মধুছন্দা মিত্র ঘোষ
তাঁর রূপের জৌলুশ বহু। কোথাও তিনি স্বয়ম্ভূ গণপতি। আবার কোথাও পূজিত হন গজানন, বাল গণপতি, হেরম্ব গণপতি, লক্ষ্মী গণপতি, হরিদ্রা গণপতি, বরদা গণপতি, দ্বিভূজ গণপতি, নর্তন গণপতি, দশভূজ গণপতি, সূর্যগণপতি, দক্ষিণমূর্তিধারী গণপতি (ডানদিকে বাঁকানো নাসিকাযুক্ত মুখ) ইত্যাদি নামে। শাস্ত্রকথন রয়েছে, শ্রী গণেশ অবিবাহিত ব্রম্ভচারী। আবার অনেক জায়গায় তাঁকে 'বুদ্ধি' (বোধ), ‘সিদ্ধি’ (আত্মিক বুদ্ধি) ও ‘ঋদ্ধি’ (সৌভাগ্য) এই তিন নারীর স্বামী রূপে কল্পনা করা হয়।
শিবপুরাণ মতে ভারি আশ্চর্যজনক গণেশ জন্মবৃত্তান্তটি। কিছুটা অদ্ভুতও। পার্বতী একদা স্নান করতে যাওয়ার আগে নিজের শরীরের চন্দনচর্চিত ঘষা মলিন অংশ নিয়ে গঠন করলেন এক সৌম্যমূর্তি। জীবনপ্রতিষ্ঠা করলেন তাতে এবং তাকে স্নানাগারের সামনে রেখে নির্বিঘ্নে স্নানে গেলেন। এদিকে হয়েছে কী, দেবাদিদেব ঘরে ফিরে সেই অপরিচিতকে দেখে বেজায় ক্রুদ্ধ হলেন। পার্বতীর নবনিযুক্ত ‘দ্বারপাল’ বিনা অনুমতিতে শিবকে অন্তপুর প্রবেশে বাধা দিলে শিব তখনই তার মুন্ডচ্ছেদ করেন। পার্বতীর কাতর হাহাকারে এরপর শিব তাঁর ‘গণ’ নামক এক অনুচরকে আদেশ দেন, উত্তর কোনে মাথা রেখে শুয়ে রয়েছে এমন যাকেই পাওয়া যাবে, তাঁর মস্তক উৎপাটিত করে নিয়ে আসার জন্য। গণ বাধ্যের মতো উত্তরে মাথা রেখে শোয়া ঘুমন্ত এক হস্তিশিশুকে দেখে তার শিরচ্ছেদ করে তা এনে দেন মহাদেবকে। তখন তিনি সেই হস্তিমস্তককে পার্বতীর দ্বারপালের শরীরে প্রতিস্থাপন করেন। অবশেষে নতুন অর্পিত আকৃতির নাম রাখেন গণেশ, এবং মঙ্গলকামনা করেন জগতে সব দেবতার উপাসনার প্রারম্ভে গণেশ-বন্দনা করা হবে।
পুরাণে আরও এক উপাখ্যান বহুল প্রচলিত। যেখানে পার্বতীর কোল আলো করে পুত্রসন্তান জন্মবার পর স্বর্গের দেবকুল আসেন নবজাতককে আশীর্বাদ করতে। শনিদেবও আমন্ত্রিত ছিলেন। সর্বনাশের দেবতা তিনি, তাই ইতস্তত করছিলেন নবজাতকের সামনে উপস্থিত হতে। কিন্তু পার্বতীর নিতান্ত উপরোধে শনিদেব শিশুর মুখদর্শন করা মাত্রই কোমল মস্তকটি খসে পড়ে। উপস্থিত দেবকুলের সকলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। ভগবান বিষ্ণু তাঁর বাহন গরুড়কে পাঠান পুষ্পভদ্র নদী তীরে। গরুড় সেখান থেকে ঐরাবতের মুন্ড এনে দিলে বিষ্ণু সেটি পার্বতীপুত্রের মস্তকে প্রতিস্থাপন করেন এবং নবজাতকের নামকরণ করেন ‘শ্রীগণেশ’। দেবতারা শক্তি ও সমৃদ্ধির অধীশ্বর ও বিঘ্নবিনাশী রূপে সম্মেলক গণেশ স্তুতি করেন।
“একদন্তং মহাকায়ং লম্বোদরং গজাননং বিঘ্ননাশকং দেবং হেরম্বং প্রণমাম্যহং”
আবার অন্য কল্পকথন শোনায়, সপ্তঋষির অন্যতম কাশ্যপ পুত্র আদিত্যকে শিব বধ করায় কাশ্যপ শিবকে অভিসম্পাত করেন, তাঁর শিরহীন পুত্র জন্মাবে। অলৌকিক কান্ডটি যখন সত্যিই ঘটে যায়, দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর বাহন ঐরাবতের মস্তক শিবপুত্রের মাথায় সংস্থাপন করে দেন। প্রচলিত আরও একটি বৃত্তান্ত হল, পার্বতীর ব্যবহৃত স্নানের জল গঙ্গায় সঞ্চিত হত। হস্তিমস্তকরূপিনী দেবী মালিনী একদিন সেই জল পান করে গর্ভবতী হয়ে পড়েন। যথাসময় তিনি একটি শিশুপুত্রের জন্ম দেন, যার চার হাত ও পাঁচ হস্তিমুখযুক্ত। পরে শিব সেই পুত্রের অতিরিক্ত চারটি মাথা কেটে তাঁকে ‘সর্ববিঘ্নেশ্বর’ নবরূপে শোভিত করেন।
গণেশজন্মের নানা অতিরঞ্জিত গল্পকথার উল্লেখ থাকলেও প্রকৃতির সমন্বয়ে সৃষ্ট প্রাণ মাত্রই ঈশ্বর। শ্রীগণেশের হস্তিমস্তককে তাই ‘আত্মন’ রূপে সূচিত করা হয় – যা মানবজীবনের সর্বোত্তম ও চূড়ান্ত নির্মাণ। শ্রী গণেশের নাসিকা বা শুঁড়টি হল ‘ওম’ তথা ‘ওংকার’ ধ্বনিবিশেষ। তাঁর দেহাবয়েব হল ‘মায়া’ যা সব পার্থিব জগতপ্রপঞ্চকে নির্ধারন করছে। তাঁর চতুর্ভূজের মধ্যে ওপরের ডান হাতে থাকা অঙ্কুশ হম মানবজাতির ‘সর্ব বিঘ্ননাশকারী’। তাঁর এক হাতে আশীর্বাদসূচক ‘বরাভয়’ মুদ্রা। এক হাতের মণিবন্ধে জড়ানো সর্পশিশুর ফনা – আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতিভূ। কোনও গণেশমূর্তির একহাতে ধরা থাকে তাঁরই ‘ভাঙা গজদন্ত’। যেন হুবহু এক কলমের আকার, যেটি তিনি ‘মহাভারত’ লেখার সময় কলম হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। আসলে এটি ‘আত্মত্যাগের প্রতীকস্বরূপ’। তাঁর বাঁহাতে ‘মোতিচুরের লাড্ডু’ বা ‘মোদক’ – এটি হল জগতের আনন্দস্বরুপ, প্রীতিকর ও সক্রিয়তার অংশবিশেষ। গণপতি বন্দনায় ভক্তরা উদাত্ত হয়ে প্রার্থনা করেন –
“বক্রতুন্ড মহাকায় সূর্যকোটি সমপ্রভা ।
নির্বিঘ্নং কুরু মে দেব সর্বকার্যেষু সর্বদা ।।”
গণপতি বাপ্পার প্রিয় নৈবেদ্য হল মোদক। এ সম্পর্কে একটা কল্পকথা প্রচলিত রয়েছে। একদা সব দেবতারা কৈলাসে শিব-পার্বতীর গৃহে উপস্থিত হয়ে একটি বিশাল আকারের মোদক উৎসর্গ করেন। সেটি দেখেই খাওয়ার জন্য কার্তিক ও গণেশ দুই ভাই উৎসুক হয়ে উঠল। মাতা বললেন, তোমাদের মধ্যে যে আগে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে আসতে পারবে, সেইই মোদকটি পাবে। কার্তিক তখনই ময়ূরের পিঠে চড়ে বেরিয়ে পড়ল পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে। আর গণেশ করল কী, শিব-পার্বতীকে প্রদক্ষিণ করেলেন। কার্তিক ফিরে এলে মাতা ঘোষণা করলেন, সন্তানের কাছে পিতামাতাই জগততুল্য। গণেশ সেটি বুঝেছে, তাই মোদক তারই প্রাপ্য। শিব গণেশের ব্যবহারে প্রীত হয়ে আশীর্বাদ করলেন, সনাতন ধর্মে যেকোনও শুভকাজ, পুজো অর্চনা, ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রথম আবাহনে গণেশের পুজোই করবে।
ভাদ্র মাসের শুক্লা চতুর্থীতে শুরু হয় ‘বিনায়ক চতুর্থী’ বা ‘বিনায়ক চৌথি’ অর্থাৎ ‘গণেশ চতুর্থী’। ভারতের বহু জায়গায় দশ দিনের গণেশ উৎসব শেষ হয় শুক্লা চতুর্দশীতে। সেই ক্ষণটিকে বলা হয় ‘অনন্ত চতুর্দশী’। এই পুজোর কিছু শুভ বিধি রয়েছে। পুরোহিত গণেশমূর্তিতে সাদা অথবা লাল ধুতি, উত্তরীয়, লাল চন্দনের তিলক পরিয়ে প্রথমে মূর্তিতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা আচার করেন। তারপর ১৬ টি উপাচারে ভগবানকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হয়। নারকেল, ২১ টি দুব্বো ঘাস, মিছরি, লাল ফুল, লাল ফুলের মালা, ত্রিপত্র, মোতিচুরের লাড্ডু, কুমকুম, রক্তচন্দন ইত্যাদি অর্ঘ্য নিবেদনের পর পাঠ করা হয় শ্রীগণেশ স্তোত্র।
“ জয় গণেশ জয় গণেশ জয় গণেশ দেবা ।
মাতা জাকি পার্বতী, পিতা মহাদেবা ।।
একদন্ত দয়াবন্ত, চার ভূজাধারী ।
মাথে সিন্দুর সোহে, মুসে কী সবারি ।।
দীনহীন কি লাজ রাখো শম্ভুপুত্রয়ারী ।
মনোরথকো পুরা করো, জয় বলিহারী ।। ’’
আর সব আনন্দ অনুষ্ঠান কোথাও তিন দিন, কোথাও পাঁচ দিন, এবং বিধি মোতাবিক দশ দিন আরাধনার পর নিরঞ্জনের দিন মহারাষ্ট্রের ভক্তকুল তাঁদের প্রিয়স্য প্রিয় সিদ্ধিদাতার কাছে উদাত্ত কন্ঠে যেমন আকুল আবেদন করতে থাকেন, আমরা বঙ্গকুলবাসীরাও সেই মরাঠা বাক্যটির অনুকরণ করে বলতে চাই ---
“ গণপতি বাপ্পা মোরাইয়া
মঙ্গলমূর্তি মোরাইয়া
পুর্চা বরষি লোওকর ইয়া ”