি শেয়ার করবে, তাদের শীগগিরই শুভ সংবাদ আসবে।’ ‘প্রথমে আমিও বিশ্বাস করিনি, পরে দেখলাম আমার কিছু না কিছু একটা ভালোই হয়েছে, তাই আমিও শেয়ার করলাম। জয় মা লক্ষ্মী।’ ‘মা খ্যাপাকালী, ভীষণ জাগ্রত, দেখা মাত্র শেয়ার করুন, জীবনে ভালো কিছু ঘটবেই।’ ‘ফটোখান দেখার লগে লগে শেয়ার করা। শেয়ার করার পিছেতেই সুফল পাবা। জয় মা মানসা।’ বা “‘লক্ষ্মী ফেঁচাব দর্শন হ’লে মনোকামনা পূরণ হয়। দেখা মাত্রই শেয়ার করিব।” এছাড়া ভজরংবলী, হর হর মহাদেব সহ আরো কত কত দেবদেবীর ছবি শেয়ার করার আদেশের ছড়াছড়ি আর চচ্চড়ি ওর এফ বি জুড়ে। দেখে মাঝে মাঝে ভীষণ রকম অর্থলোলুপ-ধনভিখারী আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন একটা মহিলা বলেই ধারণা হয় ওকে।
আচমকা ঝড় ওঠে। তুমুল বাতাস আর ঝড়জলে ভেসে যায় চরাচর। নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বাস্তুভিটা। পুরো পাড়াটাই কোনো এক অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। হারিয়ে যায় রিনি। যতদূর চোখ যায় ধূ ধূ প্রান্তর। জনমানুষের চিহ্ন নাই কোথাও। শুধু দূরে বহুদূরে ধোঁয়ার চাদর জড়িয়ে আছে যে দিগন্তরেখায়, সেখান থেকে মনে হয় কেউ একজন একাকী গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে। কোনো রমণী বুঝি! ক্রমে সেই ধোঁয়ার চাদর সরে যায়। আত্মপ্রকাশ করে মানবী। সুবর্ণা। সুবর্ণা মোস্তাফা। বাংলাদেশের নাটকের মেয়ে। যুগ পেরিয়েও যার শক্তিশালী অভিনয় আর রূপ-লাবণ্যে বিভোর আপামর বাঙালি। বিভোর এই ছেলেটিও। সেই স্কুলবেলা থেকে। কিন্তু একী হল! একটা চোখ পাথরের কেন মনে হয়! ভুল দেখছে নাতো। নাহ্! সত্যি সত্যি পাথরেরই তো। এই তো স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে পাথরের ঐ আঁখি। কার ছবি দেখা যায় ঐ আঁখি-গোলকে? এ তো হুমায়ূন ফরিদি। বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ খলনায়ক। জাত অভিনেতা। ১৯৯২ সালে মৃত্যুর বছরখানেক আগে যার ডিভোর্স হয়ে যায় স্ত্রী সুবর্ণার সঙ্গে। হঠাৎ চোখ খুলে যায়। হুড়মুড় করে বিছানায় উঠে বসে অভিরূপ। আপাদমস্তক ঘামে ভেজা। বুক ধড়ফড় করছে।
কোনো কোনো পড়ন্ত বিকেলে মায়ের সঙ্গে ঠাকুরঘর-লাগোয়া কামরাঙা গাছটার তলায় গিয়ে বসে। বিনা কারণে বুকটা ভারী হয়ে ওঠে এক একদিন। মা’র পাশে বসলে, মা’র সঙ্গে দু’দণ্ড কথা বললে এক লহমায় শান্তি ফিরে আসে যেন মনের ঘরে। মা’র কথার বেশিরভাগটা জুড়েই থাকে মা’র দেশের কথা। চট্টগ্রামের মীরস্বরাই গ্রাম। জন্মভূমি। বঙ্গোপসাগর। টুনি পাখির বাসা। পাডি পাতার বন। ঘরের পেছনের তাল-খেজুরের সারি। তির তির করে বয়ে চলা সীতা চরা। পদ্মার ইলিশ। ওগলা কেমড়া। কাচের আনার (আয়নার) মতো জলের নিচে চুপ মেরে বসে থাকা সেম্‌ কচ্ছপ। মা’র বোনা নক্সী কাঁথা। ডুব সাঁতারে পার করা ইমলি পুকুর। বিন্নি ধানের খই। ছালির থুবের গন্ধরাজ লেবুর গাছ। আব্বাস চাচা। হারাধন খুড়া। বাল্যসখি কিংকরি। চুপ দুপুর। মৃদুমন্দ বাতাসে সেই কোন নিরুদ্দেশের ঠিকানায় উড়ে উড়ে হারিয়ে যাওয়া শিমূল তুলা। আরো আরো কত কী কথা হয় মা-ছেলেতে। কী সহজ সুতোয় বোনা ছিল জীবন। দু’বেলা দু’মুঠো জুটলেই হল। মোটা ভাত। মোটা কাপড়। কত অল্পতে সন্তুষ্টি।
মুনাইটার উপরও বেজায় বিরক্ত রিনি। কথায় কথায়
‘বাবার মতনই ওইবি, কোনো হাই-অ্যাম্বিশান নাই। চোল্লিশ হাইলেঅ খুশি, চোইতিরিশ হাইলেঅ খুশি।’ একটা নার্সারির বাচ্চা। রেজাল্ট বের হতেই প্রতিবারই মার্কশিট হাতে নিয়ে এমনিধারা ঘ্যানর ঘ্যানর চলতে থাকে দিনের পর দিন। কেবলই তুলনা। জেসিকা, ঝিল্লি, কঙ্কণা, পুরন্ধ্রী সহ আরো কত কত জনের উদাহরণ টেনে এমন সব কথা বলে যে ঐ টুকুন ফুরফুরে প্রজাপতির মতো মেয়েটা কেমন মুষড়ে পড়ে। বাবাকে জড়িয়ে ধরে এক এক সময় ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে মুনাই। সান্ত্বনার ভাষা খুঁজে পাওয়াই কী ভীষণ মুশকিল মনে হয় মাঝে মাঝে। বাধ্য হয়ে গল্পে গল্পে পরির দেশে নিয়ে যায় বাবা। রূপকথার কথামালা শোনায়। বাবার কোলে মাথা রেখেই ঘুমপরির আলিঙ্গনে যায় ধীরে ধীরে।
দশ মিনিট দূরের স্কুল থেকে মেয়েকে আনতে যেতে আধ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে সাজুগুজু নিয়ে মেতে থাকে রিনি। এমনিতেই মেলা সুন্দর রিনি। শ্যাম্পু করা চুলে শুধুমাত্র একটা রাবার ব্যান্ড জড়িয়ে নিলেই ওকে ভারি সুন্দর দেখতে লাগে। তাও রোজদিন আর্টিফিশিয়াল প্রসাধনী ব্যবহার করে করে যতক্ষণ না নিজেকে কম সুন্দর করে তুলবে, ততক্ষণ পর্যন্ত লেগে থাকে। কিছু কিছু মেয়ে হয়, যারা সাদামাঠা সাজেই অনেক অনেক অ্যাট্রাক্টিভ দেখতে হয়। বাড়াবাড়ি রকমের সাজগোজ ভীষণ রকম আরোপিত লাগে। রিনি ঐ দলের। কিন্তু বোঝাবে কে? বলতে গেলেই ফোঁস করে উঠবে। বলবে বেকডেটেড।
‘মিসেস চক্রবর্তীরগো নতুন ওয়াশিং মেশিন আইনছে। ঝিল্লির মা নতুন স্কুটি কিনছে। কী পিকাব ধোরি উড়ি আইয়ে, মাইয়ারে লোই হুস কোরি চোলি যায়। আর অ্যাঁর হোড়া কোয়াল! স্কুটি দূরে থাক, এক্কান সাইকেলঅ বরাতে নাই। সাহা বাবুর প্রমোশোন ওইছে এমাসে। এবার তুন বেতন ওইবো কম কোরি হচাশির তুন নব্বোই আজার টেয়া। জেসিকারা সপরিবারে এবারের পূজার ছুটিত সাউত ইন্ডিয়া বেড়াইতো যাইবো।’ হাজারো অপ্রাপ্তির/অতৃপ্তির বেড়াজাল।
মন লাগে না কিছুতেই। মন বসে না কোনো কাজে। কেবলই ভুল হয়ে যায়। অফিসে ভুল হয়। বাজারে ভুল হয়। ভুল হয় মুনাইকে পড়া দেখিয়ে দিতে গেলে। দু’চোখের পাতা এক হয় না কোনো কোনো রাতে। এক সকালে নিজেকে রদ্দি কাগজের স্তুপে পাওয়া যায়। কারা যেন কিলো দরে বিকিয়ে দিচ্ছে অভিরূপ রায়কে। দুই হাত ওঠে মানা করতে। হয় না। কোথায় রিনি। শুধু খোঁজ আর খোঁজ। সকাল থেকে গভীর রাত পেরিয়েও কোথাও হদিশ নেই সেই রিনির। সেই মেয়েটা, যে বাড়ি ফিরলে পর নিশ্চিত লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সইতে হবে জেনেও, প্রিয় মানুষটার অপেক্ষায় সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের আগমনেও, ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত গোল টিলার কাঁঠাল গাছটার তলায়।

Sumit Chakraborty: